প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করছে সরকার: আইনমন্ত্রী
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

প্রবাসীদের অর্থ-সম্পদ ও অধিকার রক্ষা এবং দেশে থাকা তাদের বিভিন্ন আইনি সংকট দ্রুত সমাধানে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিভাগীয় সদর দপ্তরগুলোতে এসব আদালত গঠনের চিন্তা করা হচ্ছে। এ আদালতে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের মামলা পরিচালনার সুযোগ থাকবে। এরই মধ্যে আদালত গঠনের প্রস্তাব খসড়া তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। জনপরামর্শ শেষে আগামী সংসদীয় অধিবেশনে প্রস্তাবটি তোলার বিষয়েও চিন্তা করছে সরকার।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘সোনার মানুষ সম্মিলন-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। প্রবাসীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরার পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শ্রম রপ্তানি। তবে অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকেরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এর অন্যতম কারণ অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড। এ বৈষম্য দূর করতে সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক শ্রমিককে সকালে বাথরুমে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর কাজের জন্য দুই ঘণ্টা আগেই রওনা দিতে হয়। সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যা ৮টা বা ৯টার দিকে বাসায় ফেরেন তারা। এরপর পরিবারের সঙ্গে কথা বলা ও রান্নাসহ অন্যান্য কাজ করতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও অনেক ক্ষেত্রে তারা অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন। শ্রমের মূল্য নির্ধারণে এ বৈষম্য কমাতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রবাসীদের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে অসাধু ব্যবসায়ী ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনেক প্রবাসীর ভিসা বাতিল হয়েছে, আবার অনেকের ভিসা নবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কিছু নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জমা দেওয়া নথিতে অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সনদ জমা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে এসব নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রবাসীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি নারী-পুরুষ ও তাদের সন্তানদের দেশে কোনো আইনি সমস্যায় পড়লে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক আইনি পরামর্শের পাশাপাশি মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তিরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রবাসীদের হয়রানি কমবে বলে আশা করছে সরকার।
বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনার ব্যাখ্যায় আইনমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীরা বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশে অর্থ পাঠান। কিন্তু দেশে ফিরে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই অর্থ ফেরত চাইতে গিয়ে কিংবা নিজেদের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মুখে পড়েন। এসব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাঁদের বছরের পর বছর বিদেশে বসে আইনজীবীদের মাধ্যমে মামলা চালাতে হয়। কখনো মামলার নিষ্পত্তি দেখে যেতে পারেন না তারা; পরে তাদের উত্তরাধিকারীদের সেই মামলা চালিয়ে যেতে হয়। এ দুর্ভোগ কমাতেই প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব এসেছে।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমিকদের জন্য শ্রম আদালত ও শ্রম আইন রয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের দেশে থাকা অর্থ-সম্পদ ও অন্যান্য আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বিশেষায়িত আদালত গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভাগীয় সদর দপ্তরগুলোতে এসব আদালত গঠন করা হতে পারে। প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত হিসেবে এগুলো কাজ করবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আদালত গঠনের বিষয়ে খসড়া তৈরির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জনপরামর্শের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে চান তারা। চলতি সংসদীয় অধিবেশনে প্রস্তাবটি তোলা সম্ভব না হলেও পরবর্তী অধিবেশনে তা উপস্থাপনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রামরুর ভূমিকার প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, গত ৩০ বছরে সংগঠনটি শ্রমিকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় কাজ করেছে। শ্রমিকদের কল্যাণ ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সংগঠনটির স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাও তুলে ধরেন তিনি। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ভবিষ্যতেও রামরুর ইতিবাচক উদ্যোগের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা আগামী ১০০ বছরে ছড়িয়ে পড়ুক পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক, যাতে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা দেশে ফিরে আসতে পারেন এবং দেশের ভেতরেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। একই সঙ্গে অন্য দেশ থেকে শ্রমিক আনার মতো সক্ষমতাও বাংলাদেশের তৈরি হোক- এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
