শিরোনাম :

  • রাজধানীর উত্তরখানে আগুনে একই পরিবারের ৮ জন দগ্ধ ভারতে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় তিতলিবাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, তারেকসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবনরায়কে ঘিরে ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ
লজ্জা নয়, স্তন ক্যান্সার রোধে জরুরী সচেতনতা
মাহমুদা বীথি
১০ অক্টোবর, ২০১৮ ১১:৩৫:৩০
প্রিন্টঅ-অ+


বিশ্বজুড়েই মহিলাদের ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারন হলো স্তন ক্যান্সার। দিন দিন এ ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের  সংখ্যা আরও বাড়ছে। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত সকল নারীরাই স্তন ক্যান্সারের উপসর্গ সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত না হবার কারণে, স্তন সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে অনীহা, ধর্মীয় গেড়ামিসহ নিজেদের ও পরিবারের মানুষের অবহেলার কারণে তাদের রোগকে প্রতিরোধযোগ্য পর্যায় থেকে মরণঘাতী পর্যায়ে নিয়ে যান। সময়মত চিকিৎসা না নেয়ায় অপেক্ষা করতে হয় তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করার জন্য। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধু বাংলাদেশেই প্রতিবছর স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন প্রায় ২২ হাজার নারী। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার নারী চিকিৎসার অভাবে মারা যান।

স্তন ক্যান্সার একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার দ্বিতীয়। তবে এই ক্যান্সারে যে শুধু মহিলারা আক্রান্ত হচ্ছে এমনটা ভাবা একেবারে বোকামি। পুরুষ এবং মহিলা উভয়েরই এ রোগ হতে পারে, তবে মহিলাদের মধ্যেই এর প্রবণতা বেশি দেখা যায়। প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন আর প্রতি ছয়জন নারীর মধ্যে একজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত এক জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে মোট ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে। যাদের মধ্যে ৯৬ লাখ মানুষ মারা যাবে। বিশ্বে এই মোট মৃত্যুর অর্ধেকই হবে এশিয়ার দেশগুলোতে। যেখানে তালিকায় অনেক দেশের উপরে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে নতুন করে ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৮১ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা হবে প্রায় ৮২ হাজার ৭১৫ জন ও নারীদের সংখ্যা হতে পারে ৬৭ হাজার ৬৬ জন। এ তালিকায় মুখ, ফুসফুস, ব্রেস্ট ও জরায়ু মুখের মতো ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হবে। এরমধ্যে জরায়ু মুখ ও গল ব্লাডারের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যথেষ্টই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে নারীদের স্তন ক্যান্সার। আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যেও বাড়ছে ব্রেস্ট ক্যান্সার।  এজন্য জীবনযাপনের মানকেই বিবেচ্য হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।  

এ বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. হাবিবুল্লাহ তালুকদার (রাসকিন) বলেন, ‘নারীদের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্তের হার বাড়ার বড় কারণ উশৃঙ্খল জীবনযাপন। এছাড়া দেশের নারীদের একটি বড় অংশ পানের সঙ্গে জর্দা, সাদাপাতা বা এ ধরণের তামাকজাত খেয়ে থাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, অনিয়মিত খাবার বা ফ্যাটি খাবার খাওয়াও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার বৃদ্ধির বড় কারণ’

স্তন ক্যান্সার বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বসহ বেশিরভাগ অঞ্চলের নারীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্কের নাম। তবে আশার কথা হলো সঠিক সময়ে এর নির্নয়ে আমরা সহজেই এর চিকিৎসা করতে পারি। আজ আমরা স্তন ক্যান্সার কি কেন হয়? এবং এর চিকিৎসার কথা জানবো।

স্তন ক্যান্সার কি?

স্তনের কিছু কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে তখন স্তন ক্যান্সার হতে দেখা যায়। অধিকাংশ মহিলাদের জন্য এই রোগ একটি আতঙ্কের কারণ।

