শিরোনাম :

  • আইসিইউ যাচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়েও ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার ১৬ জন এখনো কোথায়? রোনালদোর সতীর্থকে বার্সেলোনায় চান মেসি র‍্যাব-পুলিশ সদরের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তাকে বদলি রাজীবের মৃত্যু : তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ২৬ সেপ্টেম্বর
বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ঝুঁকিতে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ
হু হু করে বাড়ছে পানি
বন্যায় ভাঙনের তীব্র আতঙ্কে দক্ষিণাঞ্চলের ১৫টি নদী পাড়ের মানুষ
আমার বার্তা রিপোর্ট :
২০ জুলাই, ২০১৯ ১০:০৫:০৯
প্রিন্টঅ-অ+


কয়েক দিনের ব্যাপক বৃষ্টিতে বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ৪০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও রোগের ঝুঁকিতে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানির বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহের কারণে গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়কের প্রায় শতাধিক স্থানে পানি উন্নয়নের বোর্ডের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে বন্যার পানি প্রবল বেগে গোবিন্দগঞ্জের উত্তর-পূর্বে কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে হু হু করে বন্যার পানি করতোয়া নদীতে প্রবেশ করায় গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড সহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামি ২৪ ঘন্টায় গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের কাইয়াগঞ্জ নামক স্থানে সড়ক ডুবে গিয়ে যান চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গাইবান্ধার যমুনা,ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদের পানি অতিতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। পাউবো সূত্রে জানা যায়, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গতকাল শুক্রবার কিছু টা কমেছে কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪৪ সে.মি.ঘাঘট নদের ব্রীজ পয়েন্টে ৯২ সে.মি.উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ প্রায় শতাধিক স্থানে ভেঙ্গে গিয়ে বাধেঁর পশ্চিম পার্শ্বে ঢাকা-লালমনির হাট রেললাইনের বাদিয়াখালী-ত্রিমহনী এলাকায় রেললাইন তলিয়ে যাওয়ায় রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে।এছড়া বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়কের ছোট-বড় ব্রীজ দিয়ে পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করছে। এদিকে বাদিয়াখালী-উল্লাহবাজার (ভরতখালী) সড়কের বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থানে ভেঙ্গে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পানি এসে সাঘাটার গটিয়া,উল্লাবাজার,ভরতখালী হাট,পদুমশহর ,কালপানী, ধনারুয়া বোনারপাড়া,কলেজ মোড় ও গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়ে বন্যার পানি এসে গত বৃহস্পতিবার ১৮জুলাই রাতে গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া-বাঙ্গালী নদীতে প্রবেশ করায় গতকাল শুক্রবার নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে উপজেলার পৌর শহর, নাকাইহাট, হরিরামপুর, শিবপুর, কোচাশহর, মহিমাগঞ্জ, শালমারা, তালুককানুপুর, দরবস্ত, সাপমারা, গুমানীগঞ্জ ও ফুলবাড়ী ইউনিয়ন এর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সেই সাথে অর্ধশতাধিক স্থানে নদী ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার লোকজন জানিয়েছেন,নদী ভাঙ্গনে বেশ কিছু বসতবাড়ী সহ শতশত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। এ ছাড়া বন্যায় প্লাবিত এলাকায় আমন বীজতলা,রবি ফসল সহ পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বানের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বন্যা আরো অবনিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ দিকে গত বৃহস্পতিবার উপজেলার হরিরামপুর ইউপি’র কিশমত দূর্গাপুর গ্রামের মৃত্যু কছির বকসের পুত্র ছলেমান (৬২) মাছ মারতে গিয়ে প্রবল স্রোতে পরে নিখোঁজ হয়। পরে ফায়ারসার্ভিস ও ডুবরী দল ৪ ঘন্টা চেষ্টা করে বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেছে। অপর দিকে গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টায় মহিমাগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে মুন্নি (৯) নামের শিশু মারা গেছে। নিহত শিশু চিনিকল শ্রমিক কলোনীর মনু মিয়ার কন্যা। এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণন বর্মণ ও প্রকল্প কর্মকর্তা জরিুল ইসলাম হরিরামপুর ইউপি’র সার্বিক