শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
জঙ্গিবাদ : ইসলামী দৃষ্টিকোণ
২২ আগস্ট, ২০২১ ১৮:৪১:৩৮
প্রিন্টঅ-অ+




সন্ত্রাসের সাম্প্রতিক উপসর্গ হচ্ছে জঙ্গিবাদ। ব্যুৎপত্তিগত বিচারে ‘জঙ্গ’ থেকে জঙ্গি শব্দের উদ্ভব। শব্দটি মূলত ফারসি; যার অর্থ যুদ্ধ বা সমর। সে হিসেবে সাধারণভাবে জঙ্গি অর্থ যোদ্ধা বা সৈনিক। তবে বর্তমানে জঙ্গিবাদ বলতে ‘অস্ত্রধারী ধর্মগোষ্ঠী’কে বোঝানো হয়; যারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উৎখাত করে ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইংরেজিতে এটি বোঝাতে ‘মিলিট্যান্ট’ বা ‘মিলিট্যান্ট এক্সট্রিমিজম’ ব্যবহৃত হয়।

বস্তুত, জঙ্গিবাদের সর্বজনীন সংজ্ঞা নিরূপণ ও গ্রহণযোগ্য ধারণাকে গোলকধাঁধার মতোই জটিল করে তোলা হয়েছে। যে যার সুবিধামতো সংজ্ঞা নির্মাণ করে সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়ার একটা অশুভ প্রবণতা প্রায় সর্বত্রই লক্ষণীয়।

ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বযুগে জঙ্গিবাদ : ইসলাম আবির্ভাব পূর্বযুগে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থা। চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানি ইত্যাদি ছিল স্বাভাবিক রীতি। তুচ্ছবিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষে-মানুষে, গোত্রে-গোত্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তারক্তি কাÐ ঘটে যেত; যার জের চলত বংশানুক্রমে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদ, জুয়া ইত্যাদি অনুৎপাদনশীল নীতি-নৈতিকতাহীন শোষণমূলক ব্যবস্থা সমাজমূলে দৃঢ়ভাবে আসন করে নিয়েছিল। সমাজের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। আইনের শাসন ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

ইসলামের দৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ : ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। বিশৃঙ্খলা, বেআইনি কার্যকলাপ, ফিতনা তথা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইসলাম সমর্থন করে না। দাঙ্গা, রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা, নির্যাতন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ইত্যাদি ধরনের কাজকে ইসলামে ‘ফেতনা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফেতনা একটি জঘন্য অপরাধ। আল্লাহর আইন চালু করার ধুয়া তুলে যারা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শেখানো পদ্ধতি পরিহার করে জঙ্গিবাদের মাধ্যমে সমাজের দাঙ্গা, অশান্তি, জনমনে ভীতি, আতঙ্ক ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে তারা ইসলামের দুশমন। তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।

পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী:

১. আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসার ৯৯ নং আয়াতে বলেনÑ ‘আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করে তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে; আল্লাহ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’

২. সূরা বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে এসেছেÑ ‘ধর্মে বাধ্যবাধকতা ও জোরের কোনো স্থান নেই।

৩. সূরা বাকারার ১৯১ নং আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘ফেতনা হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।’

৪. সূরা মায়িদার ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেনÑ ‘কেউ কাউকে নরহত্যার অপরাধ অথবা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ ব্যতীত হত্যা করলে সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। আর কেউ কারো প্রাণ বাঁচালে সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল।’



হাদিস শরিফে সতর্কবাণী:

১. জনমনে আতঙ্ক বা ভীতি সৃষ্টি হতে পারেÑ ইসলামে এ ধরনের কোনো কাজ বা আচরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। হজরত জাবের রা. বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, কোষমুক্ত অবস্থায় তলোয়ার আদান-প্রদান করতে রাসূল সা. বারণ করেছেন। (মিশকাত: ৩৫২৭)

২. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেনÑ ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দিকে লৌহ (তলোয়ার) দ্বারা ইশারা করে, ফেরেশতারা তাকে অভিসম্পাত করেন। (তিরমিজি: ২১৬২)

৩. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেনÑ ‘একজন মুমিন তার দীনে পরিপূর্ণভাবে নিরাপদে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে অনৈতিক হত্যায় লিপ্ত না হয়।’ (বুখারি: ৬৮৬২)

জঙ্গিবাদের শাস্তি : জঙ্গিবাদ ও নৈরাজ্য বন্ধ করার জন্য ইসলামের দু’ধরনের শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যথা: ক) ইহকালীন শাস্তি ও খ) পরকালীন শাস্তি।

