শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
মুফতী জাবের কাসেমী
উজ্জ্বল নক্ষত্র নূর হোসাইন কাসেমী রহ.
১৩ জানুয়ারি, ২০২২ ২১:২১:৪২
প্রিন্টঅ-অ+

একবিংশ শতাব্দীর একজন মুসলিম সাধক, যিনি একজন সফল মুসলিম লিডার, তিনি যেই ময়দানে অগ্রসর হয়েছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা তার পদচুম্বন করেছে। তিনি প্রতিটি আন্দোলনে আপোসহীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাতিল যখনই মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে, তিনি তখন গর্জে উঠেছেন। মুসলিম উম্মাহের এক দরদি রাহবার ও আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ.।


১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারি মোতাবেক শুক্রবার বাদ জুমা কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ থানার চড্ডা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মাওলানা আবদুল ওয়াদূদ।


নূর হোসাইন কাসেমী রহ. বাবা মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সাথে তাকেও প্রথমে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত তিনি নিজ গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেন। তারপর ভর্তি হন পার্শ্ববর্তী গ্রামের কাশিপুর মাদ্রাসায়। তারপর বরুড়ার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া দারূল উলূমে ভর্তি হন। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা সমাপ্ত করেন।


বাবার ইচ্ছায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপিঠ দারুল উলূম দেওবন্দে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু ভর্তির নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারায় সাহারানপুর জেলার বেরিতাজপুর মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে জালালাইন জামাত পড়েন। তারপর ভর্তি হন দারুল উলূম দেওবন্দে। দারুল উলূমে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নিজের মেধা ও প্রতিভায় আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে অন্যান্য ছাত্রদের মধ্য থেকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন তিনি।  


তার প্রসিদ্ধ কয়েকজন উস্তাদ হলেন, মাওলানা ফখরূদ্দীন আহমদ মুরাদাবাদী রহ. কারী তাইয়্যেব রহ. ওয়াহিদুজ্জামান কিরানাভী রহ. শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ. মাওলানা মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ., মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী, মাওলানা শরীফুল হাসান রহ. মাওলানা নাসির খান রহ. মাওলানা আনযার শাহ রহ.সহ আরো বিশ্ববরেণ্য উলামায়ে কেরাম।


মুরাদিয়া মাদরাসায় তিনি প্রথমে তার উস্তাদ মাওলানা আব্দুল আহাদ রহ.-এর পরামর্শে আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ.-এর প্রতিষ্ঠিত ভারতের মুযাফফার নগরে মুরাদিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে একবছর শিক্ষকতা করেন।


১৯৭৩ সালের শেষের দিকে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে সর্বপ্রথম শরীয়তপুর জেলার মুহিউস সুন্নাহ মাদরাসায় শাইখুল হাদিস ও মুহতামিম পদে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালে জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদরাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করেন। তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসায় দীর্ঘদিন যাবত দারূল ইকামার দায়িত্ব পালন করেন।


১৯৮২ সালে চলে আসেন জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ মাদ্রাসায় সদরুল মুদারসির পদে যোগদান করেন। এখানে তিরমিজি শরিফের দরস দেন। মালিবাগে ৬ বছর শিক্ষকতার করেন।


এরপর তিনি ১৯৮৮ সালে রাজধানীর অন্যতম বিখ্যাত জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এবং ১৯৯৮ সালে তুরাগ থানায় জামিয়া সুবহানিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত তিনি এই দুই প্রতিষ্ঠানে প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।


এছাড়াও তিনি রাজধানীর চৌধুরীপাড়া মাদরাসা, শামসুল উলূম কাওলা, টিকরপুর জামেয়া, জামেয়া ইসহাকিয়া মানিক নগর’সহ দেশের কয়েকটি মাদরাসার শায়খুল হাদিস ও মুরুব্বি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


এর বইরে তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর বেফাকের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সর্বশেষ বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং হাইয়্যাতুল উলইয়ার কো-চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। ১৯৭৩ সালে শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ.-এর কাছে প্রথমে বাইয়াত হন। তার ইন্তেকালের পর মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.-এর কাছে বাইয়াত হন।


১৯৯৫ সালে মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. বাংলাদেশে আসলে সেসময় তাঁর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন। বর্তমানে তিনি খানকায়ে মাহমুদিয়ার আমির।


১৯৭৫ সালে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশে যোগদান করেন। তারপর ১৯৯০ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেন। ২০১৫ সালের ৭ নভেম্বর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে মহাসচিবের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এছাড়াও তিনি ঈমান-আক্বিদাভিত্তিক বৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাকালীন সময় থেকেই কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীরের দায়িত্বে ছিলেন। এর ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা আন্দোলনের সময় সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত হলে ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আসেন।


আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সব সময় ন্যায়, ইনসাফ ও সহনশীল সমাজ ব্যবস্থা গড়ার পাশাপাশি স্বাধীন-সার্বভৌম ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি ঈমান-আক্বিদার বিরূদ্ধে যে কোন অপতৎপরতার বিরূদ্ধে সোচ্চার থাকতেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবাধিকার ও পরিবেশ রক্ষায় আগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রায় প্রতিটি বক্তব্যেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের জান, মাল, ইজ্জত-আব্রুর সুরক্ষার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করতেন। এছাড়াও তিনি বিহির্বিশ্বের যে কোন নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকারের পক্ষে ভূমিকা পালন করতেন।


এই মহান বুযূর্গ আলেম শায়খুল হাদীস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. ১৩ ডিসেম্বর রোববার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে মহান মাহবুবে আ’লার ডাকে সাড়া দিয়ে পরকালের পথে যাত্রা করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ইন্তিকালের সাময় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি স্ত্রী, ২ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তান রেখে যান। বাইতুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে হযরতের ছোট ছেলে মুফতি জাবের কাসেমী ইমামতিতে জানাযা সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে হযরত এর প্রতিষ্ঠিত জামিয়া সুবহানিয়া ধউর তুরাগ থানার সন্নিকটে আন নূর মসজিদের পাশে দাফন করা হয়।

আরো পড়ুন