শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
সরকারি দপ্তরের ৬ কোটি টাকার তেল আত্মসাৎ করছে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র
মো. সাইফুল ইসলাম একা
১০ আগস্ট, ২০২২ ১৫:০৪:২৮
প্রিন্টঅ-অ+

জ্বালানির আগুনে জ্বলছে দেশ। এই আগুনের মাঝেও চলছে সমানতালে তেল চুরি। প্রতিমাসে সরকারি দপ্তরের প্রায় ৬ কোটি টাকার জ্বালানি তেল চুরি করছে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র। 


রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হলো- শের-ই বাংলা নগর থানার আগারগাঁও অঞ্চল। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পাশে রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ চোরাই তেলের দোকান।


দিনে প্রায় ২ হাজার লিটারেরও বেশি তেল চুরি করে বিক্রি হচ্ছে এ সকল স্থানের প্রতিটি দোকানে। এখানে বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি গাড়ি থেকে জ্বালানি তেল অকটেন,পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রি করে আসছে অসৎ কর্মকর্তাসহ চালকেরা।


রাস্তার পাশে সরকারি জমি দখল করে  বাঁশ, টিনের বেড়া দিয়েই তৈরি হয় এসকল দোকান। দোকানের সামনে লম্বা বাঁশের উপর ঝুলানো থাকে তেল মবিলের খালি বোতল। যাকে তেল বেচা কেনার চিহ্ন বুঝানো হয়। লম্বা পাইপ ব্যবহার করে ট্যাংকি থেকে তেল বের করা হয় এ সকল স্থানে। তেল বের করার জন্যে প্রতিটি দোকানে ৩ থেকে ৪ জন  কর্মচারী থাকেন তাদের বেতনও অনেক। তারা অবৈধ উপায়ে সরকারি গাড়ি থেকে তেল চুরির দায়িত্বে থাকেন। যাদেরকে বলা হয়ে থাকে বেতনভুক্ত চোর। অসাধু গাড়ির ড্রাইভারদের থেকে ডিজেল প্রতি লিটার ক্রয় করেন ৯৫ টাকা। যা তারা পরবর্তীতে কিছু পাম্পে বিক্রি করেন ১০৫ টাকা দরে। আর অকটেন প্রতি লিটার ক্রয় করেন ১১০ টাকায় আর বিক্রি করেন ১২৫ টাকায়।


বিভিন্ন দপ্তরের গাড়ির চালকেরা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে তেল বিক্রি করে আসছে বহুদিন ধরে। আর এতে ফায়দা লুটেন থানা পুলিশ থেকে শুরু করে কিছু অসাধু র‍্যাব কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসনসহ নাম মাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। পুলিশকে মাসিক, র‍্যাবকে সাপ্তাহিক ও দৈনিক টহল পুলিশকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করেন এ ব্যবসায়ীরা। জানা যায়, স্থানীয় থানার অফিসার ইনচার্জ উৎপল বড়ুয়ার বডিগার্ড মো. নজরুলকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হয় চাঁদা হিসেবে প্রতি মাসে। অপরদিকে প্রতিদিন টহল গাড়িকে দিতে হয় ১শ টাকা চাঁদা। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, র‍্যাবের এক অসাধু কর্মকর্তাকেও দিতে হয় প্রতি সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা।


এছাড়াও এসকল দোকান থেকে আরও কিছু মানুষ দোকানের ভাড়া বাবদ টাকা পান বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ভবন-২ এর দখলদার মো. রাজিব (২৫)। তিনি প্রতি মাসে শুধুমাত্র একটি চোরাই তেলের দোকান থেকেই ভাড়া নামক চাদায় হাতিয়ে নিচ্ছেন ২০ হাজার টাকা। জানা যায়, তিনি শের-ই বাংলা নগর পাকা মার্কেটের মালিকের ছেলে।


অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে  শের-ই-বাংলা থানা এলাকায় শুধু সরকারি দপ্তর ঘিরে অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০টি তেল চুরির স্পট রয়েছে। এসব দোকানে দিনে ১৬ থেকে ২০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল নামানো হয় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরসহ বিমানবন্দরের গাড়ি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি থেকে। যার বাজার মূল্য প্রায় বিশ লক্ষ টাকা। যা মাস শেষে দাঁড়ায় প্রায় ৬কোটি টাকা। 


