শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
এলাকাবাসীর গলার কাঁটা আবদুল মোনেম লি.
জলাশয়ের ওপর অপরিকল্পিত ব্রিজ
সৈয়দ রেফাত সিদ্দিকী ও মুনিরুল তারেক
০৬ অক্টোবর, ২০২১ ১৪:০০:০৭
প্রিন্টঅ-অ+



  • অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি জলাশয়ের গতিপথ বিঘ্নিত


  • এলাকার মানুষকে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা


  • কারখানার গাড়ি চলাচলে সড়ক নষ্ট, মেরামতে নেই সহযোগিতা




দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি আবদুল মোনেম লিমিটেড। এদের অনেকগুলো অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আবদুল মোনেম রেডিমিক্স কংক্রিট ইউনিট এবং এএম অটো ব্রিকস লিমিটেড। এদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান দুটির কারখানা এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগের শেষ নেই। ঢাকার কাছাকাছি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ছোট রায়পাড়া এলাকায় মেঘনা নদীতীরে গড়ে তোলা হয়েছে এ কারখানা। স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এদের নানাবিধ অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা, অনৈতিক-অবৈধ কর্মকান্ডের খবর। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অগণিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিন ও গভীর তদন্ত করেছে দৈনিক আমার বার্তার অনুসন্ধানী দল। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ হলো প্রথম পর্ব।


সম্প্রতি ছোট রায়পাড়া এলাকায় গেলে সংবাদকর্মীদের গাড়ি দেখে নিজ থেকেই কথা বলতে আসেন স্থানীয় জনগণ। আবদুল মোনেম লিমিটেডের রেডিমিক্স ও অটো ব্রিকস কারখানার প্রসঙ্গ তুলতেই তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ভোগান্তি, দুঃখ-কষ্ট ও হয়রানির কথা। তবে প্রভাবশালী এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে নাম প্রকাশের সাহস করেননি কেউই। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় জনতা জানায়, রেডিমিক্স ও অটো ব্রিকস কারাখানা সংলগ্নে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত একটি খাল এলাকার ভেতরে চলে গেছে। ওই খাল দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের ব্যবসায়ীক পণ্য, বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীসহ মালামালবাহী ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল করতেন একটা সময়। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। আবদুল মোনেম লিমিটেড নিজেদের প্রয়োজনে ওই খালের ওপর অপরিকল্পিতভাবে একটি ব্রিজ নির্মাণ করেছে। ব্রিজের উচ্চতা এতটাই নিচু, যান চলাচল অসম্ভব হয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় ব্রিজের তলানি পর্যন্ত পানিতে ছুঁয়ে যায়। ফলে ওই ব্রিজের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এলাকার মানুষ। এছাড়া ওই ব্রিজের কারণে জলাশয়ের গতিপথে বিঘ্ন ঘটছে। কোনো খাল বা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করতে হলে সেখানে কি ধরনের নৌযান চলে, সেগুলোর উচ্চতা কতটুকু, বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার হিসেব করে ব্রিজের উচ্চতা কতটুকু হবে, সেসব যাচাই-বাছাই না করেই ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে।




ব্রিজ নির্মাণে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট স্থপতি ইকবাল হাবিব দৈনিক আমার বার্তাকে বলেন, ‘প্রথমত, যেকোনো খাল বা সললপ্রবাহ ধারার জোয়ার-ভাটা এবং জোয়ার-ভাটাকালীন নৌ চলাচলের উচ্চতাকে গ্রাহ্যতার মধ্যে নিতে হয়। দ্বিতীয়ত, ব্রিজের পিলারগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হয় স্প্যান বাড়িয়ে যাতে করে সবচেয়ে কম বাধা সৃষ্টি করে স্রোতধারাকে। কারণ এ বাধা ধীরে ধীরে ওইখানে মাটি জমায় এবং সললপ্রবাহকে বন্ধ করে ফেলে। তৃতীয়ত, প্রতিটি ব্রিজের শেষ পয়েন্ট যেন উপযুক্ত স্থানে থাকে যেটা চলাচলে সর্বাধিক সুবিধা দেয়। সর্বশেষ যদি ব্রিজের মাঝখানে পিলার বসে তবে স্রোতের গতিধারা হিসেব করে বসাতে হয়। স্রোতের গতি সোজা, যদি কোনোরকম বাঁকা করে একটি পিলার বসানো যায়; ধরুন পূর্ব দিকে আপনার জমি, যদি পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে বসানো যায়, তাহলে আপনার জমির পরিমাণ বাড়বে আর পশ্চিমের দিকে যে আছে তার জমির পরিমাণ কমতে থাকবে, ভাঙন হবে। ফলে স্রোতের গতিধারা এবং ব্রিজের পরে খালের দু’পাশে যে উইং আছে, এ উইংয়ের গতিধারার সাপেক্ষে হিসেব করে পিলার স্থাপন করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক ব্রিজ দেখলেই বুঝতে পারি যে অন্যায় হয়েছে। নৌপথ বন্ধ করে সড়কপথ বানানো হয়েছে। কিন্তু নৌপথও তো একটা পথ, এক পথ বন্ধ করে তো আরেক পথ বানাতে পারেন না। তবে হ্যাঁ, অতি বর্ষা হলে সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু স্বাভাবিক বর্ষা-বন্যা এবং জোয়ার-ভাটায় ব্রিজ অবশ্যই নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না।’




এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্রিজ নির্মাণের আগে এসব পরিমাপ নদীর ওপরে করে বিআইডব্লিউটিএ আর খালের ওপরেরটা করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণ করে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ব্রিজ নির্মাণ করার আগে পরিমাপ জেনে নিতে হবে। ওই দপ্তরের মাপ অনুযায়ীই করতে হবে। নিজের ইচ্ছামতো করা যাবে না।’ স্থানীয়রা জানান, নদী তীরে আবাসিক এরিয়ার খুব কাছে যখন কারখানা দুটি গড়ে তোলা হয়, তখন এলাকার মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওইখানে প্রতিষ্ঠান হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বেকারত্ব দূর হবে। এখানে এলাকার লোকজনই চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবে। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। ওখানে দুটি কারখানায় বলতে গেলে এখন সব পদেই বাইরের লোক কাজ করছে। শুরুতে কয়েকজনকে চাকরি দিলেও নানা অজুহাতে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। স্থানীয় কাউকেই চাকরিতে রাখা হয়নি। এলাকার কেউ চাকরির জন্য গেলে অবমূল্যায়ন করা হয় বলে অভিযোগ জনগণের।


এলাকার এক জনপ্রতিনিধি জানান, কারখানা-লাগোয়া একটি সড়ক থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের মালবাহী বড় ট্রাক, পিকআপ চলাচল করে। এ কারণে রাস্তাটি ভেঙে বেহাল অবস্থা হয়েছে। বৃষ্টির দিনে কাদায় একাকার হয়ে মানুষের হাঁটার অবস্থা থাকে না। আর ছোট যান যেমন রিকশা, অটোরিকশা চলাচল করারও অযোগ্য হয়ে গেছে সড়কটি। বাধ্য হয়ে অনেক সময় এসব ছোট যান রাস্তাটিতে ঢুকলেও দুর্ঘটনায় পতিত হয় ভাঙার মধ্যে পড়ে। আবদুল মোনেম লিমিটেডের রেডিমিক্স ও অটো ব্রিকসে গাড়ি চলাচলের কারণে এমন দুর্ভোগ হলেও তারা সড়কটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। এলাকার মানুষের উদ্যোগে সড়কটি মেরামতের জন্য ইটভাটা থেকে কিছু রাবিশ চাইলে তাও দেয়া হয়নি। বিষয়টি এলাকার মানুষকে ব্যাথিত করেছে। একইসঙ্গে তাদের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো জানান, শিগগিরই এলাকার মানুষ আবদুল মোনেম লিমিটেডের অত্যাচার থেকে রক্ষায় মানববন্ধন করবে এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে প্রতিকার চাইবে।


এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে আবদুল মোনেম লিমিটেডের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এসএম ওয়ালিউর রহমান দৈনিক আমার বার্তাকে বলেন, ‘ব্রিজ নির্মাণ করায় যান চলাচলে কোনো ধরনের অসুবিধা হচ্ছে না। যেকোনো আকারের নৌযানই চলতে পারবে। পর্যাপ্ত উঁচু করেই ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। আর কারখানার শুরুতে কিছু স্থানীয় লোককে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা স্থানীয় হওয়ায় আধিপত্য খাটায় এবং বিভিন্ন অপকর্ম করে, তাই তাদের রাখা হয়নি। এছাড়া সড়ক ভাঙার কথা বলা হচ্ছে, সেটি আমরা ব্যবহার করি না। তবু আমরা আগে ওই সড়ক মেরামতের জন্য রাবিশ দিয়েছিলাম। কিন্তু ওই সড়ক সংস্কারের জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ রয়েছে। সুতরাং আমাদের সহযোগিতার প্রশ্নই আসে না।’


আগামী পর্বে থাকছে- ‘খাল আর তীরভূমির ওপর দাঁড়িয়ে মোনেমের রেডিমিক্স ও অটো ব্রিকস’।

আরো পড়ুন