শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন
কুরআনের আলোয় সুশোভিত জীবন
২১ এপ্রিল, ২০২২ ২০:১২:০৯
প্রিন্টঅ-অ+

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পঠিত ও সমাদৃত গ্রন্থ হল কুরআনুল কারীম। এ যে মহান সৃষ্টিকর্তার কালাম। যেখানে রয়েছে সমগ্রমানবজাতির জন্য সঠিক পথের দিশা। এই মহা পবিত্র গ্রন্থটি বিশ্ববাসীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। মনুষ্যজীবনে কীভাবে সাফল্য অর্জিত হবে, কোন পথে পা বাড়ালে সুখের সন্ধান পাবে, কোন পদ্ধতিতে কিংবা কোন দিক-নির্দেশনায় মানুষের প্রকৃত মনুষ্যবোধ উন্মোচিত হবে, এর সকল কিছুর মৌলিক উপাদানগুলোই বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে এই গ্রন্থে। পূর্বাপর নাযিলকৃত সকল কিতাবের বিধানকে রহিত করে দিয়ে পূর্ণ সংবিধান এবং পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তাঁর উম্মতকে উদ্দেশ্য করে, আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা এই দুটিকে আঁকড়ে ধরো তাহলে কোন দিনই তোমরা পথ হারাবে না। ১. কুরআনুল কারীম। ২. সুন্নাতে রাসূল।


কুরআনের সংস্পর্শে যেই এসেছে, সেই শ্রেষ্ঠত্বের অভিধায় ভূষিত হয়েছে। কুরআন নাজিল হয়েছে জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর, তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বভার অর্পিত হয়েছে ফেরেশতাকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা জিবরীল আমীনের উপর। এর অধিকারী তথা আহাল বানানো হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতকে, সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কারের ঘোষণা হয়েছে এর ধারক-বাহকদের জন্য এবং নাযিলও হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ মাসটিতে। শ্রেষ্ঠত্বের বিপুলতা ও বিশালতার মর্যাদায় এর সমতুল্য আর কি হতে পারে! এর সকল প্রাপ্তি আমাদের! অশেষ সৌভাগ্যের অধিকারী এই উম্মত! এজন্যই এই উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ প্রাপ্তির কথা স্মরণ হলেই অস্ফুটে মুখে উচ্চারিত হয় ‘আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু ওয়া-লাকাশ শুকরু’। এই অতুলনীয় প্রাপ্তির শোকর ও কদর করা উচিত আমাদের সকলের। 


নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত কুরআন তেলাওয়াত। এটা সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর বাণী। আর এখন চলছে সর্বশ্রেষ্ঠ মাস 'মাহে-রমজান'। সকল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মিলন ঘটিয়ে প্রত্যেকের জন্য নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কাতারে পৌঁছে দেওয়ার দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত। সওয়াব, পুণ্য, খোদার সন্তুষ্টি ও রমজানের হক আদায়ের ক্ষেত্রে অধিক কুরআন তেলাওয়াতের বিকল্প নেই। 


হাদিসে পাকে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রমজান মাসের প্রতি রাতে জিবরীল (আঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হতেন এবং উভয়েই পবিত্র কুরআন একে অপরকে তিলাওয়াত করে শোনাতেন। 


খোদার পক্ষ থেকে ঘোষণা হয়েছে, এমাসে বান্দার প্রত্যেক ইবাদত কিংবা সৎকর্মকে সত্তর গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রমজানে একটি নফলের সওয়াব অন্য মাসে একটি ফরযের সমতুল্য, আর একটি ফরজের সওয়াব অন্য মাসে সত্তরটি ফরযের সমতুল্য’।(সহীহ্ ইবনে খুযাইমা-১৮৮৭, শুয়াবুল ইমান-৩৩৩৬)


রমজান মাসেও কুরআন পাঠের গুরুত্ব ও সওয়াব অন্য মাসের চেয়ে অত্যাধিক। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি হরফ তিলাওয়াত করবে, তার বিনিময়ে সে একটি নেকি লাভ করবে, আর একটি নেকির বিনিময় হবে দশগুণ। এ কথা বলছি না, ‘আলিফ-লাম-মীম’ একটি হরফ বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ, ‘মিম’ একটি হরফ’। এ যদি হয় অন্যমাসের হিসাব, তাহলে এমাসে সওয়াবের পরিমাণ কেমন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। 


আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যারা বিভিন্ন কারণে, অবহেলায় কিংবা সঠিক জ্ঞান না থাকার দরুন, শৈশব-কৈশোরে কুরআন তেলাওয়াতের পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেননি, কিংবা কুরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী নয়, তবে তারা অনেক কষ্ট করে, ধৈর্য্য নিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে কুরআনকে পড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তাদের জন্যও রাসূলে কারীম (সাঃ) সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। হযরত আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন কুরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী ব্যক্তিরা সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে, আর যারা ঠেকে ঠেকে কষ্ট করে কুরআন তিলাওয়াত করে তারা দ্বিগুণ সওয়াব লাভ করবে। (হাদীস, সহিহ মুসলিম-১৮৯৮) 


অতিবাহিত হচ্ছে কুরআন নাজিলের মাস, এমাসে তো বটেই, বাকি মাসগুলোতেও কুরআনকে আমাদের একান্ত সঙ্গী বানাতে হবে। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, কুরআন তিলাওয়াতকারীরা আল্লাহ তাআলার পরিজন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কিছু লোক আল্লাহর পরিজন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তারা কারা? তিনি বললেন, কুরআন তিলাওয়াতকারীগণ আল্লাহর পরিজন এবং তার বিশেষ বান্দা। 


তাই দেখা যায়, সালাফে সালেহীনের মধ্য থেকে কেউ কেউ তিনদিনে একবার, কেউ কেউ সাতদিনে একবার, কেউ দশদিনে একবার কুরআন খতম করতেন। কেউ কেউ প্রতিদিন দু'বার খতম করতেন। ইমামে আযম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা রমজান মাসে প্রতিদিন দুবার কুরআন খতম করতেন। অনেক  সালাফে সালেহীনের ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তাঁরা মাহে রমজানে নফল ইবাদত ছেড়ে শুধু তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন। যেমন ইমাম মালেক (রহ.)-এর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি মাহে রমজানে হাদীসের দরস বন্ধ করে দিতেন এবং পুরো সময় কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করতেন। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি যাবতীয় নফল বাদ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াতে লেগে যেতেন। 


রাসূলের মাধ্যমে আমরা এটাও জানতে পারি যে, যারা কুরআনের আহল হবে, অর্থাৎ তাঁর ধারক-বাহক হবে, কুরআন  তাকে কবরের কঠিন সংকট থেকে শুরু করে জান্নাতে পৌঁছানো পর্যন্ত যত বাধা-বিপত্তি ও জটিলঘাঁটিসমূহ থাকবে, সবগুলোতেই কুরআন তার সহযোগী হবে। রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেন, সব সময় কুরআন তিলাওয়াত করো, কারণ এটা দুনিয়াতে তোমার জন্য আলো স্বরূপ এবং আখেরাতে সঞ্চিত ধনস্বরূপ।(ইবনে হিব্বান)। অন্য হাদীসে বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা কুরআন তেলাওয়াত করো। কারণ এই কোরআন কিয়ামতের দিন তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আবির্ভূত হবে। (মুসলিম শরীফ [৮০৪]) সুতরাং দুনিয়া ও আখেরাতের সকল সফলতার জন্য আমাদের কুরআন পড়তে হবে সবসময়, সবজায়গায়।


yasinnizamiyamin123@gmail.com


 

আরো পড়ুন