শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যয়ে সম্প্রীতি ও শিক্ষার গুরুত্ব
২৩ নভেম্বর, ২০২১ ১১:৫২:১৮
প্রিন্টঅ-অ+

সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যয়ে এগুতে হলে অবশ্যই সমৃদ্ধ ও জাতি গঠন প্রক্রিয়ার মর্মার্থ বুঝতে হবে। জাতি হলো এমন একটি সম্প্রদায়, যে সম্প্রদায়ের জনগণ নিজেদের স্বায়ত্বশাসন, ঐক্য ও অন্যান্য অধিকারের ব্যাপারে সচেতন। যা একটি সাধারণ ভাষা, অঞ্চল, ইতিহাস, জাতিগততা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।


এই গড়ে উঠা জাতির সমৃদ্ধির অগ্রগমনের বিষয়টি জানতে হলে অবশ্যই সমৃদ্ধি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। সমৃদ্ধি হলো এমন একটি শর্ত, যেখানে একজন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটি বিকাশমান ও সমষ্টির সফল সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করে। নাগরিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত। একটি জাতিকে জাতিসত্তা বজায় রেখে উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির পথে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যেতে হলে এর কয়েকটি অনুসঙ্গ বা উপকরণের রীতিতে জনসমষ্টির সাবলীল ঐক্য গড়ে উঠা প্রয়োজন।


যেখানে ধর্ম বর্ণ শ্রেণী পেশা নির্বিশেষে সম্প্রীতির অপরিহার্য গুরুত্ব রয়েছে। এই সম্প্রীতি শব্দটি সম্পর্কের দিক থেকে বহুমাত্রিক। ব্যক্তিক, পারিবারিক ও সমষ্টিগত বিচারে তা ধর্মীয় সম্প্রদায়গত, শ্রেণীগত, জাতিগত, এমনকি রাষ্ট্রিক ও বৈশ্বিক। এই সম্প্রীতিটা জাতি রাষ্ট্রে দৃঢ় রূপ দিতে হলে জাতির সামষ্টিক মননে মানবিক দর্শন জাগৃত হতে হবে। যেখানে শিক্ষা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে কাজ করবে। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো জাতি রাষ্ট্র সমৃদ্ধির সোপানে পৌঁছেছে, সেখানে মানবিক দর্শন নির্ভর বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষাই অন্যতম অনুঘটকের ভ‚মিকা রেখেছে।


এই শিক্ষার সাথে জাতীয় মূলধন বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক বা যোগসূত্র বিদ্যমান। উদাহরণ হিসেবে লক্ষ্য করা যেতে পারে-জাপানে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে শিক্ষাগত মূলধন বৃদ্ধির ফলে জাতীয় আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ বৃদ্ধি ঘটেছে। জাপান শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত “জাপানের বিকাশ ও শিক্ষা” নামক পুস্তকে বলা হয়েছে, “এ দেশে শিক্ষার একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সমগ্র জনসমাজের দক্ষতার বৃদ্ধি ঘটানো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা উপযুক্ত সামাজিক অগ্রগতি কোনটাই সমাজের শুধু সীমাবদ্ধ অংশের অগ্রগতি থেকে বা গুটিকয়েক দক্ষ ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সম্ভব হতে পারে না”।


পরিকল্পিত শিক্ষা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রুশ বিপ্লবের নেতারা শিক্ষাকে তাঁদের পরিকল্পিত সাম্যবাদী সমাজ গঠনের হাতিয়ার হিসেবেই শুধু দেখেননি, বরং এ হাতিয়ারকে অত্যন্ত দূরদৃষ্টি ও যোগ্যতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছিলেন। রুশ বিপ্লবের নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের মতে “শিক্ষা হবে সাম্যবাদের পথে সমাজকে এগিয়ে নেয়ার একটা হাতিয়ার”। পরবর্তীতে স্ট্যালিন এবং ক্রুশ্চেভও প্রায় একই সুরে বলেছিলেন “সাম্যবাদ অর্জন করতে হলে ..... প্রধান কাজ হলো আগামী দিনের মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা”।


সোভিয়েত অর্থনীতিবিদ কামারভ ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালের শিক্ষা সম্পর্কিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, “এ সময়ে শ্রমশক্তি বৃদ্ধির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের জাতীয় আয় ২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দরুন জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৭%। বৃদ্ধি প্রাপ্ত ৭৭% উৎপাদনশীলতার মধ্যে ৩৮% বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতার স্তর বৃদ্ধির ফলে এবং ৩৯% বৃদ্ধি পেয়েছে শ্রমিকদের মাঝে উন্নত যন্ত্রপাতি সরবরাহের ফলে। ভারতের এম, এম আনসারী ১৭টি রাজ্যের ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তাঁর ঊফঁপধঃরড়হধষ বীঢ়বহফরঃঁৎব ধহফ বপড়হড়সরপ মৎড়ঃিয নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, “নিরক্ষর ও দরিদ্রতা একই দিকে ধাবিত হয় এবং একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে।


