মুখোমুখি আন্ডার ওয়ার্ল্ডের দুই ডন ক্যাপ্টেন ইমন ও পিচ্চি হেলাল
তারকা সন্ত্রাসী টিটন, মামুনের চ্যাপ্টার ক্লোাজড
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬, ১৫:০১ | অনলাইন সংস্করণ
মোস্তফা সারোয়ার:

ইমন - মামুন আন্ডার ওয়ার্ল্ডের দীর্ঘদিনের জুটি। পুরো নাম সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তারিক সাঈদ মামুন। এছাড়া একের অপরের ঘনিষ্ট বন্ধুও বটে। এদিকে খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন হলো ইমনের সম্বন্ধি। রাজধানীতে তিন জনেই তারকা সন্ত্রাসী হিসেবে স্বীকৃত। সরকার বদলায় কিন্ত এদের সন্ত্রাসী, খুন খারাপী চাঁদাবাজী বদলায়না। মামুন, টিটন, ইমন জেল হাজতে ছিল যথাক্রমে ২৬, ২২ ও ১৯ বছরেরও অধিক। দীর্ঘ এই সময়ে জেল হাজত থেকেই তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এদিকে আবার জেল খানাতেই ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বও শুরু হয়। ভাগ হয়ে যায় তিন তারকা সন্ত্রাসী। তারিক সাঈদ মামুন দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছর পর ২০২৩ সালে জামিনে বের হয়। জেল থেকে বের হয়েই আলাদা একটা সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে। তুমুল দ্বন্দে জড়িয়ে যায় বন্ধু ইমনের সাথে। এরফলে তাকে দুনিয়া থেকে ছড়িয়ে দিতে জেলে থেকেই ছক আকে সন্ত্রাসী ইমন। অবশ্য জেল খানা থেকে ইমনের নির্দেশে মানুষ খুন হওয়া, এটা নতুন কিছু নয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত দশটার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার সিটি পেট্রোল পাম্প ও বিজি প্রেসের মাঝখানের রাস্তায় এলোপাথারি গুলি চালিয়ে মামুনের উপর। গুলিবিদ্ধ হন মামুন, পাশাপাশি সেই সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যায় মোটর চালক আরোহী ভুবন চন্দ্র শীল। তৎকালীন সময়ে মামুনের স্ত্রী দাবি করেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের লোকজন তার স্বামীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালায়৷ তবে শেষ রক্ষা হয়নি মামুনের। ২০২৫ সালের ১০ নবেম্বর সকাল দশটার দিকে পুরান ঢাকার আদালত পাড়ার ন্যাশনাল মেডিক্যালে সামনে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মামুনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এই হত্যাকান্ডের অভিযোগে পাঁচ কিলারকে গ্রেফতার করেছে আইন শৃংখলা বাহিনী । এবারও মামুন পরিবারের সন্দেহের তীর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের দিকে ।
শীর্ষ সন্ত্রাসীরা জামিনে মুক্ত
১৯৯৭ সালে আওয়ামীলীগের সরকারের আমলে চার শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল সরকার। পরবতীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর ১৯ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। দুই দফায় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরপরই আলোচনায় চলে আছে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম। ৫ আগস্ট ২০২৪ দেশের পট পরিবর্তনের পর আইনি প্রক্রিয়ায় ফাঁক গলে এ পর্যন্ত সরকারের তালিকাভুক্ত ১১ শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন।
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশসহ কতিপয় বিভাগে খানিকটা স্থবিরতা দেখা যায়। ওই স্থবিরতার সুযোগে কারাগার থেকে সন্ত্রাসীদের মুক্তি পাওয়া নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। প্রশ্ন উঠেছে, ওই সন্ত্রাসীরা কী শর্তে জামিন পেয়েছেন, তারা এখন কোথায় আছেন, দেশে নাকি বিদেশে? কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে তারা কি নিজেদের শুধরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন, নাকি আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মেতে উঠেছেন, তা নিয়ে সচেতন মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৫ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ১৩ আগষ্ট এবং পিচ্চি হেলাল মুক্তি পায় ১৬ আগষ্ট।
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যা, এজাহারে যা আছে
