শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ডিএসসিসিতে বিষয়টি ওপেন সিক্রেট!
হাসান মাহমুদ রিপন
২১ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৪৭:১৬
প্রিন্টঅ-অ+


বদলিকৃত স্থানে যোগদান না করা, পরবর্তী বদলিতে স্ট্যান্ড রিলিজ; এরপর দুই দফা বদলিতে একপ্রকার পুরস্কৃত করা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব মোহাম্মদ শাহজাহানকে নিয়ে সৃষ্ট বিষয়গুলোয় নানা ধরনের গুঞ্জন যেন এখন ওপেন সিক্রেট। আর এসবই ঘটেছে ১০ মাসের মধ্যে। ফলে নিন্দুকরা বলছেন, মোহাম্মদ শাহজাহানের কৌশল আর কেরামতিতে প্রমাণ হলো তিনি একজন সফল ম্যানেজ মাস্টার।

অভিযোগ রয়েছে, শাহজাহান ডিএসসিসির সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের আমলে কথিত তিন খলিফাখ্যাত সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার (চাকরিচ্যুত), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান (চাকরিচ্যুত) এবং বর্তমানে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের (টিইসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ডিএসসিসিতে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। যার ফলে সেই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। এসব সুবিধার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তার মূল পদে তাকে না রেখে আকর্ষণীয় উপকর কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয় বলে অভিযোগে প্রকাশ। আর ওই সময় তিনি নামে-বেনামে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হন। হয়েছেন রাজধানীর দক্ষিণ বাসাবো এলাকায় ৯৩ নম্বর বাড়ির ৭০৫ নম্বর ফ্লাটের মালিক। যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা বলে জানা যায়। এছাড়া তার খিলগাঁও এবং নতুন বাজার এলাকায় জমিসহ কয়েকটি ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা রয়েছে বলে অভিযোগ। বিগত মেয়রের আমলে তিনি ডিএসসিসিতে সুবিধাজনক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন আবার বর্তমান মেয়রের সময়ও তিনি ম্যানেজাবেল শক্তি দিয়ে আরো সুবিধাজনক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। আবার নিয়মানুযায়ী সহ-সচিব যাতায়াতে সংস্থার গাড়ি ব্যবহারে বৈধ অধিকারী না হলেও সংস্থাপন শাখা-২ এর সহ-সচিব মোহাম্মদ শাহজাহান চলাচলে অফিসের গাড়ি ব্যবহার করছেন। তাছাড়া একই গাড়িতে সংস্থাপন শাখা-২ এর শাখা সহকারী হিসেবে দায়িত্বে থাকা মো. মনির হোসেনও যাতায়াত করছেন বলে জানা যায়।





অভিযোগে আরো প্রকাশ, বিগত মেয়রের আমলে ডিএসসিসিতে তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য হলেও শাহজাহান বিশেষ পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে বর্তমান মেয়রের আমলেও বিধিবহিভর্‚তভাবে বাগিয়ে নিয়েছেন সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব পদটি। ১৩তম গ্রেডের এ কর্মচারী ফিডারভুক্ত না হলেও তাকে সহকারী সচিবের চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আর এ পদে বসাতে তাকে ২০২০ সালের ২৪ জুন থেকে চলতি বছরের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত এই ১০ মাসে চার দফা বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া তিনি ডিসিসি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলমের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পেক্ষাপট পরিবর্তন হবার পরপরই তিনি সুবিধা ভোগ করতে এখন ভোল পাল্টেছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ।

এ বিষয়ে সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব (চলতি দায়িত্ব) শাহজাহান বলেন, ‘এসব কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, ফিডার মিডার নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলে তো হবে না। তাছাড়া আমি এর পূর্বে ১০ বছর রাজস্ব বিভাগের উপকর কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্বে ছিলাম। আমি এ পদে ফিডারভুক্ত। আমার পদোন্নতিতো গত কয়দিন আগে বোর্ড সভায় হয়ে যেত একটু সমস্যার কারণে দেয়নি। শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সচিব পদে ফিডারভুক্ত এমন প্রশ্নে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলে, আমি সহ-সচিব আমি জানি ১৩তম গ্রেড সহ-সচিব পদে ফিডারভুক্ত।’

