শিরোনাম :

  • ডি মারিয়া উড়িয়ে দিলেন রিয়ালকে তিন সপ্তাহ পরিকল্পনা, অতঃপর অভিযানের গ্রিন সিগন্যাল কোহলির ব্যাটে সহজ জয় ভারতের বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান দুদুর বাড়িতে হামলা জাবি উপাচার্যকে পদত্যাগের জন্য আল্টেমেটাম
অন্যায়ভাবে হত্যায় কোনো বীরত্ব নেই
মাসউদুল কাদির,বিশেষ প্রতিনিধি :
৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৩০:১৯
প্রিন্টঅ-অ+


ইসলাম অন্যায় ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে না। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার মধ্যে কোনো বীরত্বও থাকবার কথা নয়। নবীজীর শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি। যে কারণে মানুষ মারা গেলে, পুড়লে, ডুবে মরলে উল্লসিত হই। মানবতাবোধটাও মরে গেছে। আমরা বিস্মিত হয়ে দেখলাম, শ্রীলঙ্কায় ছয়টি স্থানে লুকিয়ে নির্মমভাবে যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে তা মেনে নেওয়া যায় না। এটা শ্রীলঙ্কার মুসলমানদেরকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রতিটি অসৎ কর্মকে সবশেষে ইসলামী পোশাকিপনায় চাদর মুড়িয়ে দেয়া হয়। এর আগে কিছু ভুঁইফোড় ওয়েবসাইটেও দায় স্বীকারে আমরা দেখেছি তৎপর ভূমিকা। এসব কারা চালায়, কীভাবে দায়িত্ব নেওয়া হয় এ নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানী কোনো কাজও নেই। থাকলেও তা হালে পানি পায় না মিডিয়া সহযোগিতার অভাবে।

বিশ্বজুড়ে কিছু হলেই একদিকে দায় চাপে। চাপানো হয়। কেউ কেউ দায় নিতেও তৎপর থাকে। এসবে নিশ্চয় কারও না কারও লাভক্ষতির হিসাব থাকে। কথা একটাই, এমন হত্যাকাণ্ড আমরা চাই না। এই হত্যাকাণ্ডের জের অনেক কঠিন। শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের অনেকটা লড়াই করেই বাস করতে হয়। বড় বড় দাঙ্গা সামলে মুসলমানগণ এখন একত্র। দলমত নির্বিশেষে তারা এক জমিয়তে উলামা সিলনের নেতৃত্ব মানে। এতে তারা জাকাত পর্যন্ত একসঙ্গে দেয়। ফলে অভাবীরাই সে জাকাত পায়। এ হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুসলমানগণ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভারতের সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানীসহ বিশ্বের ধর্মীয় নেতারা শোকবার্তা দিয়েছেন।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আলেমদের সবার আগে সোচ্চার হওয়া জরুরি। কারণ, পবিত্র কুরআনে এই বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে। সবার আগে মানুষের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মানুষের অস্বস্তি কমে না। আজকাল আমরা জাতিসংঘ সনদের কথা বলি। সেখানেও এত নিরাপত্তার কথা বলা হয়নি। ইসলাম যেভাবে নিরাপত্তা দিয়েছে, অন্য কোন ধর্মেও এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল (সূরা মায়েদাহ : আয়াত ৩২)।

এ কারণেই মূলত যারা যেখানে সেখানে মানুষ হত্যায় আনন্দ পায়, তাদের পরিচয় একটাই, সন্ত্রাসী। তাদের পোশাকিপনা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পৃথিবীর বিখ্যাত আলেমদের বক্ত্যও তেমনই।

কিছু ঘটলেই যেভাবে মুসলমানদের উপর দায় চাপে সে বিষয়ে বিশেষত আলেমদের নতুন করে ভাবা উচিত। আন্তর্জাতিক, আলমি ফিকির কী হওয়া চাই। এটা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

