শিরোনাম :

  • প্রথম ওভারেই নাসুমের আঘাত করোনায় একদিনে পুরুষের চেয়ে নারীর মৃত্যু দ্বিগুণ নাঈম-মুশফিকের অর্ধশতকে ১৭১ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর‘তিস্তায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে
স্বামী স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষা
মুফতী আইনুল ইসলাম কান্ধলবী
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২১:১৮:০৯
প্রিন্টঅ-অ+

একটা কথা সারা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, নারীদের মুখ নিয়ন্ত্রণে থাকে না, আর পুরুষদের হাত নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সুতরাং যাদের ঘরে বদজবান স্ত্রী রয়েছে, সে কোন দিন শান্তি পেতে পারে না। সে কোন দিন সুখের ছোঁয়া পেতে পারে না। তার পুরো জীবনটাই মাটি হয়ে যায়। এজন্য নারীদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নারীরা যেন নরম সুরে কথা বলে। মিষ্টি সুরে কথা বলে। ভদ্রভাবে উত্তম ভাষায় কথা বলে। শরিয়তের নির্দেশ হলো, স্ত্রীরা স্বামীর সাথে নম্রতার সাথে কথা বলবে, আর পরপুরুষের সাথে কথা বলবে কর্কশ সুরে।


কিন্তু বর্তমান ফ্যাশনাবল নারীদের চিত্রটা উল্টো। স্বামীর সাথে যখন কথা বলে, তখন যেন দুনিয়ার সব তিক্ততা তার মুখে এসে জড়ো হয়। আর পরপুরুষের সাথে যখন কথা বলে তখন যেন দুনিয়ার সমস্ত মিষ্টতা তার মুখে এসে ভিড় করে। মনে রাখবেন, তরবারি যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না, জবান তা ছিন্ন করতে পারে। নারীদের জবান তরবারির চেয়ে অধিক ধারালো। তাদের জবানের তরবারিতে কখনোই মরিচা পড়ে না। এমনকি অনেক নারীর ঘর-সংসার নষ্টই হয় তাদের বদজবানের কারণে। বদগুমানি ও কুধারণার কারণে।


এজন্য শরিয়তের নির্দেশ হলো মাহরামদের সাথে নম্রভাষায় কথা বলবে। আর পরপুরুষদের সাথে কড়াস্বরে কথা বলবে। আর বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার দিকে যদি আমরা নজর দেই, তবে দেখতে পাবো একজন স্ত্রী প্রতিবেশি পরপুরুষের সাথে যে পরিমাণ মিষ্টতা, কোমলতা ও ভদ্রতা নিয়ে কথা বলে, নিজের স্বামীর সাথে যদি দিনে একবারও সেভাবে কথা বলতো, তবে কোনদিন তার সংসার ভাঙতো না। ঠিক স্বামী পরনারীর প্রতি যে পরিমাণ ভালোবাসা নিয়ে তাকায়, নিজ স্ত্রীকে যদি সেই পরিমাণ ভালোবাসা নিয়ে দিনে একবারও তাকায়, তবে কোনদিন তার সংসার ভাঙবে না।


নবি কারিম (সা.) স্বামী-স্ত্রীর হকসমূহ নিয়ে আলোচনা করে স্ত্রীদেরকে বলেছেন, শরিয়ত আল্লাহকে ছাড়া অন্য কাউকে যদি সিজদা করার অনুমতি দিত, তাহলে আমি স্ত্রীদেরকে নির্দেশ দিতাম তারা যেন তাদের স্বামীদের সিজদা করে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, যে নারী তার উপর অর্পিত ফরজসমূহ আদায় করা অবস্থায় মারা যায় এবং সে অবস্থায় তার স্বামী তার উপর সন্তষ্ট থাকে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতের সমস্ত দরজা খুলে দেন। যাতে সে হিসাব নিকাশ ছাড়াই সোজা জান্নাতে চলে যেতে পারে। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে, কোন স্ত্রীর উপর যদি তার স্বামী যৌক্তিক কারণে অসন্তুষ্ট হয়, আর স্ত্রী জিদ করে থাকে, স্বামীর চাওয়া পুরা না করে এবং স্বামী সে অবস্থাতেই ঘুমিয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর ফেরেস্তাগণ সারা রাত ঐ স্ত্রীর উপর লানত বর্ষণ করতে থাকে।