বন্যায় পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং তাৎক্ষনিক বানভাসি মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও আর্থিক সাহয্য প্রদান করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বন্যা ও ভূমিধসের কারণে সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকলাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় আটকে পড়েছে। ৬৬ হাজারের বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। খাদ্য ও পরিষ্কার পানির সংকটের সঙ্গে পানিবাহিত রোগ বাড়ার খবরও পাওয়া গেছে। আইএফআরসির বাংলাদেশ প্রধান আজমত উল্লাহ বলেন, এসব মানুষ মওসুমি বৃষ্টি, বন্যার প্রকোপ ও ভ‚মিধসের মধ্যে নাকাল হচ্ছে। বৃষ্টি কমলেও উজান থেকে নদীগুলোর উপচেপড়া প্রবাহে সামনের দিনগুলোতে বন্যার অবনতি ঘটাবে। বিস্তৃর্ণ কৃষি অঞ্চলে বন্যায় খাদ্য শস্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাতে খাদ্য সংকটের হুমকিও তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিশু, প্রসূতি মা, গর্ভবতী মা ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে শংকা প্রকাশ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। আইএফআরসি বলছে, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের ৬৭৫ জন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে। তারা খাবার, সুপেয় পানি, পরিচ্ছনতা সরঞ্জাম এবং বন্যায় বা ভূমিধসে বাড়িঘর হারানো মানুষদের মধ্যে তাঁবু বিতরণ করছে। বন্যাদুর্গতদের এর মধ্যেই আইএফআরসি ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৩৯ সুইস ফ্রাঁ (প্রায় ৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা) ছাড় করেছে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের পোড়ার দোকান এলাকায় কজওয়ের (ডাইভারশন) ওপর দিয়ে প্রবলবেগে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই এই মহাসড়কে শেরপুর থেকে জামালপুর হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে ২ মিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুইঁ ছুঁই করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরাতন ভাঙণ অংশ দিয়ে বন্যার পানি দ্রæতবেগে প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের কজওয়েতে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও ছোট ছোট যানবাহন নৌকাযোগে পারাপার হচ্ছে। আবার রাস্তার মধ্যে পানির ব্যাপক স্রোত থাকায় কেউ কেউ মাছ ধরছে। শেরপুর সদর উপজেলার নন্দির জোত এলাকার বাসিন্দা আবদুল হক, আবুল হোসেন ও হাসমত আলী বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার পর থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। এতে এ মহাসড়ক দিয়ে সব ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তারা আরও বলেন, সরকার যদি এই ডাইভারশনে ব্রিজ নির্মাণ করে তাহলে হয়তো এত ভোগান্তি থাকবে না। তারা দ্রæত এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানান। একই এলাকার বাসিন্দা আবদুল বারি মিয়া, কৃষক ফারুক মিয়া ও পোড়ার দোকান এলাকার নির্মাণ শ্রমিক মোস্তফা মিয়া বলেন, বুধবার সন্ধ্যায়ও আমাদের এলাকায় পানি ছিল না। হঠাৎ করেই রাত ৮টার দিকে বন্যার পানি এলাকায় ঢুকে পড়ে। বন্যার পানিতে তাদের বীজতলা, সবজী ও পাটের আবাদ তলিয়ে গেছে, বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকেছে। জেলা ত্রাণ অফিস স‚ত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় শেরপুরের ৫ টি উপজেলার ৩৫ টি ইউনিয়নের ১৭২ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৬৩ হাজার লোক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলায় ৫২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় ৭ দিন ধরে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। জেলা কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ স‚ত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার ১২৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত এবং ৭৪৭ হেক্টর রোপা আমন ধানের বীজতলা এবং ১৬৫ হেক্টর জমির আউস ধানের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। বন্যায় জেলার বিভিন্ন পুকুর, জলাশয় এবং খামারের মাছ ভেসে এবং পাড় ভেঙে প্রায় ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারা বেগম। এদিকে গত ৫ দিনে শেরপুরে বন্যার পানিতে ডুবে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যা দুর্গতদের মাঝে ৩৫ মে.টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের রাক্ষুসী মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর, জয়ন্তী, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, পয়সারহাট, পালরদী, নয়াভাঙ্গনী, মাছকাটা, লতা, আইরখালী, পায়রা নদীতীরের বাসিন্দাদের নদীভাঙন নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়। কখন যেন বসতভিটাসহ অসংখ্য সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান চলে যায় নদীগর্ভে। চলতি বর্ষা মৌসুমে ইতোমধ্যে বানের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও সেই একই আতঙ্কে রাত জেগে কাটাতে হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের ভয়ঙ্কর ১৫টি নদীপাড়ের বাসিন্দাদের। এসব নদীপাড়ের মানুষের স্থায়ী দুঃখই হচ্ছে নদীভাঙন। বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদী। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এ উপজেলায় নদী ভাঙনের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবারেও তার ভিন্নতা হয়নি। এরইমধ্যে নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হতে শুরু করেছে। নদীতীরের বাসিন্দাদের প্রতিনিয়তই ভাঙন আতঙ্কে নিন্দ্রাবিহীন রাত কাটাতে হচ্ছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে এরইমধ্যে বাবুগঞ্জের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে সৈয়দ মোশারফ-রশিদা একাডেমি, আবুল কালাম কলেজ সংযোগ সড়কসহ বেশ কিছু স্থাপনা, বসতবাড়ি, আবাদি জমি, দোকান ঘরসহ কয়েক একর ফসলি জমি ও ফলদ বৃক্ষ। এ ছাড়া ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু, মহিষাদী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, আবুল কালাম ডিগ্রি কলেজ, জামেনা খাতুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পূর্ব ক্ষুদ্রকাঠী গ্রাম, চরসাধুকাঠী মাদ্রাসা, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘর, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজার, মীররগঞ্জ ফেরিঘাট ও বাজারসহ অসংখ্য সরকারী-বেসরকারি স্থাপনা। সবশেষ গত ১৭ জুলাই ভোরে শুরু হওয়া রাক্ষুসী সুগন্ধা নদীর ভাঙনে উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভুতেরদিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আবদুল খালেক, মো. মিজানুর রহমান, সেলিম ফকির, সেকান্দার মুন্সী ও আলমগীর ফকিরের বসত ঘরসহ বেশ কিছু স্থাপনা, দোকান ঘর ও ফলদ বৃক্ষ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের তীব্রতা এতোই বেশি বর্তমানে ওই গ্রামের বৃহত একটি অংশ নদী ভাঙণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া ভাঙনের হুমকিতে পরেছে ওই এলাকার দক্ষিন ভুতেরদিয়া তাবলিকুল ইফতেদায়ী মাদ্রাসা, একটি মসজিদ, আমীর হোসের ফকির ও সেকান্দার মুন্সীর বসতবাড়িটি। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণের সাথে সৃষ্ট জোয়ারে নদীর স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এ ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, হঠাৎ ভোর রাতে ভাঙন শুরু হলে তারা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। মুহুর্তের মধ্যেই তাদের চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যায় পাঁচটি বসতঘর। এরপর থেকে আশপাশের সবাই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরে আলম বেপারী বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই বাবুগঞ্জের সন্ধ্যা এবং সুগন্ধা নদীতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হঠাৎ করেই সুগন্ধ্যা নদীর দক্ষিণ ভুতেরদিয়া পয়েন্টের ভাঙন তীব্র হয়েছে। এতে মুহুর্তের মধ্যে গত ১৭ জুলাই ভোরে পাঁচটি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় মালামালের ক্ষতি হলেও কেউ হতাহত হয়নি। স্থানীয়দের মতে, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণের সাথে অমাবস্যায় সৃষ্ট জোয়ার এবং উত্তরবঙ্গ থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে নদীতে ভাটার সময় স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। এ থেকেই দেখা দেয় যতো বিপত্তি। অপরদিকে অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে চলতি মৌসুমের প্রথমদিকে বাবুগঞ্জ উপজেলায় কয়েকটি বসতঘরসহ আবাদি জমি গ্রাস করে নিয়েছে রাক্ষুসে সুগন্ধা নদী। স্থানীয়দের দাবি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করে দ্রুত ভাঙন কবলিত এলাকা প্রতিরোধে কাজ শুরু করা না হলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে বাবুগঞ্জ উপজেলার নদী তীরবর্তী অসংখ্য গ্রাম। বাবুগঞ্জ উপজেলার সন্ধ্যা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকা গত ১৮ জুলাই বিকেলে পরিদর্শন করেছেন বরিশালের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদুল ইসলাম। পাশাপাশি তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে খাবার সামগ্রিক বিতরণ করেন এবং তাদের সবধরনের সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, নদী ভাঙন প্রতিরোধে দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামিম, বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপুসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে অব্যাহত নদীভাঙ্গনের ফলে বিলীন হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম। যে কারণে ক্রমেই বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের স্থলভাগের মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। একসময় যাদের গোয়াল ভরা গরু, শস্যে ভরা ক্ষেত আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, তারাই এখন নদীভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হয়ে নাম লিখিয়েছেন ভূমিহীনদের তালিকায়। তাদের অনেকেরই ঠাঁই হয়েছে কোন বেড়িবাঁধের পাশে কিংবা জীবন-জীবিকার সন্ধানে পারি জমিয়েছেন ঢাকা অথবা বিভাগীয় কোন বড় শহরের বস্তিতে। উপক‚লের বাসিন্দাদের সারাবছর ভাল কাটলেও বর্ষাকাল আসলেই নদীভাঙ্গন নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নদীভাঙ্গনের শিকার হয়ে প্রতিবছর এ অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হচ্ছেন। প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনাও রয়েছে অসংখ্য। গ্রাম্য প্রবাদমতে, ‘ঘর পুড়লে ভিটেমাটিটুকু থাকে কিন্তু নদীভাঙ্গনে কিছুই থাকেনা।’ এমনকি পূর্বপুরুষের কবর জিয়ারতের সুযোগটি পর্যন্ত পায় না ভাঙ্গনকবলিত মানুষেরা। বাড়িঘরের সাথে গাছপালা আর পারিবারিক গোরস্তানও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গত কয়েক বছরে খোঁদ বরিশাল নগরী সংলগ্ন কীর্তনখোলার ভাঙনে চরবাড়িয়া, চরমোনাই, চরকাউয়া, চরআইচা ও চরবদনার অব্যাহত ভাঙ্গনে বিপুলসংখ্যক মসজিদ, স্কুল, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ইটভাঁটিসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙ্গনে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ, রাজাপুর ও আটহাজার নামের তিনটি গ্রাম বহু আগেই বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের এখন আর কোন অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে কীর্তনখোলা ও আড়িয়াল খাঁ নদীতীরবর্তী শতাধিক পরিবার, শত শত একর ফসলী জমি ও রাস্তাঘাট। মেঘনা নদীঘেরা বরিশালের একমাত্র দীপ উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জের উলানীয়া নদী সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্নস্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা উপজেলার লেংগুটিয়া, পাতারহাট স্টিমারঘাটের। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে সেখানকার উলানীয়া মোজাফফর খান ডিগ্রী কলেজ, করনেশন হাই স্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, মহিলা মাদ্রাসা, তেতুঁলিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত কয়েক বছরের ভাঙ্গনে ভাসানচর, বাগরজা, শিন্নিরচর নদীভাঙ্গনের কবলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। হিজলা উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোঃ আলহাজ হোসেন জানান, মেঘনা নদী গত কয়েক বছরে গ্রাস করে নিয়েছে পুরাতন হিজলা, চরমেমানিয়া, মৌলভীরহাট, গঙ্গাপুর, হরিনাথপুর, মল্লিকপুর, বাউশিয়া, বাহেরচর, হিজলা-গৌরবদী ও পালপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, ১০টি স্কুল এবং তিনটি হাট-বাজার। বর্তমানে চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে হরিনাথপুর বাজার, ধুলখোলা, আলীগঞ্জ বাজার ও বাউশিয়া গ্রাম। সূত্রমতেভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী আলিমাবাদ ইউনিয়ন কালাবদর নদীর স্রোতে বিলীন হওয়ার পথে। পার্শ্ববর্তী চাঁদপুরা ইউনিয়নটি রয়েছে চরম হুমকির মুখে। মুলাদীর জয়ন্তী ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে গত কয়েক বছরে উপজেলার নন্দিরবাজার, চরলহ্মীপুর, পাতারচর, বানিমদন, নাজিরপুর, মৃধারহাট, ছবিপুর, গুলিঘাট ও বাটামারা গ্রামের সহস্রাধীক বাড়িঘর, পাঁচটি বাজার ও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মুলাদী থেকে গৌরনদী উপজেলায় যাতায়াতের সড়কটি বিলীন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ১০বছরেও বিকল্প সড়ক তৈরি করা হয়নি। মুলাদী উপজেলার সফিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরুল আহসান শাহাজাদা মুন্সী বলেন, গতবছর চরমেমালিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় নয়টি বাড়িঘর ও যাত্রী ছাউনি রাক্ষুসী জয়ন্তী নদী গ্রাস করে নিয়েছে। মৃধারহাট লঞ্চঘাটেও ভাঙ্গন ধরেছে। তিনি আরও বলেন, চলতি বর্ষা মৌসুমেও ওইসব এলাকায় ভাঙন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে ভাঙন প্রতিরোধে দ্রæত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন সুফল মেলেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে বানারীপাড়া-স্বরূপকাঠী সড়কটি প্রায় সাত বছর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। যদিও এখন সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরি করা হয়েছে। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে রাজগুরু, লোহালিয়া, ক্ষুদ্রকাঠী, বাহেরচর, ঘোষকাঠী, মহিষাদি, রাকুদিয়া, ছানি কেদারপুর, মোল্লারহাট, রহিমগঞ্জ, রফিয়াদি গ্রামের কয়েক হাজার বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে উপজেলা সদর ও মীরগঞ্জ বাজার থেকে সুগন্ধা নদীর দূরত্ব মাত্র একশ’ গজ। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের পাঁচটিই নদী ভাঙনের কবলে পরেছে। উজিরপুর উপজেলায় সন্ধ্যা ও সুগন্ধা নদীর ভাঙনে গত কয়েক বছরে বরাকোঠা ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম ও শিকারপুরের ১০টি গ্রাম এবং গুঠিয়া ইউনিয়নের দাসেরহাট, কমলাপুর, সাকরাল, পরমানন্দ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি ও পাঁচটি স্কুল-মাদ্রাসা নদীতে বিলীন হয়েছে। ওই উপজেলার সাকরাল গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। শিকারপুর বন্দর ও শেরেবাংলা ডিগ্রী কলেজ বর্তমানে সন্ধ্যা নদীর ভাঙনের মুখে পরেছে। এ নদীর ভাঙনে বানারীপাড়া উপজেলার কাজলাহাট, জম্বুদ্বীপ, ব্রাহ্মণকাঠী, নাজিরপুর, শিয়ালকাঠী, মসজিদবাড়ির প্রায় ১০হাজার ঘরবাড়ি, সাতটি স্কুল-মাদ্রাসা ও দুটি বাজার কয়েক বছরপূর্বে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শিয়ালকাঠী, দান্ডয়াট ও নলশ্রী গ্রাম বর্তমানে বিলীনের পথে। ভারি বর্ষণে উজিরপুর-সাতলা সড়কটি চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে সাকরাল বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যলয়ের সামনের অংশ ভেঙে পরেছে, পাশের মসজিদটিও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পরেছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গতবছর বরাকোঠা ইউনিয়নের প্রায় দেড় হাজার পরিবার নদীভাঙনে সর্বস্ত্র হারিয়ে পথে বসেছে। ওই এলাকার চৌধুরীরহাট বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক দোকানঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় জমির অস্তিত্বের সঙ্কটে বাজারটি এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দাসেরহাট, হক সাহেবের হাট, কমলাপুর, শিকারপুর এলাকার সহ¯্রাধিক পরিবার চলতি বর্ষা মৌসুমে ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন। আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট নদীর ভাঙনে খাজুরিয়া, বাগধা, চাত্রিশিরা, আমবৌলা ও সাতলা গ্রামের কয়েকশ’ ঘরবাড়ি গত কয়েক বছরে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানেও পয়সারহাট নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গৌরনদীর পালরদী নদীর ভাঙনে উপজেলার হোসনাবাদ ও মিয়ারচর গ্রামের বাড়িঘর প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে। এখনও অসংখ্য বাড়িঘর, স্কুল ও বাজার ভাঙনের মুখে পরেছে। বাকেরগঞ্জের তুলাতলা, খয়রাবাদ, বেবাজ, কাতিভাঙ্গা নদীর করাল গ্রাসে হুমকির মুখে রয়েছে কলসকাঠী, বোয়ালিয়া, বাখরকাঠী, নীলগঞ্জ, চরামদ্দি এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর। মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা, তেঁতুলিয়া, মাছকাটা, লতা ও আইরখালী নদীর ভাঙনে উপজেলা সদর, গৌবিন্দপুর, উলানিয়া, চাঁনপুর, আলিমাবাদ, চরগোপালপুর, ভাসানচর, দরিররচর-খাজুরিয়া, চরএকরিয়া এলাকার কয়েক হাজার বাড়িঘর, অর্ধশতাধিক স্কুলসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গোবিন্দপুরের নয়টি গ্রামের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি গ্রাম রয়েছে। ওই একটি গ্রামকে পুনরায় নয়টি গ্রামে বিভক্ত করা হয়েছে। তাও ভাঙনের মুখে পরেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভাঙনকবলিত এলাকার একাধিক জনপ্রতিনিধিরা বলেন, প্রতিবছর নদীভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও নামমাত্র কাজ করে সিংহভাগ টাকাই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের পকেটে চলে যায়। ভাঙন প্রতিরোধে কখনই কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, স্বাধীনতার পর যে পরিমাণ টাকা নদীভাঙন প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে টাকায় ভাঙনকবলিত গৃহহীন ও ভ‚মিহীন মানুষদের পুনর্বাসন করা সম্ভব হতো। ভুক্তভোগিরা ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।



আমার বার্তা/২০ জুলাই ২০১৯/জহির

 


আরো পড়ুন