কারণ যেসব এলাকায় অধিক সংখ্যক নিরক্ষর রয়েছে, সেখানে দরিদ্রতার নিবিড়তা বেশি”। কাজেই সমৃদ্ধ জাতি গঠন,  দরিদ্রতা দ‚রীকরণ ও আয় বিতরণে শিক্ষার অবদান অনস্বীকার্য। বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে ড. কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশনকে জাতীয় শিক্ষাদর্শনের রূপরেখার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, বৃটিশ উপনিবেশিক শিক্ষাদর্শন অনুযায়ী শিক্ষার জন্য শিক্ষা নয় বা কেরানি সৃষ্টি বা আজ্ঞাবহ সৃষ্টির জন্য নয়। আমি চাই আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান শিক্ষাব্যবস্থা। অনুরূপভাবে ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-“... শুধু বিএ, এমএ পাস করে লাভ নাই। আমি চাই কৃষি কলেজ, কৃষি স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও স্কুলে যাতে সত্যিকার মানুষ পয়দা হয়। বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবা।” সঙ্গত কারণেই তিনি জীবনদর্শন ও জীবনচাহিদার আলোকে স্বাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তিনি প্রথম শিক্ষা কমিশনকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন-দেশবাসী চায় শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে নতুনভাবে বিন্যাস করা হোক। আমিও তাই আশা করি। এদিকে নজর রেখে শিক্ষা কমিশন বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবানুগ সুপারিশ  ত্বরান্বিত করবে।


বৃটিশ উপনিবেশিক শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী শিক্ষার জন্য শিক্ষা নয় বা কেরানি সৃষ্টি বা আজ্ঞাবহ সৃষ্টির জন্য নয়; আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা। তবে, বঙ্গবন্ধু’র নির্মম হত্যাকান্ডের পর জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে বিন্যাসিত করা হয়নি। বরং শিক্ষার জন্য শিক্ষা রূপান্তর হওয়ায় শিক্ষা মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি বিকাশে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারেনি। শিক্ষিত জনগোষ্ঠিত শিক্ষার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতার কৌশলসমূহ রপ্ত করতে পারেনি।


বর্তমান সরকার শিক্ষাকে শুধুমাত্র সনদনির্ভর নয়, প্রতিযোগি বাজারের উপযোগী করার বিষয়ে অধিকতর মনোযোগ দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্ঞান ও শ্রম প্রতিযোগিতার উপযোগী বিবেচনায় সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূল ¯্রােতধারায় নিয়ে আসার জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক। মানব সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সৃজনশীলতা বা উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশেও সমভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, নিজস্ব ব্র্যান্ড ব্যতিত শুধুমাত্র আমদানি নির্ভর প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদশীলতার ভিত্তি গড়া যায় না। মনে রাখতে হবে-শ্রম শক্তির উৎপাদনশীলতা স্থির কিছু নহে। এটিকে প্রযুক্তি, মানুষের মেধা এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এতে যেমন ব্যক্তি উপকৃত হয় একইভাবে সমাজ এবং দেশও উপকৃত হয়। পরিকল্পিত শিক্ষাই নীতি নির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদদের জ্ঞানের দৈন্য কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে। ফলে শাসন ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি ও শিল্পের ভারসাম্য উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করা যায়।


কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মানুষের অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষিতে সনাতনী পদ্ধতি আঁকড়ে থাকলে কৃষিখাতের উন্নয়নের প্রত্যাশা করা হবে সুদূরপরাহত। শিল্প মালিকদের মাঝে উদ্যোগ এবং প্রেরণার অভাব হলে, শ্রমিকদের মাঝে সততা এবং পরিশ্রমী মনোভাবের অভাব দেখা দেবে। এর ফলে ব্যয়বহুল শিল্প কারখানা স্থাপন করেও দেশের কোন উন্নতি হবে না। জনসাধারণের মাঝে উন্নয়নের প্রতি অনুরাগ ও পুরনো অভ্যাসের পরিবর্তে উন্নয়নের পোষক নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষা অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। এ শিক্ষাকে অবশ্যই হতে হবে পরিকল্পিত, যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানমনস্ক। যার মূল চালিকা শক্তি হবে মানবিক দর্শন ও অগাধ দেশপ্রেম। 


একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালি, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। সম্প্রীতির মেলবন্ধনে এই যুদ্ধে কেউ প্রশ্ন করেনি আপনি কোন ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষ কিংবা আপনার শ্রেণী পেশার পরিচয় কি? এটাই ছিল একটি পরাক্রমশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মূল শক্তি।


যেখানে বাঙালির চিরন্তন সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষা দর্শন কাজ করেছে। আধুনিক জ্ঞান নির্ভর বাঙালির চিরায়িত জীবনদর্শনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যয়ে সম্প্রীতি ও আধুনিক শিক্ষা হতে হবে আমাদের জাতীয় জীবন চালিকার মূল দর্শন। জাতীয় চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও বিশ্বাস, শিক্ষা দর্শন কোনভাবে বাণিজ্যিক বা ব্যক্তি সিঁড়ি ডিঙ্গানোর উপকরণ হবে না। এই দর্শন আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়িয়ে দেবে। জাগৃত করবে অগাধ দেশপ্রেম। যেখানে থাকবে না আত্মকেন্দ্রিকতা, শঠতা, দুর্ভিসন্ধি। শোষণ ও অধিকার হরণের ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গি।  এ ধরনের শিক্ষা ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির ব্যত্যয় হলে চলমান উন্নয়ন শুধুমাত্র আত্মতুষ্টি যোগাবে; মুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারবে না। তাই, আনুষ্ঠানিকতার লাগাম টেনে সত্যিকার মানবিক দর্শন ও দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণায় সম্প্রীতির হাত বাড়িয়ে দেয়ার পথে জাতীয় মননকে ধাবিত করতে হবে। 


মোঃ শামসুর রহমান 


লেখক : সাধারণ সম্পাদক, আইডিইবি ও চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, এনপিআই ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ।


আমার বার্তা/গাজী আক্তার

আরো পড়ুন