বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ, বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

শেষ পর্যন্ত সত্য হলো আশঙ্কা! ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ ভারতে হলে অংশ নেবে না বাংলাদেশ।। নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে না খেলার ব্যাপারে অনড় ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলও (আইসিসি) ছাড় দেয়নি। তারাও ভেন্যু ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় যেতে রাজি নয়। একদিন আগেই সিদ্ধান্ত নিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল আইসিসি। সেই সময় শেষের আগেই জানা গেল-বিশ্বকাপের মাঠে নামার আগেই স্বপ্ন শেষ!
ক্রীড়া উপদেষ্ঠা আসিফ নজরুল আজ সংবাদ সম্মেলনে সাফ জানিয়ে দিলেন-ভারতে বিশ্বকাপ খেলবে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সুবিচার পায়নি এমন অভিযোগও করেন তিনি। আশা করেন শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচ সরিয়ে নেবে আইসিসি।
ভেন্যু পরিবর্তনের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়নি আইসিসি। দুই পক্ষের এই অনমনীয় অবস্থানের ফলেই বিশ্বকাপ শুরুর আগেই টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।
আইসিসির দেওয়া ২৪ ঘণ্টার চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই পরিষ্কার হয়ে যায় বাংলাদেশের অবস্থান। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আগের বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ঝুঁকি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করে বিসিবি। এবারের বিশ্বকাপে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব থাকছে না।
বাংলাদেশকে ছাড়াই বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ অনেক আগেই তৈরি করে রেখেছিল আইসিসি। এর আগের দিন বিসিবিকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিল সংস্থাটি। আইসিসির বোর্ড সভায় বাংলাদেশ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভোটাভুটির মাধ্যমে, যেখানে বিসিবি হেরে যায় ১২-২ ব্যবধানে। বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দেয় কেবল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। অধিকাংশ পূর্ণ সদস্য দেশের সমর্থন না পাওয়ায় ক্রিকেট কূটনীতিতে বিসিবির সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল গত কয়েক দিন ধরে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন আইসিসির সদস্য বোর্ডগুলোর সঙ্গে। বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা কাজে আসেনি। আইসিসির বোর্ড সভায় ভোটের ফলই জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের দাবি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি বৈশ্বিক ক্রিকেট রাজনীতিতে।
ভোটাভুটির পর আইসিসি এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতেই আয়োজন করা হবে। টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে ভেন্যু পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও জানায় সংস্থাটি। আইসিসি স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশ যদি ভারতে খেলতে না যায়, তাহলে ‘সি’ গ্রুপে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ড অংশ নেবে। উল্লেখ্য, স্কটল্যান্ড এই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি; ইউরোপীয় বাছাইপর্বে তারা নেদারল্যান্ডস ও ইতালির পেছনে ছিল।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম তিনটি ম্যাচ ৭, ৯ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় এবং শেষ ম্যাচটি ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ২০০৭ সাল থেকে প্রতিটি আসরেই অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। গত ১৯ বছরে এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণে এবারই প্রথম বড় ধরনের ছেদ পড়ল। মর্যাদাপূর্ণ এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি বিসিবির জন্য ক্রীড়াগত ও ভাবমূর্তির দিক থেকে বড় ধাক্কা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত ৩ জানুয়ারি, যখন ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত ঘটনার জেরে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেই ঘটনার পরদিনই বিসিবি ঘোষণা দেয়, নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে তারা বিশ্বকাপ খেলবে না। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়।
প্রায় ২০ দিন ধরে বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে একাধিক চিঠি চালাচালি এবং বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইসিসির এক প্রতিনিধি ঢাকায় এসে আলোচনাও করে যান। বিসিবি বারবার দাবি করে এসেছে, তাদের অবস্থান আইনসংগত ও যৌক্তিক। জবাবে আইসিসি জানিয়েছে, ভারতের বাইরে বাংলাদেশের ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব নয়।
আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা অমিত শাহর ছেলে। সংস্থাটির শীর্ষস্থানীয় অনেক পদে ভারতীয়দের আধিপত্য রয়েছে-এই বাস্তবতায় ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন, এমন ধারণাও আলোচনায় এসেছে। শেষ পর্যন্ত আইসিসি ভোটিং পদ্ধতিতেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে।
আইসিসির সর্বশেষ অবস্থান ব্যাখ্যা করে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিসিবির সঙ্গে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক সংলাপ হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। আইসিসির দাবি অনুযায়ী, স্বাধীন নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন, ভেন্যু-ভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং আয়োজক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক আশ্বাসে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে ভারতে বাংলাদেশ দলের জন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি নেই!
সব যুক্তি ও পাল্টা যুক্তির পরও শেষ পর্যন্ত দেশের মর্যাদা আর নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিল বাংলাদেশ। ফলাফল হিসেবে, শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা!
আমার বার্তা/এমই
