জোট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে বিপাকে বিএনপি
সংসদ নির্বাচন
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন

জোট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও দলের ভেতরে বিদ্রোহী প্রার্থীরা অস্বস্তিতে ফেলেছে বিএনপিকে। ইতোমধ্যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এর পরও ৫০টির মতো আসনে এখনও দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে আছেন।
বিভিন্ন আসনে দল-মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে অনেকের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। ফলে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে যাচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা আহ্বান জানিয়েছি, দলের সিদ্ধান্তের প্রতি যেন তারা (বিদ্রোহী প্রার্থী) শ্রদ্ধাশীল হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আশা করছি, তারা তা করবেন। অনেকেই ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করেছেন, অনেকে প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, ৫২টি আসনে দলের ৯১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে আছেন দলের পদধারী ও সাবেক নেতারা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নেওয়ায় ইতোমধ্যে ১১ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্য বিদ্রোহীদের সঙ্গে কেন্দ্র থেকে যোগাযোগের পাশাপাশি তাদের ডেকে আলোচনা করা হচ্ছে।
দলীয় পদধারী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের গুলশান কার্যালয়ে ডাকা হচ্ছে। তফশিল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে যারা সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন– ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি একরামুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির উপদেষ্টা এম এ খালেক, সুনামগঞ্জ-৫ আসনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী, বরিশাল-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আ. সত্তার খান, ভোলা-১ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর, রাজশাহী-৬ আসনে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল ও জেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান।
এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সঙ্গে দল-মনোনীত প্রার্থীর সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির চেয়ারম্যান অনেক আসনের বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। এতে উল্লেখযোগ্য আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেষ মুহূর্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই সংখ্যা শূন্যে আনার সিদ্ধান্ত রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা-১২ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সমমনা দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে। এখানে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল যুবদলের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি তাঁকে বহিষ্কার করেছে।
চট্টগ্রাম-১৬ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে প্রয়াত জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক লেয়াকত আলী।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমেদ। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী।
সিলেট-৫-এ বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন)। তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নাটোর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর ভাই ডা. ইয়াসিন আরশাদ রাজন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে দলের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নান। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মামুন ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান ইকবাল চৌধুরী এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিব। বিএনপি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত নেতা দলটির সাবেক সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য ফ্রন্টের মহাসচিব ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন।
ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়েও বিপাকে রয়েছে বিএনপি। ময়মনসিংহ-১ আসনে সালমান উমর রুবেল, ময়মনসিংহ-৩-এ দল থেকে বহিষ্কৃত ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তায়েবুর রহমান হিরন, ময়মনসিংহ-৬-এ সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদের ছেলে তানভীর আহমেদ রানা, ময়মনসিংহ-৭ আসনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে আনোয়ার সাদাত, ময়মনসিংহ-৯ আসনে বিএনপির চারবারের সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ আসনে সাবেক এমপি ফজলুর রহমান সুলতানের ছেলে এবং জেলা বিএনপির নেতা মুশফিকুর রহমান, ময়মনসিংহ-১১ আসনে ভালুকা উপজেলা বিএনপির সদ্য সাবেক আহ্বায়ক মো. মোর্শেদুল আলম বিদ্রোহী প্রার্থী।
এ কারণে ময়মনসিংহ-৬ ও ৭ আসনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জামায়াতের প্রার্থীর জন্য সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান জেলা বিএনপি নেতারা।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দল-মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা। সেখানে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। চাঁদপুর-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী লায়ন মো. হারুনুর রশিদ। বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এমএ হান্নান।
জয়পুরহাট-২ আসনে সাবেক সচিব আব্দুল বারীকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন বিএনপির সাবেক এমপি গোলাম মোস্তফা। রাজবাড়ী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হারুন-অর-রশীদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. নাসিরুল হক সাবু।
মাদারীপুর-১ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে নাদিরা আক্তারকে। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকী ও কামাল জামান মোল্লা। মাদারীপুর-২ আসনে দল-মনোনীত প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া। স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সদস্য মিল্টন বৈদ্য।
হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়া। বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সুজাত মিয়া। পটুয়াখালী-৩ আসনটি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। এখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদ থেকে সদ্য বিএনপিতে যোগদানকারী রাশেদ খান। এখানে প্রার্থী হয়েছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর। এ আসনে দলের প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম এবং সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। এ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে ডা. একেএম বাবরকে। বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দুজন– সাবেক এমপি এমএএইচ সেলিম ও জেলা বিএনপির নেতা প্রকৌশলী মো. শেখ মাসুদ রানা।
বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন। এখানে দুই বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম ও তাঁর ভাই জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ সালাম।
ঝালকাঠি-১ আসনে সাবেক ছাত্রদল নেতা গোলাম আজম সৈকত, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করতে চান। সুনামগঞ্জ-৪ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, জামালপুর-২ আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এএসএম আবদুল হালিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
চাঁদপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। এখানে জেলা বিএনপির নেতা তানভীর হুদা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির নেতা এমএ শুক্কুর পাটোয়ারী তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
টাঙ্গাইল-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী। টাঙ্গাইল-৩ আসনে দলের প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসির। স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি লুৎফুর রহমান খান আজাদ।
বিএনপি নেতারা জানান, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাইরে পাঁচটি আসনে ঘোষিত বিকল্প প্রার্থীর বিষয়েও বিএনপিকে দুয়েক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সূত্র : সমকাল
আমার বার্তা/জেএইচ
