শিরোনাম :

  • পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই : স্পিকার আন্তর্জাতিক পর্বত দিবস আজ পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান : রাষ্ট্রপতি
‘অবৈধ’ বিনিয়োগ প্রাইম লাইফের
নিজস্ব প্রতিবেদক :
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১১:০৬:৫২
প্রিন্টঅ-অ+


বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইন মানছে না পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বছরের পর বছর ধরে কোম্পানিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম করছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইন মানতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) থেকে দফায় দফায় নির্দেশনা দেয়া হলেও তা পরিপালন করেনি জীবন বীমা কোম্পানিটি। গত কয়েক বছরের মতো চলতি বছরেও প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একটি জীবন বীমা কোম্পানি-কে তার পলিসিহোল্ডারদের দায় বা লাইফ ফান্ডের ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বছরের পর বছর তা লঙ্ঘন করে আসছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইডিআরএ থেকে কোম্পানিটি-কে আইন মানতে ২০১৬ সাল থেকে দফায় দফায় সময় বেধে দেয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রাইম লাইফের সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ রয়েছে ১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অথচ আইন অনুযায়ী এ খাতে কোম্পানিটির সর্বনিম্ন বিনিয়োগ থাকার কথা ২৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগ কম রয়েছে ২১৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

বিনিয়োগের এ অনিয়মের কারণে গত ২০ আগস্ট আইডিআরএ থেকে প্রাইম ইসলামী লাইফ-কে একটি চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘বীমা আইন ১৯৩৮ এর ২৭ ধারা এবং বীমা বিধিমালা ১৯৫৯ এর বিধি ১০-ক বিধান অনুযায়ী লাইফ ফান্ডের ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজ খাতে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আপনার কোম্পানি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে এ বিধি লঙ্ঘন করে আসছে।’

প্রাইম ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)-কে লেখা ওই চিঠিতে অনিয়মের লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের হালনাগাদ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা-কে আইডিআরএ’র কার্যালয়ে শুনানিতে ডাকা হয়।

এ বিষয়ে আইডিআরএ সদস্য ড. এম মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাইম ইসলামী লাইফ যে আচরণ করছে তাতে স্পষ্ট যে, কোম্পানিটিতে সুশাসনের অভাব আছে। আমরা বিনিয়োগে অনিয়মের কারণে কোম্পানিটি-কে চিঠি দিয়েছি এবং তাদের শুনানিতে ডেকেছি। এখন তারা কী ব্যাখ্যা দেয় আমরা দেখব।

বীমা সংশ্লিষ্টদের মতে, জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যই সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ডে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকলে গ্রাহকের টাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। কোনো কোম্পানি এ নির্দেশ না মানলে বীমা আইন ২০১০ এর ‘ঘ’ ও ‘ছ’ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে আইডিআরএ।

এ বিষয়ে একাধিক জীবন বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সরকারি সিকিউরিটিজে ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ না করা স্পষ্টতই আইন লঙ্ঘন। আইন লঙ্ঘন করা মানেই কোম্পানিটি অবৈধভাবে বিনিয়োগ করছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিটি-কে আইন মানতে বাধ্য করার জন্য আইডিআরএ’র উচিত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

শুধু চলতি বছর নয়, বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাইম ইসলামী লাইফের বিনিয়োগে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে আইডিআরএ। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটি-কে কয়েক দফা চিঠিও দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে কিছুতেই কিছু হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইন অনুযায়ী সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ না করায় ২০১৬ সালে প্রাইম ইসলামী লাইফ-কে শুনানিতে ডাকে আইডিআরএ। এরপর বিনিয়োগের অনিয়মের বিষয়ে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়ে আইডিআরএ ওই বছরের ২২ নভেম্বর কোম্পানিটি-কে চিঠি দেয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও কোম্পানিটি ব্যাখা প্রদান করা থেকে বিরত থাকে। এরপর ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর আরও একটি চিঠি দিয়ে সাতদিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইম ইসলামী লাইফ চার মাস সময় চেয়ে আইডিআরএ’র কাছে আবেদন করে। এরপর ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল আইডিআরএ থেকে আবারও প্রাইম ইসলামী লাইফ-কে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়। ওই নোটিশে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইডিআরএ’র দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গহণের জন্য ৩০ দিন সময় দেয়া হয়। একই সঙ্গে নির্দেশনা না মানলে বীমা গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

তবে আইডিআরএ’র ওই হুঁশিয়ারি কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। বছরের পর বছর পার হলেও প্রাইম ইসলামী লাইফ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইন মানেনি। তবে ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল আইডিআরএ থেকে হুঁশিয়ারি দেয়ার পর ওই বছরের ৩০ এপ্রিল আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) বরাবর একটি চিঠি লেখে প্রাইম ইসলামী লাইফ। চিঠিটি ২ মে আইডিআরএ কার্যালয়ে পৌঁছায়।

ওই চিঠিতে প্রাইম লাইফের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ্ আলম বলেন, ‘আমরা ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজ খাতে বিনিয়োগ করে ঘাটতি পূরণে বদ্ধপরিকর। তার-ই ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অকশনের মাধ্যমে ১৩ কোটি টাকার বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড ক্রয়ের জন্য বিড দাখিলের বিপরীতে তিন কোটি ৩৩ লাখ টাকা ক্রয় করতে সক্ষম হই।’

‘পরবর্তীতে সরকারি সিকিউরিটিজের অকশন অনুষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করা হবে’ জানিয়ে ওই চিঠিতে ‘প্রাইম লাইফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করার জন্য অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ ঘাটতি সম্পূর্ণ পূরণ করা হবে’ বলেও চিঠিতে জানানো হয়।

তবে ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর পার হয়ে আরও দেড় বছর চলে গেলেও প্রাইম ইসলামী লাইফ বিনিয়োগের অনিয়ম থেকে সরে আসেনি। দফায় দাফায় হুমকি দিয়ে চিঠি দিলেও বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অদৃশ্য কারণে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ভূমিকার বিষয়ে আইডিআরএ সদস্য ড. এম মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার আর প্রাইম ইসলামী লাইফ-কে ছাড় দেয়া হবে না। বিনিয়োগ অনিয়মের ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত ব্যাখা দিতে না পারলে অবশ্যই এবার কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা অনেক সময় দিয়েছি। আর সময় দেয়া সম্ভব নয়।’

বিনিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে মোহাম্মদ শাহ্ আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখন আর প্রাইম ইসলামী লাইফে নেই। ব্যক্তিগত কারণে আমি কোম্পানিটি থেকে রিজাইন দিয়েছি। সুতরাং এ বিষয়ে আমি এখন কোনো মন্তব্য করব না।’

প্রাইম ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্বে থাকা নিজাম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগের ম্যানেজমেন্ট অনিয়ম করে গেছে। আমরা এটিকে একটি সেফ জোনে (নিরাপদ কাঠামো) নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আশা করি ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা একটি পর্যায়ে যেতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের বিনিয়োগের অনিয়ম থেকে সরে আসতে হবে। আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের বড় অঙ্কের দাবির টাকা পরিশোধ করছি। গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ দাবির টাকা পরিশোধ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ বিশাল অঙ্কের দাবি বকেয়া পড়েছিল।



আমার বার্তা/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯/রিফাত


আরো পড়ুন