২৮ এপ্রিল রাত আটটার দিকে নিউ মার্কেটের বটতলা এলাকায় শহীদ শাহনেওয়াজ হল সংলগ্ন রাস্তায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। নিহতের পরিবারের দাবী বসিলা পশুর হাট নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পরের দিন সকালে মামলা করেন নিহতের বড়ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন। নিউমার্কেট থানায় করা এ মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তবে, অভিযোগে বসিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল ওরফে কাইলা বাদল, শাহজাহান ও রনি ওরফে ভাংগারী রনির সঙ্গে বিরোধের উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যাকাণ্ডসহ বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। ২০০৪ সালে ঢাকা সেনানিবাস এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ড সাজা পান।
পিচ্চি হেলালের অডিও এবং নিহতের ভাইয়ের পাল্টা সাংবাদিক সম্মেলন
রাজধানীর রাস্তায় প্রকাশ্যে খুন হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনের সঙ্গে ‘চমৎকার সম্পর্ক’ ছিল দাবি করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। এই হত্যাকাণ্ডে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, এমনকি টিটনকে তিনি বন্ধু হিসেবে ভালোবাসতেন বলে দাবি করছে। এক অডিও বার্তায় হেলাল দাবি করেন, স্থানীয় কিছু অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম অপরাধচক্রের প্রভাবেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তার নাম সামনে আনা হচ্ছে।
পিচ্চি হেলালের দাবি, তার কোনো কিশোর গ্যাং বা সন্ত্রাসী বাহিনী নেই; বরং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সহজেই তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। অডিও বার্তায় পিচ্চি হেলালকে বলতে শোনা যায়, কোরবানির পশুর হাট সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হয়েছে।
তবে পিচ্চি হেলাল দাবি করেন, সন্ত্রাসী জোসেফ বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় নন। বর্তমানে মিরপুর থেকে শুরু করে পুরো ঢাকা শহর নিয়ন্ত্রণ করছেন ইমন এবং তার ‘ফোরস্টার গ্রুপ’।
তিনি ইমনকে ‘সাইকো’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ইমনের চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। টিটনকে পথ থেকে সরিয়ে দিতে ইমন নিজের পারিবারিক সম্পর্ককেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। পিচ্চি হেলাল নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘বিগত এক মাসে টিটনের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। পুলিশ যদি টিটনের ফোন এবং তার ভাই রিপনের ফোনের কল লিস্ট ফরেনসিক পরীক্ষা করে, তবেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।’ তিনি আরো জানান, টিটন জীবদ্দশায় বিভিন্ন জায়গায় বলে গিয়েছিলেন যে, তার দুলাভাই ইমন তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে।
তার দাবি অনুযায়ী, টিটনকে মারার পেছনে তার আপন বোন এবং ভগ্নিপতি ইমনের যৌথ পরিকল্পনা ছিল। ইমনের স্ত্রী (টিটনের বোন) এই খুনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানতেন কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।ইমনের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতেই টিটনকে ‘টার্গেট’ করা হয়েছিল বলে বিশ্বাস হেলালের।
এদিকে পিচ্চি হেলালের অডিও বার্তায় ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং নিজেকে রক্ষা করতে নানা ধরনের মিথ্যাচার করেছে বলে দাবি করছে নিহতের পরিবার। শনিবার (২ মে) দুপুরে সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রিপন বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রাতে আমার ছোট ভাই টিটনকে হত্যার পর প্রধান আসামি পিচ্চি হেলাল একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে দিয়ে নানা ধরনের মিথ্যাচার করছে। সে আমাদের পারিবারিক কলহের যে দাবি করেছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। মূলত তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করতেই সে এই অপকৌশল নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। আমার বোন ও ভগ্নিপতি সানজিদুল হাসান ইমনের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। পিচ্চি হেলাল নিজের অপরাধ ঢাকতে এসব আবোল-তাবোল বলছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উল্লেখ করে রিপন জানান, পিচ্চি হেলাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিটনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এছাড়া জেলখানায় থাকাকালীনও টিটনের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।