শ্রীলঙ্কায় সিংহলি সম্প্রদায় এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। উত্তর-পূর্ব দিকের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তামিল সম্প্রদায় দেশের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মূর, বার্ঘের, কাফির, মালয় উল্লেখযোগ্য। কিছু কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা বাদ দিলে শ্রীলঙ্কায় ধর্মে ধর্মে সংঘাত কমে গেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মুসলমানগণ বসবাস করছেন। কিন্তু এধরনের অতি উৎসাহিদের আঘাতে মানবতা জর্জরিত হয় তখনই সমস্যা প্রকট হয়।

একটা কথা শেয়ার করতে চাই। আমরা যারা বাংলাদেশী, কেবলই কি বাংলাদেশী? আরও একটা বড় পরিচয় হলো আমরা মুসলমান। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি সীমানা বাংলাদেশী বাঙালিদের থাকলেও মুসলমানদের সীমানাটা এটুকু নয়। আরও বৃহত্তর। এটা হিন্দু রাষ্ট্রই হোক, হোক না বৌদ্ধ রাষ্ট্র, হোক না খ্রিষ্টান রাষ্ট্র তবু সেই সীমানা আমারই। কারণ সেখানে মুসলিম রক্ত রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। লা ইলাহা ইল্লাহর এই যাত্রী যেখানেই আছেন সেখানেই আমাদের ভালোবাসা বিরাজমান। ধরুন, শ্রীলঙ্কার জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থী যদি মুসলিম হন, তার পক্ষে কথা বলার দায়িত্ব ফিজিতে বসবাসকারী মুসলিমের উপরও বর্তায়। এই সত্যটা হাদিসেও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করেছেন। কুরআনেও আল্লাহ তাআলা বলেন, মোমিনরা পরষ্পরে ভাই। সূরা হুজুরাত : আয়াত ১০

আর আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ললাম বলেন, মুসলমান কারু খেয়ানত করবে না। কেউ কারও সঙ্গে মিথ্যা বলবে না। এবং কেউ কারও সহযোগিতা থেকে দূরে থাকবে না। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদা অন্য মুসলমানের জন্য হারাম। খোদাভীতির সম্পর্ক অন্তরের সঙ্গে। কোনো মুসলমান ভাইকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা পাপ ও অন্যায় বলে পরিগণিত হওয়া যথেষ্ট। (তিরমিজি : ১৯২৭)।

অন্য এক হাদিসে নবীজী বলেছেন,মোমিন-মুসলমান একটি দেহের মতো। যদি দেহের কোন অংশ অসুস্থ হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তা অনুভব করে। সেটা জাগ্রত অবস্থায় হোক কিংবা জ্বরের অবস্থায়।’ (মুসলিম : ২৫৮৬)।

কুরআন ও হাদিসে ভ্রাতৃত্ববোধের বিষয়ে আরও বিশদ আলোচনা এসেছে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে কতটুকু নাড়া দেয়। তা কি কখনো ভাবি? আমার কাছে মনে হয়, বিশ্বের দেশে দেশে যেসব মুসলিম দল আছে, সে দলগুলো এ নিয়ে একদমই ভাবে না। বাংলাদেশেতো আরও বেশি। কেবল ইসলামিক টপিক হলেই ত্যাজদীপ্ত হয় দলগুলো। তেলগ্যাসে তাদের আন্দোলন জমে না। আর বাইরের দেশে কিছু ঘটলে তাদের অবস্থার প্রতি খেয়াল করে কোনো আন্দোলন করে না। বরং নিজেদের দল কীভাবে চাঙ্গা হবে সেটা সবার আগে ঠাওর করে। সত্যিকার মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করার বিষয়টি ইসলামবিষয়ক গবেষকদেরই ভাবতে হবে সবার আগে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার। তিপ্পান্না দেশেই কেবল মুসলমান নয়। অন্যান্য দেশেও মুসলমান আছে। সেটা হিসাব করলে মুসলিম দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হবে। মুসলিম দেশের ইসলামি দল বা ধর্মীয় ব্যক্তিদের এ বিষয়টি আমলে নিয়ে অগ্রসর হলে বিশ্বের সব মুসলমানদের অধিকতর উপকার হবে বলে আমি মনে করি।

লেখক : সভাপতি, শীলন বাংলাদেশ



আমার বার্তা/ ৩০ এপ্রিল ২০১৯ /রিফাত


আরো পড়ুন