জানা গেছে, শাহজাহানকে প্রায় ১০ মাসে চার দফা বদলি করে টার্গেটকৃত সুবিধাজনক পদে বসানো হয়। এর মধ্যে ২০২০ সালের ২৪ জুন স্মারক নম্বর-৪৬.২০৭.০১৯.১১.০১.২২৫.২০২০-২৯৮ (৩৫) অফিস আদেশে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে বদলি করলে তিনি সেখানে যোগদান না করায় একই বছরের ১৬ জুলাই সচিব আকরামুজ্জামান স্বাক্ষরিত স্মারক সংখ্যা ৪৬.২০৭.০১৯.১১.০১.২২৫.২০২০-৩৩৬ অফিস আদেশে ঢাকা মহানগর হাসপাতালে ব্যক্তিগত সহকারী পদে বদলির নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর আবার ২০২০ সালের ১ নভেম্বর সংস্থার সচিব স্বাক্ষরিত স্মারক সংখ্যা ৪৬.২০৭.০০০.০৩.০১.৪৫৭৭.২০০৯-৫৬৯ অফিস আদেশে ফিডারধারী না হলেও শাহজাহানকে রহস্যজনকভাবে সংস্থাপন শাখা-৩ এর সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। পুনরায় চলতি বছরের ১১ এপ্রিল সচিব আকরামুজ্জামান স্বাক্ষরিত স্মারক সংখ্যা ৪৬.২০৭.০০০.০৩.০২.৫২২৮.২০০৬-২৯৬ এর অফিস আদেশে শাহজাহানকে সংস্থাপন শাখা-২ এর সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। আর এ বদলির পর শাহজাহানকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন শোনা গেছে। তিনি বিশেষ পন্থায় ও কৌশল অবলম্বন করে ফিডারধারী না হয়ে এবং সাবেক মেয়রের আমলের তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য হয়েও বর্তমান মেয়রের সময় প্রশাসনিক এমন আকর্ষণীয় পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এসবই তিনি ভাণ্ডার শাখার এক কর্মচারীর মাধ্যমে করিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভাণ্ডার শাখার এ কর্মচারীর মুখোশের আড়ালে সংস্থায় রহস্যজনক ভ‚মিকায় রয়েছেন বলে জানা যায়, যা ক্রমান্বয়ে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হবে।

‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা-২০১৯’ অনুযায়ী ৯ম গ্রেডভুক্ত সহকারী সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একমাত্র ফিডার পদ ১০ম গ্রেডভুক্ত ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’। অথচ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে সম্পূর্ণ বিধিবহিভর্‚তভাবে ফিডারধারী নন এবং অপেক্ষাকৃত নিম্ন গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের সহকারী সচিব পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করে আদেশ জারি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজস্ব বিভাগের এক কর্মচারী বলেন, বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের আমলে গুরুত্বপূর্ন পদগুলোয় তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন সেই সিন্ডিকেটের সদস্যরাই ক্রমান্বয়ে বদলি করে অথবা পদায়ন করে আনা হচ্ছে। পাশপাশি মেয়রের শুভাকাক্সক্ষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন মুখরোচক অপবাদ দিয়ে কৌশলে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে। আর এসবই একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে করছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, শাহজাহানকে প্রথমে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দপ্তরে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে বদলি করা হলে তিনি অভিমান করে সেখানে যোগদান করেনি বলে শুনেছি। তিন খলিফার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের সদস্য হয়েও কার পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, তা প্রশাসনের এখনই খুঁজে বের করা উচিত। নতুবা ভবিষ্যতে এর খেসারত দিতে হতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহম্মেদ বলেন, ২০১৬-এর অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী ডিএসসিসিতে ২ হাজার ২০০-এর মতো পদ আছে। আবার এ পদের মধ্যে বর্তমানে আড়াইশ’র অধিক পদ শূন্য আছে। আর শূন্য থাকার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে কৌশলগত কারণে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে যাকে যেই পদে যোগ্য মনে করা হয়েছে, মেয়রের অনুমতি নিয়ে আপাতত তাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে সংস্থার কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিএসসিসির আড়াইশ’র উপরে থাকা শূন্য পদগুলোয় ধারাবাহিকভাবে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগুলো পূরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান এ বিষয়ে বলেন, ফিডারভুক্ত নয়, তবুও কাউকে সেই পদে দায়িত্ব দেয়ার বিষয় এমনটা আগে শুনিনি; তবে এখন তা দেখতে হচ্ছে। শুধু সিটি কর্পোরেশনে নয়, অনেক প্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের নজির রয়েছে। আবার এদের পদোন্নতিও হচ্ছে, যা পুরোটাই দুঃখজনক বলা ছাড়া কিছুই করার নেই। যদিও বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরই ঘোষণা দিয়েছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতির। তিনি বলেন, ‘অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি ডিএসসিসির উন্নয়নকে মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করছে। আর এ দুর্নীতির কারণে অনেকাংশে উন্নয়নের সফলতা পাওয়া যায় না। ডিএসসিসিতে সব ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

 


আরো পড়ুন