পিচ্চি হেলালের অডিও রেকর্ডে ফোন ফরেনসিক করার চ্যালেঞ্জের জবাবে নিহতের বড় ভাই বলেন, আমিও একমত। আমার ফোন ফরেনসিকে দিতে প্রস্তুত আমি। তবে পিচ্চি হেলালের ব্যবহৃত সবকটি মোবাইল ফোনও জব্দ করে ফরেনসিকে পাঠানো হোক। তাহলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। ভয়ংকর খুনি ও চাঁদাবাজ কখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করে না- উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, পিচ্চি হেলাল একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুরের সাবেক কমিশনার রাজু হত্যাসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের দেড় মাস আগে টিটন তার ভাইকে জানিয়েছিলেন যে, হেলাল তাকে হত্যার নীল নকশা করছে
হেলাল-ইমনের দ্বন্দ্ব ফের প্রকাশ্যে
কারাগার থেকে বেরোনোর পর রাজধানীতে তাদের অনেকের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডে দুই ব্যবসায়ীকে কোপানোর ঘটনায় পিচ্চি হেলাল ও ইমনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিষয়টি আবারো সামনে আসে। যদিও এক সময় ইমন, পিচ্চি হেলাল এক গ্রুপই ছিলেন, তবে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তাদের দ্বন্দ্ব চলছে।
এদিকে ইমন পরিবারের দাবি, জামিনে মুক্তি পাওয়ার কদিনের মধ্যে ইমন দেশের বাইরে চলে যান। ১০ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখমের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার সোসাইটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক ও সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান দিপু। পরে পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে পিচ্চি হেলাল ও ইমনের আধিপত্য বিস্তার আর চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্ব। তবে ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে ইমনের মা সুলতানা জাহান দাবি করেন, ইমন বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন, তাকে ষড়যন্ত্র করে মাল্টিপ্ল্যানের সামনের ঘটনায় ফাঁসানো হয়েছে।
মায়ের দাবি, ছেলে ইমন আওয়ামী নেতা ও মন্ত্রীদের রোষানলে পড়ে একাধিক মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেলখানায় আটক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইমন জামিনে মুক্তি পেয়ে ইমন বিদেশে চলে গেছেন।
তিনি বলেন, মাল্টিপ্ল্যানের সামনে হামলায় আহত ওয়াহিদুল হাসান দিপু শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালের আপন বড় ভাই। এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনা নিয়ে সুলতানা জাহান জানান, মাল্টিপ্ল্যান মার্কেটের সভাপতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মার্কেটের সভাপতি পদে বিজয়ী হন ওয়াহিদুল হাসান দিপু। মার্কেটটি নিজের দখলে রাখার জন্য হামলার ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
২৪ বছর পর মুক্ত হয়েই জোড়া খুনের আসামি ‘পিচ্চি হেলাল’
ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারী রাজধানীর আদাবার থেকে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু দীর্ঘ কারাভোগের পরও অপরাধ জগতের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেনি তার। বরং আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা শীর্ষ এই সন্ত্রাসী। তার মুক্তির পরই মোহাম্মাদপুর ও এর আশপাশের এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই ঘটছে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। তিনি বের হওয়ার মাসেক খানিক সময়ের ব্যবধানে মোহাম্মাদপুর এলাকায় অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার এলাকায় নাসির ও মুন্নাকে জোড়া খুনের ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া আসামীর তালিকায় আছে রাহুল, শাহরুখ, রয়েল, পারভেজ, ইমন ওরফে এলেক্স ইমনসহ মোহাম্মদপুরের আরও অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জন।