ক) ইহকালীন শাস্তি : জঙ্গিবাদ একটি মারাত্মক ব্যাধি। আর রোগ প্রতিরোধ করা, প্রতিকারের চেয়ে উত্তম। তাই ইসলাম বড় অপরাধের জন্য গুরুদÐের বিধান রেখেছে। সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসে মৃত্যুদÐ প্রয়োগের জন্য পাঁচটি মূলনীতি দেয়া হয়েছে। এই মূলনীতিগুলোর আওতায় কোনো মানুষ যদি এসে যায় তাহলে তাকে মৃত্যুদÐ দেয়া যেতে পারে: ১. কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করে এবং এ কারণে হত্যাকারীর রক্তপণ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। ২. ইসলামী জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার পথে কেউ যদি বাধা সৃষ্টি করে এবং তার সাথে যুদ্ধ করা ব্যতীত, যুদ্ধে তাকে হত্যা করা ব্যতীত কোনো উপায় না থাকে। ৩. কোনো ব্যক্তি যদি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে জঙ্গিপন্থা অবলম্বন, সন্ত্রাস ও অরাজকতা সৃষ্টি, জনমনে আতঙ্ক অশান্তি সৃষ্টি করে এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটানোর চেষ্টা করে। ৪. বিবাহিত ব্যক্তি যদি জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। ৫. কোনো ব্যক্তি যদি ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়।

তবে ইসলাম যেসব দÐবিধি ঘোষণা করেছে তা একক কোনো ব্যক্তির প্রয়োগ করতে পারবে না। বরং ইসলামী রাষ্ট্র আইন আদালতের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করবে। দেশের মানুষের এ অধিকার নেই যে, তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিবে।

খ) পরকালীন শাস্তি : জঙ্গি ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের পরকালীন শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইতোমধ্যেই আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে জেনেছি¬Ñ মানুষকে অকারণে হত্যাকারীর ঠিকানা জাহান্নাম। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। আমরা আরো জেনেছিÑ কোনো মুমিনকে হত্যা করে আত্মতৃপ্তি বোধ করলে আল্লাহ তার পরিবার এবং দান সদকা গ্রহণ করেন না। এমন অপরাধ আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। এ ধরনের ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা সর্বাপেক্ষা ঘৃণা করেন। রাসূল সা. এমন ব্যক্তিকে উম্মতের মধ্যে গণ্য করেন না। শুধু তাই নয়, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হত্যার বিচার করা হবে এবং এই হত্যাকাÐ জান্নাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে হত্যাকারীর জন্য প্রতিবন্ধক হবে।

অতএব জঙ্গিবাদ ও ফেতনার কারণে দুনিয়াতে যেমন ভয়াবহ শাস্তির বিধান রয়েছে তেমনি কেয়ামতের ময়দানেও কঠিন বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এবং জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নিকাÐে নিক্ষিপ্ত হতে হবে।

জঙ্গিবাদ নিবারণে ইসলামের দর্শন : ইসলামের মূলমন্ত্র হলো সাম্য, সহিষ্ণুতা এবং সৌভ্রাতৃত্ব। পরমতসহিষ্ণুতা এর অলংকার। আকাশছোঁয়া উদারতা এর গৌরবোজ্জ্বল আবহ। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার ইসলামের সৌন্দর্য। ধর্মপ্রচার ও বিকাশের ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো ধরনের জবরদস্তি, গোঁড়ামী ও উগ্রপন্থা অনুমোদন করে না। সুতরাং সওয়াবের নিয়তে মানুষ হত্যা করা আর ইসলামের সাথে প্রহসন করা একই কথা। তাই জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে প্রথমত সমাজের মধ্যে ধর্মীয় অনুভ‚তি জাগিয়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি হক্কানী আলেম-ওলামার সাথে হৃদ্যতা গড়ে তুলতে হবে। জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের পর প্রকাশ্যে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে; যেন শাস্তির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে আর কেউ কারো প্ররোচনায় ভুল পথে অগ্রসর না হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অভিভাবকদের হতে হবে সচেতন। প্রয়োজনে ঘরে-ঘরে, মহল্লায়-মহল্লায় জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। রাসূল সা. এর জীবনী থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। কেননা মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ‘হিলফুল ফুজুল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সন্ত্রাস ও ফেতনার মোকাবিলা করেন। পরবর্তীতে ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘হাজরে আসওয়াদ’ স্থাপন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের প্রতিরোধ করেন। নব্যুওয়াত প্রাপ্তির পর সাম্য-মৈত্রী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরবি-আজমি, ধনী-গরিবের বৈষম্য বিদূরিত করেন। ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়নের মাধ্যমে ইসলামী ভূখÐ থেকে সন্ত্রাস ও ফেতনাকে বিদায় জানান। সর্বোপরি বর্বর আরবদেরকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে সর্বকালের সেরা মানুষে রূপান্তর করেন। মহানবী সা. এর সার্বিক অবদান বিশ^বাসীর নিকট অনস্বীকার্য বিধায় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদসহ যাবতীয় অপরাধ প্রতিরোধে তাঁর আদর্শ বিরল। তাই তাঁর আদর্শের নিকট আত্মসমর্পণ করাই হলো জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।



লেখক:সাখাওয়াত রাহাত,ইসলামী চিন্তাবিদ





 


আরো পড়ুন