এ থেকে বুঝা যায়, স্বামীর সন্তষ্টির উপর আল্লাহর সন্তষ্টি। স্বামী খুশি থাকলে আল্লাহ তায়ালাও খুশি থাকেন। স্বামীর আনুগত্যের ব্যাপারে মহিলা সাহাবিয়াদের বিস্ময়কর অনেক ঘটনা রয়েছে। আমাদের সেগুলো বেশি বেশি পড়া উচিত এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেয়া দরকার। এক মহিলা সাহাবির স্বামী জিহাদে চলে গেছেন। তার অবর্তমানে তার ঘরে আল্লাহ তায়ালা এক ছেলে সন্তান দান করলেন। সাহাবি যেদিন জিহাদের ময়দান থেকে ফেরেন, ঐদিনই তার ফিরে আসার কিছুক্ষণ আগে ছেলেটা মারা যায়। মহিলা সাহাবি ভাবলেন, স্বামী আমার কতদিন পর আসছেন। এসেই যদি শুনতে পায় তার সন্তান মারা  গেছে, তবে আমার স্বামী কষ্ট পাবেন। তিনি ছেলেকে গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরিয়ে রাখেন। স্বামী ঘরে এসে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইল আমি জিহাদে যাওয়ার পরে তো আমাদের ঘরে নতুন অতিথি আসার কথা ছিলো তার কি খবর? বিবি শান্ত স্বরে উত্তর দেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে একটি ছেলে সন্তান দান করেছেন। সাহাবি আবার জানতে চাইলেন কোথায় আমার ছেলে? স্ত্রী স্বামীকে উত্তর দেন সে শান্তিতে আছে। মহিলা বুঝাতে চাচ্ছেন ছেলে ঘুমিয়ে আছে। স্বামী খাবার খায়। বিশ্রাম নেয়। সফরের কারগুজারি শুনে ও শোনায়।


ভেবে দেখুন সেই মায়ের অন্তর্জগতে কি ঝড়টাই না বয়ে যাচ্ছে। মাছুম বাচ্চার লাশ ঘরে, চৌকিতে শোয়া। কিন্তু স্বামীকে পেরেশান না করার জন্য কষ্টের পাথর কিভাবে বুকে ধারণ করে আছেন। তিনি জানেন, স্বামীকে প্রকৃত ঘটনা বললে, সে খাবে না। পেরেশান হয়ে পড়বে। দীর্ঘ সফর শেষে তার আরামের প্রয়োজন। তাই তিনি সব কষ্ট বুকের মাঝে পাথরচাপা দিয়ে স্বামীর সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন। খোশগল্প করছেন। এভাবেই তাদের রাত শেষ হয়ে সকাল হয়। সকালে যখন দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ল, স্ত্রী স্বামীর কাছে বসে বিনয়ের সাথে জানতে চাইল আমি আপনার কাছে একটা প্রশ্ন করতে চাই? স্বামী বললো ঠিক আছে বলো কি জানতে চাও। স্ত্রী বললেন, কেউ যদি কাউকে কোন আমানত দেয় এবং কয়েকদিন পর তা ফিরিয়ে নেয়, তখন কি সেই আমানত হাসি মুখে ফিরিয়ে দেয়া উচিত নাকি এর জন্য কষ্ট পাওয়া উচিত। স্বামী বললেন, হাসিমুখে ফিরিয়ে দেয়া উচিত। স্ত্রী বললেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকেও আমানত দিয়েছিলেন। আপনি বাড়ি পৌঁছার কিছুক্ষণ পূর্বে আল্লাহ তায়ালা যে আমানত দিয়েছিলেন সেই আমানত ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। এখন উঠুন হাসিমুখে আল্লাহকে তার আমানত ফিরেয়ে দিয়ে আসুন। আল্লাহু আকবার! দেখুন মহিলা কেমন অপূর্বভাবে তার ভদ্রতা দেখালেন সামাজিক হক আদায় করলেন। সকালে ঐ সাহাবি রাসুল (সা.)-এর দরবারে হাজির হলেন এবং বাড়ির সব ইতিবৃত্ত শোনালেন। তিনি বললেন, আমার স্ত্রী আমাকে খুশি রাখার জন্য এমন ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আল্লাহর নবি (সা.) সব শুনে দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা ঐ রাতে বরকত দান করলেন। ঐ রাতের সহবাসের দরুন মহিলা গর্ভবতী হলেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে একটি ছেলে দান করলেন। সেই ছেলে কুরআনের হাফেজ হয়েছিল হাদিসেরও হাফেজ হয়েছিল। আমরা এবার স্বামীর উপর স্ত্রীর কি কি হক রয়েছে তা জানার চেষ্টা করবো।


স্বামীর উপর স্ত্রীর প্রথম হক হলো স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। একটা কথা মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা নারীকে তার নিজের ভরণপোষণের দায়িত্ব দেয়নি। মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার পিতার উপর। বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব ভাইয়ের উপর। মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার সন্তানের উপর। মেয়ে থেকে মা হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা ভরণপোষণের জন্য নারীর উপর কোন দায়িত্ব দেননি। দায়িত্ব দিয়েছেন পিতা, স্বামী ও সন্তানকে। মোটকথা স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর সবধরনের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। যার যার সমর্থ অনুযায়ী স্ত্রীকে হাত খরচাদি অবশ্যই দিতে হবে। উল্লেখ্য বিষয় হলো, স্ত্রীকে হাত খরচ টাকা যা দিবে এই বিষয়ে তাকে জবাবদিহিতা করা যাবে না যে, সে টাকা কোথায় খরচ করবে? সে যে কোনো হালতে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে। স্ত্রীর আরেকটা হক হলো বিয়ের পর তাকে আলাদা একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। প্রয়োজনে একান্নভুক্ত ফ্যামিলিতে একটি রূমের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন। 


লেখক : খতীব, পূর্ব বাড্ডা পুরাতন জামে মসজিদ, ঢাকা


আমার বার্তা/ সি এইচ কে

আরো পড়ুন