জানা যায়, এসকল দোকানের অধিকাংশই রাকিব ও বিল্লালের ছত্রছায়ায় ও রাকিব বিল্লালের ব্যক্তি মালিকানাধীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাকিব ও বিল্লালের চোরাই তেল দোকানের একজন কর্মচারী দৈনিক আমার বার্তাকে বলেন, 'প্রতিদিন দোকান প্রতি তেল ক্রয় করি পনেরশ থেকে ২ হাজার লিটার পর্যন্ত ৬টা দোকানে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার লিটার তেল ক্রয় করে তেলগুলো মোহাম্মদপুর মিরপুরসহ কিছু পাম্পে বিক্রি করা হয়। বাকি যতটুকু তেল থাকে তা মাদারীপুর জেলার রাকিব ও চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের বিল্লালের অন্য দুটি দোকানে খুচরা বিক্রি করে থাকি। একটি দোকান পশ্চিম আগারগাঁও আমলির টেক মোড়ে ও অন্য আরেকটি দোকান বিএনপি বাজার মূল সড়কের পাশেই। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়। তবে এটা অবৈধ ব্যবসা হওয়ার কারণে মাঝে মধ্যেই প্রশাসনের বিভিন্ন প্রকার লোকজন এসে হামলা চালায়। পরবর্তীতে অনেক টাকা নিয়ে আবার ছেড়ে দেয়। আবার কেউ কেউ মামলা দেয়। অন্যদিকে দোকানের ভাড়া বাবত রাজিবকে ২০ হাজার টাকা ও থানায় দোকান প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মাসিকসহ সাপ্তাহিক র‍্যাবকে ৫০০০ হাজার টাকা দৈনিক টহল পুলিশকে দোকান প্রতি ১০০শ থেকে ৩০০শ টাকার বাহিরেও অন্য আরো অনেক খরচ রয়েছে। সব খরচ দিয়ে দৈনিক হয়তো ৫০০০ হাজার টাকার মতো রাকিব ভাই ও বিল্লাল ভাইয়ের লাভ থাকে।


আইসিটি ভবনের একটি প্রাইভেট কার ও বাংলাদেশ বিমানের একটি গাড়ি থেকে তেল বিক্রি করে আসার পথে এবিষয়ে ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ভাই এই বিষয় কিছু করবেন না দয়া করে আমার চাকরি থাকবে না। পরে পরিবার নিয়ে রাস্তায় বসতে হবে বলে ক্ষমা চাইতে শুরু করে। এক পর্যায়ে বলে উঠেন তেল চুরি না করলে চাকরি থাকবে না কারণ আমার আগের চালক একই কাজ করে গেছে আমি এখন তেল কম খরচ করলে বলবে আমি গাড়ি নষ্ট করে ফেলবো অন্যদিকে বেতন কম বলে স্থান ত্যাগ করেন। 


এসব  বিষয়ে চোরাই তেল ব্যবসায়ী রাকিবের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, 'ভাই আমরা চোরাই তেলের ব্যবসা করি, কিন্তু র‍্যাব পুলিশকে কোন টাকা দেই না। কিছুদিন আগেও আমাদের ৪ থেকে ৫ জন ছেলে-পেলেকে ধরে নিয়ে মামলা দিয়ে দেয়। ভাই আপনার সাথে সরাসরি কথা বলবো বলে ফোন কেটে দেয়।' দ্বিতীয় ব্যক্তি বিল্লালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি বিগত সাড়ে ৩ বছর যাবত রাকিবের সাথে ব্যবসা করি না আপনি আগামীকাল আগারগাঁও আসেন একসাথে বসে কথা বলি।'


এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পুলিশ প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার মতোই থাকে এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর। প্রত্যেক দোকানেই মাসিক বেতন দিয়ে  দুই-তিন জন করে কর্মচারী রাখা হয়েছে। তারা গাড়ির ট্যাংকি থেকে তেল নামিয়ে রাখে। দোকান মালিকরা আড়াল থেকেই দোকান পরিচালনা করে। প্রায় প্রতিটি দোকানেই রাত-দিন কর্মচারীরাই থাকে। এসকল কর্মচারীরাই আবার গভীর রাতে হয়ে পড়েন ছিনতাই মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। এসকল অবৈধ ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ ও এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান আশপাশের বসবাসকারীরা। 


সরকারি জমি দখল করে অবৈধ ব্যবসার বিষয়ে তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার এইচ এম আজিমুল হক বলেন, 'এসকল অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে খুব তাড়াতাড়ি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমি নিজেই অভিযান চালিয়ে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আমি নতুন জয়েন্ট করেছি এসব বিষয় আমার জানা ছিলো না।

আরো পড়ুন