স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে ইসি

প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬, ১০:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ, ইভিএম ব্যবহার না করা, পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল, প্রার্থীদের জামানত বাড়ানো এবং দলীয় প্রতীকের বদলে নির্দলীয়ভাবে ভোট আয়োজনসহ একগুচ্ছ বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

বছরের শেষ দিকে নির্বাচন চায় ইসি: গত ১৯ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। তিনি জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সরকারের।

তবে সরকারের এই পরিকল্পনার সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচন শুরুর আলোচনা থাকলেও ইসি অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে ভোট আয়োজন করতে চায়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুম থাকায় নির্বাচন পেছানোর চিন্তা করছে কমিশন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “কিছুদিন আগেও আগস্ট মাসের কথা বলা হয়েছিল। পরে সেটা সেপ্টেম্বর হয়েছে। এখন সরকার সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করতে বলছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তো বর্ষা থাকে। ওই সময়ে আমাকে যদি মিঠামইনে নির্বাচন করতে বলা হয়, সেটা কি সম্ভব? বরিশালে করতে পারবো? ময়মনসিংহে করতে পারবো? সম্ভব হবে না। শুধু এসব জায়গায় নয়, তখন দেশের বেশিরভাগ এলাকাতেই নির্বাচন করা কঠিন হবে। তাই আমার মনে হয় নভেম্বরের আগে নির্বাচন শুরু হবে না। বছরের শেষ দিকেই নির্বাচন শুরু হবে।”

আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন—এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা সরকারের। তবে কোন নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি।

এ বিষয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, কোন নির্বাচন আগে হবে, সেটা আমাদের কাছে খুব বড় বিষয় না। আলাপ-আলোচনা চলছে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা কোনটা আগে করবো, সেটার চেয়ে কীভাবে ভালোভাবে নির্বাচন করা যায়, সেটাই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।

এর আগে গত ২১ মে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ৪ হাজার ৫৮১ ইউনিয়ন, ৫০০ উপজেলা, ৬১ জেলা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩০টি পৌরসভার নির্বাচন করতে হবে। এটা বিশাল কাজ। আমাদের চেষ্টার কোনও ঘাটতি থাকবে না।”

সিইসি আরও বলেন, আশির দশকের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনেক হত্যাকাণ্ড দেখেছি। হাসপাতাল আহত মানুষে ভরে যেত। এই নির্বাচনগুলোতে মারামারি বন্ধ করতে হবে। আমরা কোনও রক্তপাত চাই না। আর রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া সংঘাতমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব না।

যেসব পরিবর্তন আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে: চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বানি প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল, বিধিমালায় পরিবর্তন, দেশে ও দেশের বাইরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণ না করা, ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হতে না দেওয়া, নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন, দলীয় প্রতীক বাতিল, ইভিএম ব্যবহার না করা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া, জামানতের পরিমাণ বাড়ানো এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন না করার মতো সিদ্ধান্তের দিকেও এগোচ্ছে ইসি।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা যাতে কোনোভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে বিষয়েও ভাবছে কমিশন। উপজেলা পরিষদে এমপিদের বসা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার থাকবে না। জাতীয় নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। পাশাপাশি কোনও ধরনের পোস্টাল ভোটও থাকছে না।

তিনি বলেন, বৈঠকে আমরা অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় প্রায় চূড়ান্ত। এবারের নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হবে। অর্থাৎ দলীয় কোনও প্রার্থী বা দলীয় প্রতীক থাকবে না। সবাই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে। ফলে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতাও থাকছে না। একই সঙ্গে ফেরারি আসামিরা প্রার্থী হতে পারবেন না।

তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়ানো হবে। তবে জামানত কত বাড়বে, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের বসার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনও ভাবছি। কারণ এটা বন্ধ করলে ৩০০ সংসদ সদস্যই বিভিন্ন সমস্যায় পড়বেন। ফলে নিষিদ্ধ করবো কিনা, করলে কবে থেকে করবো—সেটা আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি বলেন, আরপিও অনুযায়ী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারি সুবিধাভোগীরা কোনও প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে পারেন না। সংসদ সদস্যরাও এর মধ্যে পড়েন। তারা শুধু ভোট দিতে পারবেন। সেজন্য এলাকায় যেতে হবে। সেটা আইন অনুযায়ী আমরা বাধা দিতে পারি না।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে না বলেও জানান রহমানেল মাছউদ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের আশঙ্কা থাকে। তবে এটি একটি স্ট্র্যাটেজিক নির্বাচন। আমরা সারা দেশে একদিনে ভোট করবো না। ধাপে ধাপে নির্বাচন হবে। যেমন প্রথমে ঢাকা বিভাগে হলে সেই বিভাগের জন্য আমাদের নিজস্ব পুলিশ ফোর্স থাকবে। তাই আপাতত সেনাবাহিনী মাঠে রাখার পরিকল্পনা নেই।

তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করবে। যদি প্রয়োজন হয়, তখন তাদের ডাকা হবে। কোথাও বেশি সহিংসতা হলে পরবর্তী ধাপে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালার কাজ কবে শেষ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশা করছি জুন মাসের মধ্যেই বিধিমালার কাজ শেষ হয়ে যাবে।

ইসির পরিবর্তন নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব: নির্বাচন কমিশনের আনা সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, আমাদের দেশে ১৯৭৩ সাল থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হয়ে আসছিল। ২০১৫ সালের অক্টোবরে এটিকে দলীয় করা হয়। তখন প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ থেকে বড় ধরনের আপত্তি উঠেছিল। পরে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন—দুই কমিশনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করে। সেই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আইন পরিবর্তন করেছে। তাই এটা নতুন কিছু নয়, বরং আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া।

তিনি বলেন, ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টি তুলে দেওয়া যুক্তিযুক্ত। কারণ ভোট একটি গোপন বিষয়। কিন্তু মনোনয়নপত্রে সমর্থন দিলে বোঝা যায়, আমি তাকে ভোট দিতে পারি। এতে গোপনীয়তা নষ্ট হয়, এমনকি কেউ প্রতিশোধের মুখেও পড়তে পারেন। তবে এই শর্ত তুলে দিলে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এজন্য জামানত বাড়ানো হলে সেটি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

পোস্টার নিষিদ্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যেহেতু পোস্টার ব্যবহারে বিধিনিষেধ ছিল, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই যুক্তিযুক্ত। একটি নির্বাচনে পোস্টার থাকবে, আরেকটিতে থাকবে না—সেটা ঠিক হবে না। এবার প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। পাঁচ বছর পর আবার জাতীয় নির্বাচন হলে মানুষ হয়তো বিষয়টি ভুলে যাবে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমেও এই চর্চা চালু রাখা দরকার।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন বিষয়ে আব্দুল আলীম বলেন, সাধারণত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় না। কারণ জাতীয় নির্বাচন একদিনে হয়, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার, বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীও থাকে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে হয়। তাই পরিকল্পনা ভালো হলে সেনাবাহিনী ছাড়াও নির্বাচন সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, অনলাইনে মনোনয়ন থাকবে না, পোস্টাল ব্যালট থাকবে না, ফেরারি আসামিরা প্রার্থী হতে পারবেন না, ইভিএম থাকবে না—এসব পরিবর্তনের মধ্যে ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হতে না দেওয়ার বিষয়টি গত সংসদ নির্বাচনের সময়ই অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। আর অনলাইনে মনোনয়নের ব্যবস্থা বিশেষ পরিস্থিতিতে চালু করা হয়েছিল। এর ইতিবাচক দিক হলো, অনেক সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়। অনলাইন ব্যবস্থা থাকলে একজন প্রার্থী ঘরে বসেই মনোনয়ন জমা দিতে পারতেন।

সব মিলিয়ে পোস্টারবিহীন নির্বাচন চালু রাখা এবং ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। তার ভাষায়, এত মানুষের স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টি অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।


আমার বার্তা/জেএইচ