শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন
বইয়ের আলোয় দূর হোক তিমির
০৩ মার্চ, ২০২২ ২১:৩৮:১৯
প্রিন্টঅ-অ+

 


বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। যে জাতি যতো শিক্ষিত, জ্ঞানচর্চায় নিমজ্জিত সে জাতি ততো উন্নত ও শক্তিমান। বই মূলত একজন মানুষের মনের খোরাক মেটায়। মননে চিন্তায় প্রশান্তির ধারা প্রবাহিত করে। এজন্যই কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি কখনোই সহিংস-নৃশংস হতে পারে না। ইসলামের প্রতিটি অমোঘবাণী মনুষ্যজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য কিংবা বিশ্বের যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য। তাইতো ইসলাম মানবজাতিকে সবসময় জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। কুরআনুল কারীমের সর্বপ্রথম আয়াতটি নাযিল হয়েছে ‘পড়া-সংক্রান্ত’।


 


অথচ তখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বিশ্বাসের কথা, ইবাদতের কথা, আমলের কথা, জিকিরের কথাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথাও আসতে পারতো। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার সর্বপ্রথম প্রত্যাদেশ ছিলো পড়ো। কারণ, যে কোনো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পড়বে, তার জন্য সে উদ্দেশ্যের পথ উম্মোচিত হবে। আল্লাহ পাকের অভিলাষ, তাঁর বান্দা তার মহান সৃষ্টিকর্তার পরিচয় এবং তার সুবিশাল সৃষ্টি জগত সম্পর্কে সে অবহিত হোক। এর মাধ্যমে তাঁকে সঠিকভাবে জানুক। এজন্যই হাদীসে পাকে এসেছে, ‘প্রত্যেক মুমিন নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক’। আর জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের পড়তে হবে সববয়সে, সবসময়।


 


ইসলামের ইতিহাস বলে, তথ্য-জ্ঞানচর্চার যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার মুসলিম সাম্রাজ্যে মুসলমানগন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা এযুগে এসে বিশ্বাস করাও আশ্চর্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ, এটা মুসলিম জাতির অনন্য ঐতিহ্য। তাই দেখা যায়, মুসলিম সাম্রাজ্যে যখন-ই শত্রুরা আক্রমণ করেছে, তখন-ই তারা ইসলামী জ্ঞান-ভা-ার; পাঠাগার, গ্রন্থাগার, লাইব্রেরি ধ্বংস করার অপতৎপরতা দেখিয়েছে। তারা জানত, ইলম-জ্ঞানই হচ্ছে জাতির মেরুদ-। এটা ভেঙে দিলে কোনো সময়ই মুসলিম জনগোষ্ঠী ধরণীতলে উচ্চ শিরে দাঁড়াতে পারবে না। 


 


হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা হতে হবে মজবুত। শেকড়ের অতীত ও ঐতিহ্য আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ মিলেমিশে ছড়াবে আশার আলো। বর্ণমালার দীপক আলো মেলে ধরবে আগামী দিনের পথ।


 


ভাষায় মাসকে কেন্দ্র করে বাঙালীদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রন্থ সংগ্রহ ও অধ্যয়নের বিপুল পিপাসা সৃষ্টি হয়। জ্ঞান আহরণের পিপাসা। সে উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেরকম একটি আয়োজন, যা সব বাঙালিলর প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তা হলো ‘অমর একুশে বইমেলা’। তখন বাঙালির প্রাণের উচ্ছ্বাসটা বেড়ে যায় বহুগুণে, বহু আনন্দে। বইপ্রেমীরা ভাসতে থাকে আনন্দের জোয়ারে। এখন একটি পাঠ্যানুরাগী প্রজন্ম গড়ে তুলতে এবং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির লালন ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে এই পার্বণটি।


 


