শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ডিএসসিসির একাল-সেকাল ১
মেয়র তাপসকে ব্যর্থ করতে নীলনকশা!
হাসান মাহমুদ রিপন
০৬ নভেম্বর, ২০২১ ২২:০৮:১০
প্রিন্টঅ-অ+


ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলেছে সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতি। দায়িত্ব পেয়েই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেকে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। বর্তমান সময়ে যে দুর্নীতিমুক্ত এমনটা ভাবারও কোনো অবকাশ নেই। তবে বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির। তিনি বলেছেন, ‘অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ডিএসসিসির উন্নয়নকে মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করছে। আর এ দুর্নীতির কারণে অনেকাংশে উন্নয়নের সফলতা পাওয়া যায় না। ডিএসসিসিতে সব ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আর মেয়াদ শেষেই তার এ ঘোষণার সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব কষবে নগরবাসী।’ ডিএসসিসিতে বিগত মেয়রের সময়ের ও বর্তমান মেয়রের আমলে চলমান ঘটনা তুলে নিয়ে দৈনিক আমার বার্তার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হাসান মাহমুদ রিপনের প্রস্তুতকৃত ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম পরিচালনায় যাতে ব্যর্থ হন, সেজন্য খোদ সংস্থাটির মধ্যেই ঘাপটি মেরে থাকা একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এটি তারা পূর্বপরিকল্পিত নীলনকশা অনুযায়ী করছে বলে সূত্রের দাবি। জানা গেছে, তাপস দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরই সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের আমলে ডিএসসিসিতে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের নেপথ্যে নেতৃত্বে থাকা কথিত তিন খলিফা বর্তমান মেয়রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে নীলনকশা করা শুরু করেন। এ তিন খলিফার দুজনের এরই মধ্যে চাকরিচ্যুতি হলেও বিভিন্ন রফাদফার মাধ্যমে বহাল তবিয়তে রয়েছেন একজন। তবে ছক অনুযায়ী তাদের সিন্ডিকেটের যোগাযোগ, পরামর্শ ও পরিকল্পনা আদান প্রদান চলছে নিয়মিতভাবেই। মাঝেমধ্যে তারা রাজধানীর শান্তিনগর একটি রেস্টুরেন্টে মিলিত হচ্ছেন চা-চক্রে। আর সেখানে বসেই হচ্ছে বর্তমান মেয়রকে ব্যর্থ করার পরিকল্পনা ও পরবর্তী কাযক্রম নির্ধারণ এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করতে নির্ধারিত সদস্যদের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্যে সিন্ডিকেটের দুর্নীতি প্রকাশ করতে পারে- এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি ঘটানো (যাতে মেয়রের সান্নিধ্যে যেতে না পারে), মেয়রের শুভাকাক্সক্ষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে দোষী সাব্যস্ত করে বরখাস্ত বা চাকরিচ্যুতির লক্ষ্যে কতিপয় গণমাধ্যম দিয়ে ভুয়া তথ্য সরবরাহ করে তা প্রকাশ, রাজস্ব আদায়ে গড়িমসি, সংস্থার গোপন তথ্য বর্তমান মেয়রের প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয়াসহ আরো অনেক।

সূত্র মতে, চক্রটির নীলনকশার পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে ছিল মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ডিএসসিসির দুর্নীতি-অনিয়মে সুবিধাভোগী ছিল না কিংবা শাস্তি ভোগ করেছে, যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী এবং ঘটে যাওয়া দুর্নীতি অনিয়মের সার্বিক বিষয় জানে তাদের যে কোনো কিছুর মূল্যে হয় চুপ রাখতে হবে নয়তো কোনো না কোনোভাবে চাকরিচ্যুতি ঘটাতে হবে। আর এরই অংশ হিসেবে টার্গেট করা হয় কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খানকে। কারণ তিনি ঐ চক্রটির সঙ্গে ছিলেন না, ফলে বিগত মেয়রের আমলের পুরোটাই শাস্তি ভোগ করেছেন। কর কর্মকর্তা আতাহার আলী খান ডিএসসিসিতে ঐ আমলে ঘটানো প্রায় সব দুর্নীতি অনিয়মই জানতেন তা ঐ চক্রটি ভালোভাবেই জানতেন। আর এসব অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমানসহ বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে তুলে ধরতে পারেন এ আতঙ্ক থেকে আতাহার আলীর চাকরিচ্যুতি করতে সিন্ডিকেট বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ডিএসসিসির সাবেক এক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের একজন যুবলীগ নেতাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

