অটিজম: নীরবতার ভেতরে লুকানো সম্ভাবনা ও থেরাপির বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৫ | অনলাইন সংস্করণ

  রেহানা আক্তার (রূপা):

একটি শিশু যখন ডাকলে ফিরে তাকায় না, চোখে চোখ রাখে না, নিজের জগতে ডুবে থাকে তখন অনেকেই বলেন, “সময় হলে ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু সব নীরবতা অপেক্ষা নয় কিছু নীরবতা আমাদের ডাকে, বুঝতে শেখার জন্য। অটিজম সেই নীরবতারই একটি রূপ, যা বোঝার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, সংবেদনশীলতা এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ।

অটিজম একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল অবস্থা, যেখানে শিশুর মস্তিষ্ক তথ্য গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা দেখা যায়। ফলে তার যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ এবং শেখার ধরণ অন্যদের থেকে আলাদা হতে পারে। এটি কোনো রোগ নয়, বরং একটি স্পেকট্রাম অর্থাৎ, একেকটি শিশুর লক্ষণ ও সক্ষমতা একেক রকম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেরিতে সনাক্তকরণ। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুর দেড়-দুই বছর বয়স পেরিয়ে গেলেও সে কথা বলছে না, নিজের নামে সাড়া দিচ্ছে না, বা নির্দেশনা বুঝতে পারছে না তবুও পরিবার অপেক্ষা করে। এই “অপেক্ষা”ই অনেক সময় শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু কেড়ে নেয়।

এখানেই “Early Intervention” বা প্রারম্ভিক হস্তক্ষেপের গুরুত্ব অপরিসীম।

গবেষণায় প্রমাণিত, জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি (neuroplasticity) সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ, এই সময়টিতে সঠিক প্রশিক্ষণ ও থেরাপির মাধ্যমে শিশুর শেখার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। তাই যত দ্রুত অটিজম শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত থেরাপি শুরু করা প্রয়োজন।

অটিজম ব্যবস্থাপনায় থেরাপি একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। এখানে কোনো একক সমাধান নেই। প্রতিটি শিশুর জন্য তার প্রয়োজন অনুযায়ী থেরাপি পরিকল্পনা করা হয়। স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি শিশুকে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে শেখায়, বিহেভিয়ারাল থেরাপি আচরণ ও মনোযোগ গঠনে সহায়তা করে, এবং অকুপেশনাল থেরাপি তাকে দৈনন্দিন কাজ ও সেন্সরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।

তবে থেরাপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর ধারাবাহিকতা ও বাস্তব প্রয়োগ। সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টার সেশন যথেষ্ট নয়, যদি তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত না হয়। একজন থেরাপিস্ট কৌশল দেখিয়ে দেন, কিন্তু সেই কৌশলগুলো প্রতিদিন বাস্তবায়ন করেন অভিভাবকরাই। তাই অভিভাবকের সচেতনতা, ধৈর্য্য এবং সম্পৃক্ততা থেরাপির সাফল্যের মূল ভিত্তি।

অটিজম নিয়ে একটি বড় ভুল ধারণা হলো “শিশুকে স্বাভাবিক বানাতে হবে।” কিন্তু থেরাপির লক্ষ্য এটি নয়। বরং লক্ষ্য হলো শিশুর নিজস্ব সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নত করা, তাকে স্বনির্ভর করে তোলা এবং তার সাথে পৃথিবীর একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা।

আমরা প্রায়ই বড় সাফল্যের গল্প খুঁজি, কিন্তু অটিজমের ক্ষেত্রে ছোট ছোট পরিবর্তনই সবচেয়ে বড় অর্জন। প্রথমবার চোখে চোখ রাখা, একটি শব্দ উচ্চারণ, নিজের প্রয়োজন ইশারায় জানানো এসবই একটি পরিবারের জন্য বিশাল সাফল্য।

বাংলাদেশে এখনো অটিজম নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। লজ্জা, অস্বীকার বা দেরি না করে শিশুর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়, শুধু প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। অটিজম কোনো অন্ধকার নয়, এটি এক ভিন্ন আলো, যা দেখতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

 

লেখক: শিশু ডেভেলপমেন্টাল থেরাপিস্ট, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

আমার বার্তা/রেহানা আক্তার (রূপা)/এমই