শুধু বেঁচে থাকা নয়, রোহিঙ্গাদের প্রাপ্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ: জাতিসংঘ
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত জীবনে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য একটি টেকসই সমাধানের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনও মিয়ানমারে তৈরি হয়নি। শুধু বেঁচে থাকা নয়, রোহিঙ্গাদের প্রাপ্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ।
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ বলেন, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন।
‘একটি পুরো প্রজন্ম নির্বাসনে বেড়ে উঠছে,’ বলেন সালেহ। মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত থাকায় বর্তমানে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি নেই বলেও তিনি জানান।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। তাদের অধিকাংশই এখনও বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন।
রোহিঙ্গা শিশুদের একটি প্রজন্মের কাছে শিবিরের জীবনই এখন শৈশবের স্বাভাবিক বাস্তবতা।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ বলেন, ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া শিশুদের পুরো শৈশবই কেটেছে বাস্তুচ্যুত অবস্থায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি শিশু শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিচ্ছে।
শিবিরে বসবাসরত নারী ও মেয়েরাও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশপ বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের কারণে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সময়ে সুরক্ষা ও সহায়তামূলক সেবায় প্রবেশের সুযোগও কমে যাচ্ছে। ‘তরুণরা আশা হারিয়ে ফেলছে,’ বলেন তিনি।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদারতা ও মানবিকতার প্রশংসা করেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের দায় এককভাবে বাংলাদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
ইউএনএইচসিআর প্রধান বলেন, ‘অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োজনীয়তা বন্ধ হয়ে যায় না।’
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে খাদ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সেবার ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা আরও গভীর হয়।
নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা না থাকলে রোহিঙ্গারা শোষণ, মানবপাচার, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার মতো বিপদের আরও বেশি মুখোমুখি হতে পারেন।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি শুধু শরণার্থীদের জীবনেই প্রভাব ফেলছে না; এর চাপ পড়ছে বাংলাদেশ ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে তৈরি হওয়া মানবিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবপাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক পাচার এবং অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ।’
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না।
‘বাংলাদেশও অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব বহন করবে—এমনটা প্রত্যাশা করা যায় না,’ বলেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে; এর সমাধানও মিয়ানমারেই।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও নিপীড়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘বেসামরিক মানুষ নির্বিচার হামলা, বিমান হামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম, জোরপূর্বক নিয়োগ, ঘরবাড়ি ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।’
রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মনোযোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে শরণার্থীদের জন্য ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের গণহত্যা মামলার কথাও তুলে ধরেন। তারা বলেন, যেকোনো স্থায়ী সমাধানের অংশ হতে হবে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি। জবাবদিহির পথে যে গতি তৈরি হয়েছে, তা যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়েও তারা গুরুত্ব দেন।
‘ভুক্তভোগীরা দেখতে চান, অতীতের ভয়াবহতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে,’ বলেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান।
ইউএনএইচসিআর প্রধান সালেহ বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রাপ্য, যা কেবল টিকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে তার কথোপকথনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের অনেকেই এখনও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশা ধরে রেখেছেন। তবে প্রত্যাবাসন মানে শুধু সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নয়।
‘এর অর্থ হলো অধিকার নিয়ে ফিরে যাওয়া, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারা, স্কুলে যাওয়া, কাজ করা, সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকা, ভয় ছাড়া অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস করতে পারা,’ বলেন তিনি।
এর পাশাপাশি নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি পথও থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন সালেহ। ‘সেই ভবিষ্যৎ সম্ভব করে তোলা আমাদের দায়িত্ব,’ বলেন ইউএনএইচসিআর প্রধান।