কিন্তু পরিতাপ! নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে যখন শোনা যায়, মেলায় বই প্রদর্শনে বা পুস্তক বিপনিতে ধর্মীয়; বিশেষভাবে ইসলামী বই প্রকাশে তথাকথিত বুদ্ধিজীবী কিংবা প-িত পর্যায়ের অনেকের যে অমূলক অনীহা ও বৈরিতাভাবের প্রকাশ ঘটে, তা সত্যিই দুঃখজনক ও পরিতাপের। তাছাড়া ইসলামী গ্রন্থের চাহিদা পাঠকমহলে কম নয়। সাধারণ মানুষ ভেবে পায় না, যেখানে অদৃষ্ট প্রচ্ছদে চটিবই টং-দোকানের আদলে যাচ্ছে তাই প্রকাশনী, সাথে মুদ্রণপ্রমাদ, মানহীন ভাষার ব্যবহার-অপব্যবহারের ছড়াছড়ি, তারা বইমেলার বিশাল অংশ নিয়ে বসে আছে, এদের বদলে কিংবা এদের সাথেই ইসলামী বইয়ের স্টল দিতে গুরুজনদের (?) আপত্তি কোথায়! সত্য, সুন্দর ও সভ্যতা সৃজনের অঙ্গীকারবদ্ধ নয়, এমন রচনা বই হয় কী করে! সবকিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও নিছক কিছু নিয়ম আর কিছু অযুহাতের জটিলতায় ইসলামী প্রকাশনীগুলো মেলায় অংশ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন না। 


 


ভালো বই মানব সভ্যতার প্রাণসত্তা। মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলে। এতে ধর্মীয় বইয়ের অবদান ও আবেদন অনস্বীকার্য। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হতে ভালো বই অধ্যায়নের বিকল্প নেই। প্রকৃত বইয়ের সৃষ্টি যে ওহি থেকে, এ নিয়ে শিক্ষিতসমাজে তর্ক চলে না। আলো-সমৃদ্ধ মনুষ্যসভ্যতা এবং বিকশিত মানবতার গোড়ায়ই যে ওহির আলো দীপকরূপে কার্যকর-পৃথিবীর ইতিহাস জুড়ে সদারিত বই-ই তার সমুজ্জ্বল প্রমাণ। 


 


এদেশের মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই এক অনিশ্চয়তা আর আরেকটা এক কেন্দ্রিক মানসিকতার অসুখে ভোগে। বইমেলাকে অন্তত এর থেকে মুক্তি দেওয়া দরকার।


 


রাষ্ট্রও চায় সবপ্রকার বইয়ের সাথে ধর্মীয় বইয়ের চর্চা হোক! কেননা ধর্মীয় বই এর মত অন্য কোনো বই মনুষ্য মূল্যবোধের প্রকৃত উন্মেষ ঘটাতে পারে না। জ্ঞান অর্জনের তাগিদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ’বল, যারা জানে আর যারা না জানে তারা কি সমান হতে পারে’? (সূরা যুমার : ০৯) 


 


সূরা আনকাবুতের ৪৩ নম্বর আয়াতে আরো বিধৃত হয়েছে, ‘আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য পেশ করি। বিদ্বানজন ছাড়া কেউ তা বোঝে না’। কুরআনুল কারিমে মানুষ জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ‘বলো! রাব্বি যিদনী ইলমা’। 


বই হলো মানুষের মননতৃষ্ণা নিবারণ ও অবসর যাপনের প্রধান অনুষঙ্গ। আমরা চাই এদেশের মানুষ নিজেদের ঋদ্ধ করুক সব ধরনের বইয়ের সৌরভে, সব বইয়ের আলোকবিভায়। বৈষম্য আর বিদ্বেষ ঘুঁচে যাক বইয়ের শক্তিতে। জ্ঞানচর্চার মঞ্চ উন্মুক্ত হোক সবশ্রেণি-পেশা মানুষের জন্য। প্রকৃত জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হোক বাঙালির এই প্রাণের মেলা। এই মেলার অব্যাহত থাকুক সবার জন্য, সবসময়।


 


yasinnizamiyamin123@gmail.com


 

আরো পড়ুন