আ.লীগ পতনের পর জাতিকে বিনির্মাণ করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

আওয়ামী লীগের পতনের পর আমাদের সামনে একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরি হয়েছিল— রাষ্ট্র ও জাতিকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার। সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। আওয়ামী লীগের বিচার হওয়া উচিত ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে, স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তার বদলে আমরা এক ধরনের স্থায়ী ফোবিয়ায় ঢুকে পড়েছি।
বৃহস্পতিবার (০৮ ডিসেম্বর) সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের আয়োজনে এক পলিসি ডায়ালগে এসব কথা বলেন বক্তারা।
পলিসি ডায়ালগে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনী অঙ্গীকার একটি চুক্তি, দলের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে চুক্তি। এটা মানা বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক দলগুলো যে ইশতেহার দেবে সেটা যেন জাস্টিসিয়েবল (আইনত বাধ্যকর) হয়। নাগরিকদের আদালতে গিয়ে কী কী বাস্তবায়ন হয়েছে, সেটা দেখার সুযোগ থাকে। আমি জানি না এটা আদালত গ্রহণ করবে কি না।”
তিনি বলেন, “নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য। শুধু এগুলো হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে না। নির্বাচিত সরকার কী করে তার ওপর নির্ভর করে গণতন্ত্র কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সংস্কার দরকার। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন থাকতে পারবে না এটা আইনে আছে। কিন্তু ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নাম দিয়ে তকমা রেখেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝে-শুনে ইশতেহার করতে হবে। তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে গণভোটে তারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে নাকি ‘না’-এর পক্ষে।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, “কোনো দেশের গণতন্ত্রের মান কেমন সেটা মূল্যায়ন করা যায় সে দেশের সংখ্যালঘুরা তাদের অধিকার নিয়ে কী ভাবছে তা থেকে; সংবিধানে যাই থাকুক না কেন। সবাই বলে আমরা এটা করব ওটা করব, কিন্তু এসব করার জন্য একটি পলিসি এবং টাইমলাইন দরকার।”
তিনি বলেন, “আমি যখন হার্ভার্ডে যাই তখন নারী সদস্য বা অন্য বর্ণের উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু তারা পলিসি নিয়েছিল, যে কারণে ভর্তি করার সময় নারী কত, হোয়াইট বা ব্ল্যাক কত—এগুলোও দেখা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন সামনে। মাইনোরিটি তো বাদ দিলাম, সাধারণ মানুষও বলছে তারা নিরাপত্তা চায়। সবাই নিরাপত্তা চাচ্ছে, অধিকারের কথা ভুলেই গেছে— আমরা এই অবস্থায় আছি। প্রোটেকশন দেওয়া একটা চ্যারিটি হয়ে যাচ্ছে। সবার মনে চিন্তা— আমাকে নিরাপত্তা দাও, প্রোটেকশন দাও। নির্বাচন আসলে মাইনোরিটিরা ভয়ে থাকে। এক তো তারা চিহ্নিত যে তারা লীগকে ভোট দিয়েছে; তারা কাকে দিয়েছে সেটা যাচাই করারও সুযোগ নেই। আগের মতো যদি হয় যে—‘আমাদের ভোট দাওনি তাই জুলুম হবে’, এখন যদি আবার এমন হয় সেটার জন্য প্রস্তুতি কী সেটাও আমরা জানি না। এখন যে দ্বন্দ্ব হচ্ছে তা শুধু দলে দলে না, দলের অভ্যন্তরের কোন্দলের জন্যও হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “মাইনোরিটির যারা সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়ানোর লোক নেই। রাজনৈতিক কর্মীদের শুধু ভোট টানা আর বিরিয়ানি খাওয়ানো নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে। কখন আমরা ভালো নির্বাচনে যেতে পারব এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। অনেকে বলছে যা হচ্ছে একটা হয়ে যাক। মানুষ অন্ধ বিশ্বাস রাখছে নির্বাচনের পর সংকট কাটবে, কিন্তু আসলে সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই।”
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “আওয়ামী লীগের পতনের পর আমাদের সামনে একটি ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরি হয়েছিল— রাষ্ট্র ও জাতিকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার। সুযোগ ছিল, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। আওয়ামী লীগের বিচার হওয়া উচিত ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে, স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তার বদলে আমরা ঢুকে পড়েছি এক ধরনের স্থায়ী ফোবিয়ায়—‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে’, ‘সব দোষ আওয়ামী লীগের’, ‘ভোট হলে তারা আবার ক্ষমতায় যাবে’। এই ভয় থেকেই দেশে তৈরি হয়েছে নব্য স্বৈরাচার, নব্য ফ্যাসিজম এবং একটি ভয়ংকর ভিকটিম সাইকোলজি। আজ যাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে, তারাই একদিন প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে—এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।”
তিনি বলেন, “প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গত ১৬–১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রেখেছে। শেখ হাসিনার সময় প্রথম আলো রাষ্ট্রীয় অনুকম্পা পায়নি, কিন্তু তখনও সেখানে আগুন দেওয়া হয়নি। অথচ ড. ইউনূসের সময় প্রথম আলোতে আগুন দেওয়া হলো। আমি পুরো ভিডিও দেখেছি। সেখানে স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্রেকডাউন দেখা যায়। পাঁচ মিনিটে ফোর্স পাঠানো সম্ভব ছিল, কিন্তু পাঠানো হয়েছে অনেক দেরিতে। ফোর্স এসে আবার সময় চায়—‘২০ মিনিট দেন’। এভাবে কি রাষ্ট্র চলে? এভাবে কি দেশ টিকে থাকে?”
শামীম হায়দার পাটোয়ারী আরও বলেন, “আলাউদ্দিন খিলজির গল্প এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি মঙ্গোল আক্রমণের ভয়ে দিল্লিতে থাকা ৩০০ মঙ্গোলকে এক নির্দেশে হত্যা করেছিলেন। পরে দেখা গেল, আক্রমণই হয়নি। এই ভয়—‘ওরা আসবে’—এই ফোবিয়া থেকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। আজও আমরা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা অর্গানিকভাবে হবে না। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা স্বাভাবিকভাবে বা অর্গানিকভাবে হবে—এটা একটি বিভ্রম। সুষ্ঠু ভোট হলেই তৃতীয় লিঙ্গের কেউ সংসদে যাবে—এটা বাস্তব নয়। সুষ্ঠু ভোট হলেই আদিবাসী প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে—এটাও বাস্তব নয়। এর জন্য দরকার স্পেসিফিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থা।”
আমার বার্তা/এমই
