ইরান যুদ্ধের প্রভাব: তেল ঘাটতি থেকে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৭ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

ইরান যুদ্ধের এক মাস পেরোতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের ঘাটতি আরও বড় এক সংকটে রূপ নিতে শুরু করেছে, প্রায় সবকিছুতেই ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ কমে গেছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করেনি, বরং জুতা, পোশাক, প্লাস্টিক ব্যাগের মতো নিত্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত পেট্রোকেমিক্যালের সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই চাপ এখন ছড়িয়ে পড়ছে ভোক্তা বাজারের প্রতিটি খাতে। প্লাস্টিক, রাবার, পলিয়েস্টারের মতো কাঁচামালের দাম বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে এশিয়ায়, যেখানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন হয় এবং যা তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মানুষ আতঙ্কে আবর্জনার ব্যাগ কিনে মজুত করছে, ফলে সরকার অনুষ্ঠান আয়োজকদের একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য কম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
তাইওয়ান প্লাস্টিক সংকটে পড়া উৎপাদনকারীদের জন্য হটলাইন চালু করেছে, আর কৃষকরা বলছেন ভ্যাকুয়াম প্যাকেট না পাওয়ায় চালের দাম বাড়াতে হতে পারে।
জাপানে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, প্লাস্টিকের চিকিৎসা টিউবের অভাবে কিডনি রোগীরা হেমোডায়ালাইসিস চিকিৎসা নাও পেতে পারেন। মালয়েশিয়ার গ্লাভস প্রস্তুতকারকরা বলছে, রাবার ল্যাটেক্স তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতি বৈশ্বিক চিকিৎসা গ্লাভস সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞ ড্যান মার্টিন বলেন, এই সংকট খুব দ্রুত সবকিছুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে—বিয়ার, নুডলস, চিপস, খেলনা, প্রসাধনী সবখানেই।
কারণ প্লাস্টিকের ঢাকনা, বাক্স, প্যাকেট ও কন্টেইনার পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তেলের উপপণ্য দরকার হয় জুতা ও আসবাবের আঠা, যন্ত্রের লুব্রিকেন্ট, রং ও পরিষ্কারক দ্রবণ তৈরিতেও।
এই সংকট বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিচ্ছে। উৎপাদনকারীদের খরচ বাড়ছে, ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দামও বাড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ও ভ্রমণ ব্যাহত হচ্ছে, আর সার ও হিলিয়ামের মতো পণ্যের ঘাটতি খাদ্য ও ইলেকট্রনিক্সের দাম বাড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, ‘এই ধরনের জটিল প্রভাব এমন সময়ে আসছে যখন অনেক অর্থনীতিরই ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। যেভাবেই হোক, ফলাফল একটাই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধি।’
বিকল্প নেই
যুদ্ধের প্রভাব সামাল দিতে দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ছে। কিন্তু সংকটের বড় কারণ ন্যাপথার ঘাটতি, যা প্লাস্টিকসহ কৃত্রিম উপাদান তৈরির জন্য অপরিহার্য, আর যার বিকল্প প্রায় নেই।
এশিয়ার অনেক পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি উৎপাদন কমিয়েছে বা ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে চুক্তি পূরণে অক্ষম।
দক্ষিণ কোরিয়া রাশিয়া থেকে ন্যাপথা আমদানি শুরু করেছে এবং নিজেদের সরবরাহ ধরে রাখতে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যাফথার ঘাটতির কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও চিকিৎসা প্যাকেজিংয়ের মতো পণ্যে। ‘বাস্তবে তেমন কোনো উপায় নেই, উৎপাদন কমানো বা বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো ছাড়া,’ বলেন মার্টিন।
দামের ঊর্ধ্বগতি
প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। আইসিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এশিয়ায় প্লাস্টিক রেজিনের দাম ৫৯% পর্যন্ত বেড়েছে।
থাইল্যান্ডে প্লাস্টিক ব্যাগের দাম ১০% বেড়েছে, ভারতে বোতলের ঢাকনার দাম চারগুণ হয়েছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নুডলস কোম্পানি বলছে তাদের প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের মজুত মাত্র এক মাসের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রসাধনীর মতো পণ্য যেগুলো প্লাস্টিক প্যাকেজিংয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল, সেসব পণ্য দ্রুত সংকটে পড়তে পারে।
পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ছে
এশিয়ায় শুরু হওয়া এই সংকট ধীরে ধীরে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে ন্যাপথা, প্লাস্টিক, সার, হিলিয়াম উৎপাদনের বড় উৎস। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে সারের দাম বেড়েছে। ভারতে কনডম প্রস্তুতকারকরাও কাঁচামালের ঘাটতিতে পড়েছে।
জেপি মরগ্যান বলছে, এই সংকট একসাথে নয়, ধাপে ধাপে বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে; যেমন করোনা মহামারি সময় হয়েছিল।
অনিশ্চয়তা
চীনের এক পলিয়েস্টার উৎপাদক জানান, কাঁচামালের দাম ৫০% বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতারা সেই দাম মেনে নিতে পারছে না। ফলে তিনি নতুন উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরো শিল্পই অনিশ্চয়তায় আছে। যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে কেউ জানে না।’
অনেকে খরচ কমাতে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাচ্ছে বা কাগজ, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম বা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজছে। তবে এসবের খরচ বেশি এবং উৎপাদন বদলাতে সময় লাগবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী আবার খুলে গেলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্লাস্টিক খাতে অন্তত কয়েক মাস সময় লাগবে। সূত্র : সিএনএন
