বেরিয়ে আসছে ইউনূস সরকারের লুটতন্ত্রের ইতিবৃত্ত

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকালের নানা অকথিত অধ্যায় ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। ২৪ এর পাঁচ আগস্ট এক অভূতপূর্ব গনঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ড. ইউনূসকে ক্ষমতায় বসায়। দেশের মানুষ আশা করেছিল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সুশীল সমাজের সরকার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে, বৈষম্য দূর করবে, দুর্নীতি মুক্ত দেশ গড়বে। কিন্তু ইউনূসের দেড় বছরের শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ শাসন। সুশাসনের বদলে ইউনূস সরকার স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, বৈষম্য বিলোপের বদলে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিলেন ইউনূস। তবে ইউনূসের শাসনকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো দুর্নীতি আর লুটপাট। মাত্র দেড় বছরে ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা আর সহকারীরা যে পরিমাণ লুটপাট করেছে তা অতীতের দুর্নীতির সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন নতুন করে গঠিত হয়েছে। নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পর, দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগগুলো আমলে নেয়া হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত করা হচ্ছে। 

এতে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে ইউনূস সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং ইউনূস ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে ইউনূস সরকারের আমলে সংগঠিত দুর্নীতির অন্তত দুই হাজার অভিযোগ এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে। দুদক এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে দুদক। 

দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। চার দেশের হিসাবে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা। আসিফ মাহমুদের দুই বোন জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। 

তবে দুদকের ঘনিষ্ঠ সূত্র গুলো জানিয়েছে, শুধু আসিফ মাহমুদ একা নয়, বেশিরভাগ উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ আছে। জানা গেছে, এসব অভিযোগে প্রধান উপদেষ্টাসহ অধিকাংশ উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে অন্তত চারটি দেশ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দেশ গুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড এবং নরওয়ে। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব দেশে ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে নরওয়েতে ইউনূসের নিজস্ব একাউন্টে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭৪ কোটি টাকা জমা হওয়ার একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ফোনের বহুজাতিক কোম্পানি টেলিনর থেকে এই অর্থ ইউনূসের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। উল্লেখ্য ইউনূস আমলে টেলিনর পরিচালিত গ্রামীণ ফোন বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।

ইউনূস সরকারের আরেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দশ হাজার কোটি টাকা পাচারের একডজন অভিযোগ দুদকের কাছে জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে আসিফ নজরুল উপদেষ্টা হবার পর দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছেন। আসিফ নজরুল বিচারক, আইন কর্মকর্তা, সাব রেজিস্ট্রার নিয়োগ ও বদলির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। জামিন বাণিজ্য এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।

আসিফ নজরুল সুইস ব্যাংকে একাউন্ট করেছেন বলে অভিযোগ আছে। তবে এই বিতর্কিত উপদেষ্টা তার অধিকাংশ অবৈধ অর্থ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেনামে সম্পদ ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক এবং ফ্লোরিডায় আসিফ নজরুলের সম্পদের তথ্য রয়েছে লিখিত অভিযোগে।

ইউনূস সরকারের আরেক প্রভাবশালী প্রভাবশালী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও আট হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বিপুল সম্পদ বিক্রি করে রিজওয়ানার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী দুবাইয়ে পাচার করেছেন। এছাড়াও রিজওয়ানার অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ দিয়ে তার স্বামী দুবাই এবং লন্ডনে  ব‍্যবসা পরিচালনা শুরু করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের সূত্র গুলো জানিয়েছে, ইউনূসের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে তার নিকটাত্মীয়ের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন বলে দুদকের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছে।

দুদকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দু-একজন বাদে সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুদকের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে, ইউনূস ও তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে চল্লিশ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হবে। যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো অনুসন্ধান করা হবে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

দুদক নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত বলে দেশবাসী আশা করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, একটি অভূতপূর্ব গণজাগরনের প্রেক্ষাপটে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি সরকার কীভাবে এভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বাংলাদেশের সুশীল সমাজের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হতে হবে। আমাদের সুশীল সমাজ যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই নিজেদের আখের গোছানোর কাজ করেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের দেশের অধিকাংশ সুশীল সমাজের নেতারা বিদেশি টাকায় এনজিও চালান। দেশের মানুষের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। এরা এক এগারোর সময় ক্ষমতা দখল করেছিল কিন্তু দেশের মানুষের কোন কল্যাণ করেনি, বরং তাদের নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে। তবে ইউনূস সরকার দুর্নীতি এবং প্রতারণায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। সময় যতই গড়াচ্ছে, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপকর্মের ফিরিস্তি ততই লম্বা হচ্ছে। শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেড়বছরের শাসনকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতি এবং অর্থপাচারে ইউনূস এবং তার সহযোগীরা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে ধন্যবাদ। তারা সাহসিকতার সাথে মব সন্ত্রাসের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। দেশের মানুষ চায়, ইউনূস সরকারের সকল উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। দুর্নীতি দমন কমিশন যেভাবে কাজ করছে তাতে আমরা আশাবাদী হতেই পারি।