আর ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় ধাপ হলো মেয়রকে সফল করতে একনিষ্ঠ হয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের সিন্ডকেটের সদস্যদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে দোষী বানিয়ে তা তাদের নির্ধারিত কতিপয় গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে তথ্য সরবরাহ করে তা প্রকাশ করানো। যাতে মেয়রের দৃষ্টিগোচর করে হয় বরখাস্ত নয়তো চাকরিচ্যুত করানো যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে আইসিটি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তাকে জড়িয়ে ভুয়া তথ্য পরিবেশন করে তাদের প্রতিবাদের মুখে পরবর্তীতে তা আবার ভুল স্বীকার করে প্রচার করা। আর এ সবের নেপথ্যে ভাণ্ডার বিভাগের দুজন, নগর পরিকল্পনা বিভাগের একজন এবং আইসিটি বিভাগের একজন জড়িত বলে জানা যায়। আর এরা সবাই ঐ সিন্ডিকেটরই সদস্য বলেও সূত্রের দাবি। তাছাড়া সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকেও রাজস্ব বিভাগের একজন উপকর কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও সংবাদ প্রকাশ হয়। যার সঙ্গে বাস্তবতার অনেকটাই মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, এটিও রাজস্ব বিভাগেরই একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভুয়া তথ্য সরবরাহ করে পত্রিকায় প্রকাশ করিয়েছেন। কারণ ওই উপকর কর্মকর্তাকে দিয়ে রাজস্ব বিভাগের ওই কর্মকর্তা কোনোভাবেই অনৈতিক কর্মকাণ্ড করাতে না পারার ক্ষোভ থেকেই এটি করিয়েছেন বলে জানা যায়। যদিও রাজস্ব বিভাগের ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তিনি এর পূর্বে এসব কারণে তিনি দীর্ঘদিন শাস্তিও ভোগ করেছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ডিএসসিসির মেয়রের উদ্যোগ যেন বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয় বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের কারণে না হয়ে থাকে। প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দুর্নীতি প্রমাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এগিয়ে আসতে পারে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমান মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বের ৫ বছরে চোখের সামনে অনেক অনিয়ম-দুর্নীতি দেখেছি। বিভিন্ন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ, কর আদায়ে নানা ফন্দিতে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়া এবং সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেয়াসহ আরো অনেক। এসব ক্ষেত্রে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার লেনদেন হয়েছে। আর এসবই করেছেন ডিএসসিসিতে থাকা তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। তৎকালীন সময়ে ঐ সিন্ডিকেটের বাইরে কথা বলার কোনো সুযোগ ছিল না। যারাই বলার চেষ্টা করেছে তাদেরই ভোগ করতে হয়েছে বরখাস্ত হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি। তিনি বলেন, ডিএসসিসিতে থাকা ওই সিন্ডিকেটের সদস্য থাকার মধ্যে রাজস্ব বিভাগ, প্রশাসন বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, হিসাব বিভাগ, আইন বিভাগ, ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ, সম্পত্তি বিভাগ উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ এবং আইন কর্মকর্তা মো. খায়রুল হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ডিএসসিসি মেয়রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে সংস্থার মধ্যেই নীলনকশা হচ্ছে এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএসসিসির সচিব আকরামুজ্জামান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত তিনি কিছুই জানেন না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এখন পর্যন্ত সিন্ডিকেট সদস্যদের দ্বারা হয়রানি হয়েছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি।’ জানা যায়, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মেয়র তাপস ডিএসসিসিকে দুর্নীতিমুক্ত করে এ এলাকার ঐতিহ্য ধরে রেখে, সবুজ, সচল এবং সুশাসিত ঢাকা গড়ে তুলতে কাজ করবেন। সে লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেই সাংবাদিকদের কাছে পাঁচটি অগ্রাধিকার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, করোনা মোকাবিলা, মশা নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ও অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, আবর্জনা পরিষ্কার এবং যানজট নিরসন।



 


আরো পড়ুন