‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপ উদ্বোধন, যেভাবে নিশ্চিত হবে ভূমি অফিসের উপস্থিতি
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:১২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাসময়ে ও নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘ভূমিদৃষ্টি’ মোবাইল অ্যাপের উদ্বোধন করা হয়েছে। জিওফেন্সিং প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মস্থলে উপস্থিতি নিবন্ধন এবং ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তদারকি করা যাবে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ‘ভূমিদৃষ্টি’ মোবাইল অ্যাপ উদ্বোধন করেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অ্যাপটির উদ্বোধন করেন।
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম- দেশের এই ছয় জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাপ ভিত্তিক উপস্থিতি নিশ্চিতের এ ব্যবস্থা চালু হলো বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত ও যথাসময়ে কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ড্যাশবোর্ডভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়িয়ে ভূমিসেবাকে আরও জবাবদিহিমূলক, গতিশীল ও জনবান্ধব করাই এ অ্যাপের মূল উদ্দেশ্য।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট ও পারফরমেন্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, গত ১৯ মে ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ভূমিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন।
এর ধারাবাহিকতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম জেলায় এ কার্যক্রমের পাইলটিং দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাইলটিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হলে স্বল্পতম সময়ে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে।
যেভাবে কাজ করবে জিওফেন্সিং
তিনি বলেন, জিওফেন্সিং হলো মানচিত্রের ওপর নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের প্রযুক্তি। প্রতিটি ভূমি অফিসের চারপাশে নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের একটি অদৃশ্য সীমানা নির্ধারিত থাকবে। কোনো কর্মকর্তার মোবাইল ফোন সেই সীমানার ভেতরে প্রবেশ করলেই অ্যাপে উপস্থিতি নিবন্ধনের সুযোগ সক্রিয় হবে। সীমানার বাইরে থাকা অবস্থায় উপস্থিতি নিবন্ধন করা যাবে না।
নাগরিক নির্দিষ্ট ভূমি অফিসে গিয়ে ভূমিসেবা গ্রহণ করেন। তাই সেবাদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওই অফিসে উপস্থিত থাকা সেবা প্রদানের অন্যতম পূর্বশর্ত। ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা মাঠ প্রশাসনের সব কার্যালয় ও দপ্তর সরেজমিনে তদারকি করা অত্যন্ত দুরূহ। অনলাইনে অবস্থানভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে এ তদারকি সহজ হবে বলেও জানিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব।
সাধারণ স্মার্টফোন ও বিদ্যমান মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি পরিচালিত হবে জানিয়ে তিনি তার উপস্থাপনায় বলেন, ফলে প্রতিটি কার্যালয়ে পৃথক যন্ত্র স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে না। নতুন কার্যালয়ের সীমানা নির্ধারণ করলেই সেটি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত করা যাবে। ফলে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ব্যবস্থা সম্প্রসারণে বাড়তি অবকাঠামোর প্রয়োজন হবে না।
কর্মকর্তা প্রান্তে মোবাইল অ্যাপ
কর্মকর্তা নিজের মোবাইল ফোনে নির্ধারিত কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে বা অবস্থান করার সময় চেক-ইন ও চেক-আউট সম্পন্ন করতে পারবেন। একই সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে ছুটির আবেদনও দাখিল করা যাবে।
কর্তৃপক্ষের জন্য প্রশাসনিক প্যানেল
মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একই অ্যাপের মাধ্যমে দৈনিক উপস্থিতি, বিলম্ব, অনুপস্থিতি ও ছুটির সার্বিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
থাকছে যেসব সুবিধা
কর্মস্থলের সীমানার বাইরে থেকে উপস্থিতি নিবন্ধনের সুযোগ না থাকায় হাজিরা হবে প্রকৃত অবস্থানভিত্তিক, যাচাইযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য। উপস্থিতি নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গেই তথ্য প্রশাসনিক প্যানেলে প্রদর্শিত হবে। ফলে কাগজে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না।
বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের তথ্য দেখে তদারকি ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
সীমানা লঙ্ঘন, একই দিনে একাধিকবার উপস্থিতি নিবন্ধন, অনিবন্ধিত ডিভাইস, কৃত্রিম অবস্থান বা চেক-আউট না করার মতো ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা তৈরি হবে।
ছুটির আবেদন, অনুমোদন ও অবশিষ্ট ছুটির হিসাব উপস্থিতির তথ্যের সঙ্গে একত্রে সংরক্ষণ করা হবে।
কর্মকর্তার নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার ফলে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং নাগরিকদের ভূমি অফিসে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তাও বৃদ্ধি পাবে।
অফিসে উপস্থিতির পর কোনো সভা বা তদন্তে বাইরে যেতে হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘সাইট ভিজিট’ বাটনে ক্লিক করে বাইরে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করতে পারবেন। এতে দাপ্তরিক প্রস্থান ও উপস্থিতির তথ্যের মধ্যে সমন্বয় রাখা যাবে।
প্রশাসনিক প্যানেলে যা থাকছে
‘ভূমিদৃষ্টি’ ব্যবস্থার প্রশাসনিক প্যানেল পাঁচটি ভাগে বিন্যস্ত। এগুলো হলো সাধারণ পর্যবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, পরিচালন, তথ্য বিশ্লেষণ ও সিস্টেম সেটিংস। এর আওতায় অফিস বা কার্যালয়ের সীমানা নির্ধারণ, সাইট ভিজিট ও ছুটি ব্যবস্থাপনা, উপস্থিতি পর্যালোচনা, সতর্কবার্তা নিষ্পত্তি এবং দৈনিক ও মাসিক প্রতিবেদন তৈরির সুবিধা রয়েছে।
ছয় জেলায় পাইলট কার্যক্রম
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম এই ছয় জেলায় ‘ভূমিদৃষ্টি’ ব্যবস্থার পাইলট কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর আওতায় ৬১০টি কার্যালয়ের ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
পর্যায়ক্রমে সারাদেশে
পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও উন্নয়ন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
‘ভূমিদৃষ্টি’ অ্যাপের উদ্যোক্তা ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে প্যারালাক্সলজিক ইনফোটেক (পিএলএক্স)।
