সাভার-আশুলিয়া সিটি কর্পোরেশন: প্রশাসনিক রূপান্তর ও নাগরিক প্রত্যাশা
প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ
মো. মাসুম কবির, আশুলিয়া (ঢাকা):

সাভার ও আশুলিয়া দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। দেশের অর্থনীতির ফুসফুস হিসেবে পরিচিত এই দুই অঞ্চলকে একীভূত করে সাভার-আশুলিয়া সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সরকারের এই প্রশাসনিক রূপান্তরের সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখছেন প্রায় ৩০ লাখ স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসিন্দা। তবে নতুন এই রূপান্তর ঘিরে যেমন রয়েছে ব্যাপক উদ্দীপনা, তেমনি রয়েছে বর্ধিত কর ও নাগরিক সেবা প্রাপ্তি নিয়ে নানামুখী শঙ্কা।
সাভার পৌরসভা এবং আশুলিয়ার জামগড়া, ইয়ারপুর, ধামসোনা ও শিমুলিয়া ইউনিয়নগুলোর ব্যাপক নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ বা ক্ষুদ্র পৌরসভা কাঠামো দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা উন্নত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ও রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করলে এটি হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সিটি কর্পোরেশন। প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এলে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ যেমন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে, তেমনি এলাকাটি পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আসবে।
আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকার পোশাক শ্রমিক রহিম মিয়া বলেন, আমরা ট্যাক্স দেই কিন্তু জলাবদ্ধতা আর ধুলার কারণে রাস্তা দিয়ে চলা যায় না। সিটি কর্পোরেশন হলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর রাস্তাঘাট যদি ঠিক হয়, তবেই আমাদের লাভ। তবে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক জ্যাম মুক্ত শহর পাওয়ার প্রত্যাশা সবার উপরে।
অন্যদিকে, এই রূপান্তরকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু শঙ্কাও কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো হোল্ডিং ট্যাক্স এবং ট্রেড লাইসেন্স ফি বৃদ্ধি। পোশাক শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সিটি কর্পোরেশন হলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। মো. সজল আহমেদ নামের একজন স্থায়ী বাসিন্দা আমার বার্তার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখনই বাড়ি করতে গেলে পৌরসভায় মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিতে হয়, তার উপর সিটি কর্পোরেশন হলে তো কথাই নাই। সেরকম অংকের বাড়ি-ভাড়া পাওয়া মুশকিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (BIP) এর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এই সিটি কর্পোরেশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শিল্প ও আবাসিকের সঠিক সমন্বয় ঘটানো। নগর পরিকল্পনাবিদ ডক্টর আদিল মুহাম্মদ খান এই রূপান্তর প্রসঙ্গে বলেন, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় শত শত পোশাক কারখানা ও ওয়াশিং প্ল্যান্ট থাকায় এখানকার নদী ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, বংশী ও তুরাগ নদীর দূষণ রোধে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলে সেখানে পরিবেশ রক্ষা ও বর্জ্য শোধনাগার (ETP) ব্যবস্থাপনার ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর প্রশাসনিক শক্তি তৈরি হবে। এছাড়া বংশী ও তুরাগ নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে এই অঞ্চলটি একটি স্মার্ট শিল্পনগরে পরিণত হতে পারবে।
সাভার পৌরসভার কর্মকর্তাদের মতে, সিটি কর্পোরেশন হলে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ কয়েকগুণ বাড়বে, যা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বংশী ও তুরাগ নদীর দূষণ রোধে এটি একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
এ বিষয়ে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু বলেন, সাভার ও আশুলিয়া এখন আর কোনো সাধারণ এলাকা নয়, এটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এখানে বর্তমানে যে বিশাল জনগোষ্ঠীর বসবাস, তাদের উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশন গঠনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই রূপান্তরের ফলে এলাকার রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আসবে। তবে জনগণের ট্যাক্স বা আর্থিক বোঝার বিষয়টি যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং তারা যেন ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পায়, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা হবে। স্থানীয় এই জনপ্রতিনিধির মতে, সাভার-আশুলিয়া সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়িত হলে এটি হবে একটি পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত তিলোত্তমা শিল্পনগরী।
সাভার-আশুলিয়া সিটি কর্পোরেশন কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের মানুষের আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রবেশদ্বার। কেবল কাগজে-কলমে নয়, সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও যেন এটি একটি স্মার্ট ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়। ভোটারদের প্রত্যাশা, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে সাভার-আশুলিয়া অচিরেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মতো আধুনিক ও উন্নত জনপদে রূপান্তরিত হবে।
আমার বার্তা/মো. মাসুম কবির/এমই