জানা গেছে, গত ১৫ বছর ওই এলাকায় চাঁদাবাজি করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যায় তারা। এরমধ্যেই কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন পিচ্চি হেলাল। মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, লালমাটিয়া এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম শুরু করেন পিচ্চি হেলাল। পিচ্চি হেলালের নেতৃত্বে মোহাম্মদপুরের বাসস্ট্যান্ড, মার্কেট, ফুটপাথ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি শুরু হয়। এভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে ইতিমধ্যে সংঘর্ষ, রক্তারক্তি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সূত্রমতে, শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল কারাগারে থাকতেই মোহাম্মাদপুরের বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া ছিলেন। জেলে থাকতেই মোহাম্মাদপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো পিচ্চি হেলালের নামে। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতা, জনপ্রতিনিধিরাও চাঁদার ভাগ দিতেন পিচ্চি হেলালকে। গোয়েন্দারা জানান, পিচ্চি হেলার মুক্তির পর এখন পুরো মোহাম্মাদপুরে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর বাহিনী। যার কারণেই মোহাম্মাদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজধানীর সৌখিন সন্ত্রাসী ইমন
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সৌখিন সন্ত্রাসী-খ্যাত ইমন কারাগারের ভিতরে-বাইরে একই রকম। কারাগারের বাইরে যখন ছিলেন, খুন করেছেন একের পর এক। যখন ভিতরে-তখন দিয়েছেন খুনের নির্দেশ। মোবাইল ফোনের এমন নির্দেশের পর লাশ পড়েছিল হাজারীবাগে। র্যাব তার মোবাইল ফোনের কথাবার্তা রের্কড করলে বেরিয়ে আসে খুনের নির্দেশের এমন ঘটনা।
স্বনামধন্য চিকিৎসক দম্পতির সন্তান ইমন দীর্ঘ ২০ বছর পর মুক্ত বাতাসে বাস করছে। ধানমন্ডিতে তাদের বাসা। এলাকার বখাটে কিছু ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে অবৈধ অস্ত্রের সঙ্গে তার পরিচয়। তার শখ হয় নিজের কাছে অস্ত্র রাখার। সেই শখ মেটাতেই টাকা দিয়ে নিত্যনতুন অস্ত্র কিনতে থাকেন ইমন। যখন যার কাছে নতুন কোনো অস্ত্রের সন্ধান পান, তাকেই বলেন অস্ত্র কিনে দিতে। ধীরে ধীরে তার এই অস্ত্রের ভাণ্ডারের সংবাদ চাউর হয়ে যায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে। তার শত্রুও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে তাকে টার্গেট করে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটে। এরপরই মূলত ইমন নিজেকে রক্ষায় শখের সেই অস্ত্র হাতে তুলে নেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শুরু হয় তার অন্যরকম এক সহিংস মিশন। সৌখিন এই সন্ত্রাসী একসময় হয়ে ওঠেন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী।
সানজিদুল ইসলাম ইমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন। তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হয় ১৯৯৯ সালে ধানমন্ডি এলাকার গালকাটা জব্বার নামে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের ধরে। পরে তিনি হয়ে ওঠেন ধানমন্ডি এলাকার ত্রাস। পর্যায়ক্রমে ইমনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত হয় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রমনা, বাড্ডা, কোতোয়ালি, লালবাগ, উত্তরা, তেজগাঁও ও হাজারীবাগ এলাকায়। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ৩০টির বেশি হত্যা মামলা রয়েছে। যার মধ্যে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইসলাম অশ্রু হত্যাকাণ্ড রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, একসময় মোহাম্মদপুরের একটি বাহিনীর সঙ্গে ইমনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ওই বাহিনীর সঙ্গে থেকে হিমেল, পলাশ, মার্ডারসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। ফেরারী হয় সমাজের উচ্চপর্যায়ের একটি পরিবারের সন্তান ইমন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার নিজস্ব বাহিনী গড়ে ওঠে। তার বন্ধু ও সহযোগী মামুনকে নিয়ে গড়ে তোলা এ বাহিনীর নাম হয় ইমন-মামুন গ্রুপ। চাঁদাবাজি, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা। ভাড়াটে হিসেবে তারা খুন-খারাবি শুরু করেন। এ বাহিনীর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে হতো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যসব বাহিনীকে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ইমনকে সমীহ করতেন। তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতেন।
