বাংলাদেশ সীমান্তে কুমির-বিষধর সাপ ছাড়তে চায় বিএসএফ

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর নদী তীরবর্তী অঞ্চলে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়তে চায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। এ সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বরাবর পেশও করেছেন বিএসএফ কর্মকর্তারা।

এই পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি দিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যেসব এলাকায় বেড়া দেওয়া কঠিন, সেসব জায়গায় কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দিলে সেগুলো অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।

উল্লেখ্য, ভারতের ৫টি রাজ্যের সঙ্গে সীমান্ত আছে বাংলাদেশের। এই রাজ্যগুলো হলো— পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং মিজোরাম। এই ৫ প্রদেশের সঙ্গে মোট ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের।

দীর্ঘ এই সীমান্তটি কিছু দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নদী এবং জলাভূমিও। বিএসএফ জানিয়েছে, এসব জায়গায় বেড়া দেওয়া অসম্ভব।

বিএসএফের মূল কাজের এলাকা বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান সীমান্ত। গত ২৬ মার্চ বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠক হয়। সেই বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় এবং উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কর্মকর্তাদের চিঠি দেওয়া হয়।

সেই চিঠিতে সীমান্তের ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথের ফাঁকগুলোতে সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা’ খতিয়ে দেখার বিএএফ কেন্দ্রীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ-ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জুড়ে বেড়া দিয়েছে নয়াদিল্লি; কিন্তু বাকি অংশে রয়েছে জলাভূমি ও নদী তীরবর্তী এলাকা, যার উভয় পাশে স্থানীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে।

সাম্প্রতিক এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএসএফ তার ইউনিটগুলোকে সীমান্তবর্তী নদীপথের ফাঁকফোকরগুলো সরীসৃপের ব্যবহারের জন্য কতখানি উপযোগী তা ‘নিবিড়ভাবে’ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। এই খবরটি প্রথম প্রকাশ করে ভারতের আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম ‘নর্থইস্ট নিউজ’।

গত বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “প্রতিকূল ভূখণ্ড সত্ত্বেও বিএসএফ বাংলাদেশ থেকে অবৈধ সীমান্ত পারাপার এবং নথিবিহীন অভিবাসন রোধে নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে।”

তবে সেই প্রতিবেদনে এ-ও উল্লেখ করা হয়েছিল, “নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকা, সীমান্তের নিকটবর্তী বসতি, বিচারাধীন ভূমি অধিগ্রহণ মামলা এবং সীমান্তবাসীর প্রতিবাদের মতো কিছু সমস্যাপূর্ণ এলাকার কারণে এই সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু অংশে বেড়া স্থাপনের কাজ ধীর হয়ে গেছে।”

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার গত বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিজেপির অভিযোগ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপকহারে প্রবেশের কারণে এসব রাজ্যের জনবিন্যাস বা ডেমোগ্রাফির পরিবর্তন ঘটছে।

তবে বিজেপির বলে মনে করেন ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তরপূর্বাঞ্চল সীমান্ত বিশেষজ্ঞ অংশুমান চৌধুরী এ-কে একটি ‘অশুভ’, ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘হাস্যকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে তিনি বলেন, “এটি একই সঙ্গে অশুভ, বিপজ্জনক এবং হাস্যকর পরিকল্পনা। এটা উদ্ভট। আপনি সীমান্ত এলাকায় সাপ-কুমির ছাড়তেই পারেন, কিন্তু কামড় দেওয়ার সময় কিংবা ছোবল দেওয়ার সময় কি এসব সরীসৃপ বাংলাদেশি আর ভারতের নাগরিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে?”

যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের ভারতীয় শাখার স্ট্র্যাটেজি ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান রথীন বর্মণ, সরকার যদি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নদী-জলাভূমিতে সাপ-কুমির ছাড়ে— তাহলে তা একই সঙ্গে এসব সরীসৃপের জীবন এবং সেসব এলাকার স্থানীয় বাস্তুসংস্থান গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

আলজাজিরাকে রথীন বর্মণ বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের নদী-খালগুলোতে এক প্রকার কুমির দেখা যায়, আসামের সংরক্ষিত জলাভূমিগুলোতেও মিঠা পানির কুমিরের একটি প্রজাতি রয়েছে। তবে এ দু’টি অঞ্চলই ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে অনেক দূরে এবং এবং এসব কুমির সীমান্তবর্তী নদী-জলাভূমির পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত নয়।”

“ফলে যদি এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়— তাহলে প্রথম দিকেই এসব কুমির মারা পড়বে। বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।”

“আর যদি কোনো কারণে কিছু সাপ-কুমির বেঁচে যায়, তাহলে সেসব এলাকার স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থানে গুরুতর বিশৃঙ্খলা ও ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। অনেক প্রাণী হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে।”

এর আগে কি কোথাও এমন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে?

আধুনিক সময়ে বিশ্বের কোথাও সীমান্ত এলকায় বিপজ্জনক সরীসৃপ ছাড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন, সে সময় মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার দেশগুলো থেকে আগত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জোয়ার ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় পরিখা তৈরি করে তাতে সাপ-কুমির ছেড়ে দেওয়া এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দেখামাত্র পায়ে গুলি করার একটি প্রস্তাব তার কাছে উত্থাপন করা হয়েছিল।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে বলেছিলেন, “আমি হয়তো সীমান্ত সুরক্ষা ইস্যুতে কঠিন, কিন্তু এতটা নিষ্ঠুর আমি নই।”

সূত্র : আলজাজিরা