শিরোনাম :

  • বিমানের সিটের হাতলে মিলল ২৪ কেজি স্বর্ণ কবি নজরুলের পুত্রবধূ উমা কাজী মারা গেছেন ২০২১ সালের কলকাতার বইমেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হবে ২ ইরানি কূটনীতিককে আলবেনিয়া ছাড়ার নির্দেশ
রংপুর টাউন হল : পুরো নয় মাস ছিল একাত্তরের টর্চার ক্যাম্প
রংপুর প্রতিনিধি :
১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১৭:০৯:০২
প্রিন্টঅ-অ+


রংপুর টাউন হল। ১৯৭১ সালের পুরো নয় মাস জুড়ে এখানে চলে হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব। কি ঘটতো এখানে তা এই প্রজন্মের অনেকেরই অজানা।

৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদাররা টাউন হলটিকে বানিয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প অর্থাৎ টর্চার ক্যাম্প। মুক্তিকামী নিরপরাধ বাঙালীদের ধরে এনে এখানে চালানো হত নির্মম নির্যাতন। বাঙালী রমণীদের ধরে এনে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হতো। পরে একসময় তাদের হত্যা করা হতো। অসহায় নারী-পুরুষের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠতো টাউন হল এলাকা।

টাউন হল সংলগ্ন উত্তর পাশে ছিল একটি বড় পাকা ইঁদারা। ঠিক ইঁদারার পাশেই ছিল বিশাল এক বড়ই গাছ। প্রতিদিন সেই গাছের ডালে ঝুলিয়ে নিরপরাধ মানুষগুলোকে উলঙ্গ অবস্থায় নির্যাতন করা হতো। নির্মম নির্যাতনের পর একসময় তাদের হত্যা করে বড়ই গাছের নিচে অথবা পাশের তৎকালীন উদ্ভিদ উদ্যান কেন্দ্রের আমবাগানে মাটি চাপা দেয়া হতো।

এখনও প্রবীণ কেউ যদি সাবেক উদ্ভিদ উদ্যান কেন্দ্র (বর্তমানে চিড়িয়াখানা) অভ্যন্তরে যান তবে একাত্তরের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে তার মনের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেখানে কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল, কারা শহীদ হয়েছেন তাদের কোন তালিকা তৈরি হয়নি। দু:খজনক যে, রংপুর টাউন হল টর্চার কেন্দ্রে সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের কোন নিদর্শন নেই। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও কেউ একটি সাইনবোর্ড লাগানোরও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সম্প্রতি একটি সংগঠন টাউন হলকে শহীদ স্মৃতি হল হিসেবে ঘোষণা দিলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী টাউন হলের পূর্ব পাশে অবস্থিত রংপুর হাই স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মরহুম শাহ তৈয়বুর রহমান তার জীবদ্দশায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, টাউন হলটি স্কুল সংলগ্ন হওয়ায় ছাত্ররা প্রায়ই খান সেনাদের এই নির্যাতন দেখে অজ্ঞান হয়ে যেত। একদিন অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্র শিক্ষকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্কুলের ছাদে ওঠে হানাদার বাহিনীর নির্যাতন দেখছিল। হঠাৎ করে ছেলেটি অজ্ঞান হয়ে নিচে পড়ে যায়। এই নিয়ে পুরো স্কুলের ছাত্ররা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরদিন পাকিস্তানি সেনারা প্রধান শিক্ষককে তাদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। নির্দেশ দেয় টাউন হলের দিকে মুখ করা স্কুলের সবগুলো জানালা বন্ধ করে দিতে হবে। জানালা খোলা থাকলে সরাসরি গুলি চালানো হবে। এছাড়া কেউ ছাদে উঠলে তাকেও গুলি করে হত্যা করা হবে। যদি কেউ এই আদেশ অমান্য করে তাহলে প্রধান শিক্ষককেও হত্যা করা হবে। এ ঘটনার ক’দিন পর পরেই প্রধান শিক্ষক স্বপরিবারে রংপুর ছেড়ে চলে যান।

ওই স্কুলের তৎকালীন ছাত্র অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরীজীবী তারেক জানান, তারা অনেকেই সেই নির্মমতার দৃশ্য দেখেছেন। টাউন হলের পূর্ব পাশে প্রতিদিন বাঙালীদের ধরে এনে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন করা হত। কখনো সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে দু’জন খান সেনা ধরে আনা ব্যাক্তিকে চেংদোলা করে ধরতো, আরেকজন রাইস মিলের বেল্ট দিয়ে পিটাত। আবার কখনো বড়ই গাছের ডালে ঝুলিয়ে তাদের নির্যাতন করা হতো। তাদের আর্তচিৎকার শোনা যেত স্কুল থেকে।

মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলম দুলু বলেন, ‘এ প্রজন্মের নিকট মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হলে একাত্তরের টর্চার ক্যাম্প রংপুর টাউন হলে পাক হানাদারদের হাতে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আত্মার শান্তির জন্য এবং তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকারিভাবে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষমা করবে না।’

তৎকালীন রংপুর হাই স্কুলের ছাত্র রুবেল জানান, বিজয়ের দু’দিন পর অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর টাউন হলের পাকা ইঁদারা এবং উদ্ভিদ উদ্যান কেন্দ্রে বেশ ক’জনের গলিত লাশ দেখেছেন। এর মধ্যে বেশ ক’জন মেয়ের লাশও ছিল। অভ্যন্তরে গলিত লাশের মধ্যে মহিলাদের চুল, হাতের চুড়ি, কাপড় ও মাথার খুলি ছিল।

স্থানটিকে চিহ্নিত করে বধ্যভূমির মর্যাদা দিয়ে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা সময়ের দাবি।



আমার বার্তা/১২ ডিসেম্বর ২০১৯/রহিমা


আরো পড়ুন