***স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ ও উপসর্গ

১. স্তনে একটি পিন্ডের মত অনুভব হয়

২. স্তনের বোঁটা থেকে রক্ত বের হয়

৩. স্তনের আকার ও আকৃতির পরিবর্তন হয়

৪. স্তনের ত্বকে পরিবর্তন দেখা দেয়, যেমন-টোল পড়া

৫. স্তনের বোঁটা ভিতরের দিকে ঢুকে যায়

৬. স্তনের বোঁটার চামড়া উঠতে থাকে

৭. স্তনের ত্বক লালচে যেমন-কমলার খোসার মতো এবং গর্ত-গর্ত হয়ে যায়



***যখন ডাক্তার দেখাবেন

১. স্তনে নতুন এবং অস্বাভাবিক পিন্ড অনুভব করলে

২. পরবর্তী মাসিক পার হয়ে গেলেও পিন্ড না গেলে

৩. স্তনের পিন্ড আরও বড় এবং শক্ত হলে

৪. স্তনের বোঁটা থেকে অনবরত রক্ত নির্গত হলে

৫. স্তনের ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিলে

৬. স্তনের বোঁটা ভিতরের দিকে ঢুকে গেলে



***কোথায় চিকিৎসা করাবেন

১. জেলা সদর হাসপাতাল

২. মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

৩. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

৪. বিশেষায়িত সরকারী/বেসরকারী হাসপাতাল



কি ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে

১. মেমোগ্রাম (Mammogram) বা স্তনের এক্স-রে

২. ব্রেস্ট আলট্রাসাউন্ড (Breast ultrasound)

৩. ব্রেস্ট ম্যাগনেটিক রিজোন্যান্স ইমাজিং (Breast magnetic resonance imaging, (MRI))

৪. বায়োপসি (Biopsy)

৫. রক্তের পরীক্ষা

৬. বুকের এক্স-রে

৭. কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফী স্ক্যান (Computerized tomography (CT) scan)

৮. পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফী স্ক্যান (Positron emission tomography (PET) scan)



কি ধরণের চিকিৎসা আছে?

স্তন ক্যান্সোরের চিকিৎসা নির্ভর করে স্তন ক্যান্সারের ধরণ, পর্যায় ক্যান্সারের কোষগুলো হরমোণ সংবেদনশীল কিনা তার উপর। অধিকাংশ মহিলারাই স্তন অপারেশনের পাশাপাশি অন্যান্য বাড়তি চিকিৎসাও গ্রহণ করে থাকেন। যেমন: কেমোথেরাপী,হরমোণ থেরাপী অথবা রশ্মি থেরাপী ।



স্তন ক্যান্সার কেন হয় ?

স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠলে স্তন ক্যান্সার হয়।



স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি যাদের

১. পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি

২. ৬০ বছর বয়সের বেশি মহিলাদের

৩. একটি স্তনে ক্যান্সার হলে অপরটিও আক্রান্ত হতে পারে

৪. মা, বোন অথবা মেয়ের স্তন ক্যান্সার থাকলে

৫. জীনগত (Genes) কারণে

৬. রশ্মির বিচ্ছুরণ থেকে (Radiation Exposure)

৭. অস্বাভাবিক মোটা হলে

৮. অল্প বয়সে মাসিক হলে

৯. বেশি বয়সে মনোপজ হলে (Menopause)

১০. বেশি বয়সে প্রথম বাচ্চা নিলে

১১. মহিলারা যারা হরমোন থেরাপী নেন

১২.মদ পান করলে



***স্তন ক্যান্সারে কি ধরণের অপারেশন করার প্রয়োজন হয়?

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য সাধারণত যে অপারেশনগুলোর করার প্রয়োজন হয়:

১. ল্যাম্পপেকটমি (Lumpectomy)

২. ম্যাসটেকটমি (Mastectomy)

৩. সেন্টিনাল নোড বায়োপসি (Sentinel node biopsy)

৪. অক্সিলারি লিম্ফ নোড ডিসেকশন (Axillary lymph node dissection)

স্তন ক্যানসার নিয়ে নারীদের মধ্যে ভুল ধারণা  কাজ করে। লজ্জায় অনেকে কারো কাছে বলেন না। ফলে দিনে দিনে ঘাতক এই ব্যাধিটি তার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে ৩৮ শতাংশ স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়। সেখানে প্রতি বছর অনেক নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন কেবল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার জন্য। সঠিক সময়ে ক্যান্সারের লক্ষণগুলো ধরতে না পারা বা চিকিৎসকের কাছে না যাওয়া এবং সচেতনতা না থাকায় বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। কিন্তু আমাদের  সামান্য সচেতনতাই বাঁচিয়ে দিতে পারে আমাদের আপনজনকে। তাই আসুন পরিবারের নারী সদস্যদের দিকে খেয়াল রাখি। খোঁজ খবর রাখি ভয়ংকর কোনো ব্যাধি তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে কিনা। তবে আশার কথা এই যে সব মিলিয়ে দেশে ক্যান্সার সম্পর্কে গণসচেতনতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে । তাই আসুন সচেতনতা বৃদ্ধির মাধম্যে নিরব এই ঘাতক ব্যাধিকে প্রতিরোধ করি।



আমার বার্তা/১০ অক্টোবর ২০১৮/এমবি


আরো পড়ুন