বিশেষ করে দেশের একজন আলোচিত-সমালোচিত বিতর্কিত ব্যবসায়ী যিনি দেশের বাইরে থাকেন, সেই ব্যবসায়ীর অন্যতম ক্যাডার ছিলেন এই ইমন। তার হয়ে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করেন। সূত্র জানায়, ইমন বিয়ে করেন তার বন্ধুর বোনকে। তার শ্বশুরবাড়ি যশোরে। এমন একটি সময় গেছে, যখন খুন-খারাবি ছাড়া ইমন যেন আর কিছুই ভাবতে পারতেন না। শ্বশুরবাড়ি যশোর গিয়েও তিনি খুন করে এসেছেন। নিছক পাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তর্কবিতর্কের কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফতাব আহমেদ হত্যাকাণ্ডেও জড়িত রয়েছেন এই ইমন। এ ছাড়া কারাবন্দী জোসেফের ভাই টিপুসহ দুই খুনেও ইমন জড়িত বলে পুলিশ জানায়।
জেল হাজত থেকে সর্বশেষ খুনের নির্দেশনা
২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে হাজারীবাগ তিন মাজার মসজিদের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হাজারীবাগের ট্যানারি ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন সাত্তারকে হত্যা করা হয়। সাত্তার রাজধানীর ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। এর আগে কারাগারে বসে সাত্তারকে খুন করান বন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। প্রায় এক মাসের পরিকল্পনায় তিনি ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। কারাগারে বসেই ইমন তার সহযোগীদের সঙ্গে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের ছক আঁকেন। ইমন ও তার সহযোগীদের মোবাইল ফোনের কথোপকথনের সূত্র ধরে সাত্তার খুনে ইমনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তা ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর ইমনের সহযোগী বুলু ও মাসুদকে গ্রেফতার করে র্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে ইমনের পরিকল্পনায় কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার বিস্তারিত খুলে বলেন বুলু।সূত্র জানায়, সাত্তার সে সময় বুঝতে পেরেছিলেন তার জীবন হুমকির মধ্যে রয়েছে। এ কারণে তিনি বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়া প্রায় বন্ধ করে দেন। আর এতে অপেক্ষা করতে করতে অস্থির হয়ে পড়েন ইমনের সহযোগীরা। হত্যাকাণ্ডের তিন দিন আগে ইমন কারাগার থেকে কিলিং মিশনের সর্বশেষ নির্দেশনা দেন।
ওই কথোপকথন ছিল নিুরূপ
বুলু : ভাই, স্লামালেকুম।
ইমন : বল, কি খবর, ওই (সাত্তার) কি বাইর হইছে।
বুলু : না ভাই। কি করন যায় কন দেহি।
ইমন : চুপ থাক। একটা লোক ৫ দিন ঘরে থাকতে পারে কিন্তু ৬ দিনের দিন সে বাইর হইবই।
বুলু : অগোরে (ভাড়াটে কিলার) তো বাড়ির আশপাশে খাড়া কইরা রাখছি।
ইমন : মেশিন পাঠায়া দিছি। পাইছস।
বুলু : হ ভাই পাইছি। গুলি পাইছি ১৫টা।
ইমন : তাইলে কামডা সাইরা ফালাইয়া দে তাড়াতাড়ি।
এরপর ১৪ ডিসেম্বর সাত্তারকে খুন করে ইমনকে আনন্দের সংবাদ জানান কিলার বুলু।এ সময়ের কথোপকথন ছিল-বুলু : ভাই,ইমন : হুবুলু : ফাইনাল, শেষ।ইমন : ঠিক আছে।বুলু : একদম পইড়া রইছে।ইমন : চুপ কর, তুই যাইছ না।২০০০ সালের শেষ দিকে গ্রেফতার এড়াতে ইমন ভারতে আত্মগোপন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার গঠনের পর দেশে ফেরেন ইমন। আবার শুরু হয় তার সন্ত্রাসী তৎপরতা। তবে ২০০৫ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারের ভয়ে আবার ভারতে পালিয়ে যান ইমন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের শেষ দিকে সিআইডির সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আরেফের নেতৃত্বে একটি টিম ইমন, তাজ, ইব্রাহিম, লম্বু সেলিমসহ সাত সন্ত্রাসীকে দেশে ফেরত আনে।
আমার বার্তা/এমই
