শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
রাজধানীতে অভিনব কায়দায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চুরি
মোঃ সোলায়মানঃ
২৮ আগস্ট, ২০২২ ১৮:৫৯:২৩
প্রিন্টঅ-অ+

রাজধানীতে অভিনব কায়দায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চুরি করা হচ্ছে। এসব চোরাই রিকশা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আবার চোরাইকৃত রিকশা ১৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে দালালদের মাধ্যমে পরিশোধ করে তা ফেরতও দেয়া হচ্ছে। সিজনাল রিকশা চালকদের কাছ থেকে আটো রিকশা চুরি হয় বেশি। কারণ ঢাকার বাইরে থেকে অনেকেই রিকশা চালাতে আসেন।  কিছু পয়সা রোজগারের আশায় তারা ঢাকায় আসেন। শহরে নতুন আসা এসব রিকশা চালকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে রিকশা চুরি করা সহজ হয়। তাই এ সময় চুরিও বেড়ে যায়। 


রাজধানী ও এর আশপাশে এলাকায় রিকশা চুরির প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। মোঃ জয়নাল, বাড়ি জামালপুর। তিনি প্রতি বছর দুই-তিন মাস রিকশা চালাতে ঢাকায় আসেন। এবারও এসেছেন। থাকছেন মিরপুর দুয়ারীপাড়া এলাকায়। গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে আগে থেকে চেনাজানা থাকায় রিকশা পেতে সমস্যা হয় না। কিছুদিন তার রিকশা চুরি হয়েছে। যাত্রী তাকে একশ’ টাকার নোট দিয়ে বললেন, দোকান থেকে টাকা ভাংতি করে নিয়ে এসো। একটু সামনে যেতেই রিকশা নিয়ে চলে যায় ওই যাত্রী। রিকশার কোনো হদিস পাওয়া গেল না। এ রিকশার জন্য জয়নাল তার মালিককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেন।


আটোরিকশা চুরির বেশ কিছু কৌশল রয়েছে। সাধারণত যাত্রী বেশেই রিকশা চুরি হয় বেশি। কখনও চালকের গলায় ছুরি ধরেও রিকশা চুরি হচ্ছে। আবার এমনও হয়, কোনো ভারী জিনিস নিয়ে দুজনে রিকশায় যাবে। একজন আগেই রিকশায় চড়ে বসে। অন্যজন ভারী জিনিস আনতে রিকশা চালকের সহায়তা চায়। এই ফাঁকেই রিকশা নিয়ে চলে যায় চোর। আবার রাস্তায় রিকশা রেখে যখন চালকরা কোনো হোটেলে বা দোকানে খেতে বসে তখনও রিকশা চুরি হয়। দোকানিদের যোগসাজসে টার্গেট করা চালককে অজ্ঞান করে রিকশা চুরি হচ্ছে। 


নারীদের সহযোগিতায় রিকশা চুরি হচ্ছে দেদার। টাকা ভাংতি করে দেবে বলে চালককে গলির ভেতরে নিয়ে যায়। পরে চালক এসে দেখে তার রিকশা নেই। আবার চোরও নারী মালিকের রিকশাই বেশি চুরি করে। কারণ তারা পুলিশি ঝামেলা করতে যায় না। প্রতিটি এলাকাতেই রিকশা চুরির সিন্ডিকেট রয়েছে। এক এলাকার চোর অন্য এলাকার রিকশা সাধারণত চুরি করে না। সংঘবদ্ধ চোর চক্রটি রাস্তায় চলাচলরত যে কোনো একটি রিকশাকে টার্গেট করে। তারপর নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার জন্য রিকশা ভাড়া করে। রিকশা নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পথে নির্জনস্থানে চালকের হাতে ১০০ টাকার নোট দিয়ে পান, সিগারেট কিংবা পানি আনার অনুরোধ করে। চালক দোকানে যাওয়ার পরমুহূর্তে কৌশলে রিকশা নিয়ে সটকে পড়ে ওরা। রিকশা চুরির পর তারা রং বদলসহ কিছু পরিবর্তন আনে রিকশায়। তারপর সেই রিকশা নির্দিষ্ট গ্যারেজে কমদামে বিক্রি করে দেয়।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর-১,২,১০, পল্লবী রুপনগর সহ বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশা বেশি চলাচল করে। রিকশা চোরের সিন্ডিকেটে একাধিক মহিলা সদস্যও রয়েছে। এ সদস্যরা বিভিন্ন কায়দায় রিকশা চুরি করছে। জানা গেছে, মহিলা সদস্য যাত্রীবেশে অটোরিকশায় উঠে। এরপর নির্দিষ্ট জায়গায় একজন চোর অবস্থান করে। সেখানে যাওয়ার পর ওই মহিলা যাত্রীটি রিকশা চালককে  বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা তার সাহায্য চাওয়া হয়। রিকশা চালক মহিলাটিকে সাহায্যে করার সময় সেখানে অবস্থানকারী রিকশা চোর ওই অটোরিকশাটি দ্রুত নিয়ে পালিয়ে যায়। অটোরিকশা চুরি হবার পর  রিকশার মালিকগন পরে সুনির্দিষ্ট চোরাই রিকশার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রিকশাটি কোথায় রাখা আছে, তার অবস্থান নিশ্চিত করে। এরপর দর কষাকষির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট টাকা পরিশোধ করার পর তার গ্যারেজে রিকশা পৌঁছে দেয়া হয় বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। 


রাজধানীর মিরপুর এলাকার সোহাগ আলী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রিকশার ব্যবসা করে আসছে। তিনি জানান, রিকশা চোররা ভিন্ন ভিন্ন কায়দা ব্যবহার করে রিকশা চুরি করছে। কেউ মুরগি দিয়ে, আবার কেউ মালামাল নিয়ে রিকশা চুরি করছে। এর মধ্যে কিছু রিকশা চোর চালের বস্তা নিয়ে রিকশায় নির্দিষ্ট জায়গায় যান। এরপর রিকশার যাত্রী তার চালের বস্তাটি নামিয়ে বাসার গেটে পৌঁছে দেয়ার জন্য বলা হয়। রিকশার চালক যাত্রীর কথামতো চালের বস্তাটি নামিয়ে বাসার গেটের ভেতরে ঢোকে। পরে বাসার গেট থেকে বের হয়েই দেখতে পায় তার রিকশা সেখানে নেই। 


মোঃ কাশেম নামের এক রিকশাচালক জানান, তিনি এক রিকশার আরোহীকে নিয়ে স্টেডিয়াম মার্কেটে যান। সেখানে একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন। এর মধ্যে এক লোক এসে তার সঙ্গে গল্প করতে থাকে। এর একটু পরই রাস্তার পাশে রাখা তার রিকশাটি আর দেখতে পাননি। এরপর তার সঙ্গে গল্প করা ব্যক্তিকে আর দেখতে পাননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও রিকশা না পেয়ে তিনি গ্যারেজ মালিকের জানান। মালিক প্রথমে দালাল চক্রের একজনের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে। এসময় দালালকে যোগাযোগের জন্য তার মোবাইলে প্রথমে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। এরপরই মূলত শুরু হয় চুরি যাওয়া রিকশা উদ্ধারের কার্যক্রম। এসময় কোনো স্থান থেকে কখন, কীভাবে চুরি হয়েছে ও চোর সিন্ডিকেট চুরি হওয়ার আগে রিকশা চালককে কি কি সংকেত দিয়েছিল তাও দালালকে বলতে হয়। সমস্ত ঘটনা শুনে এক অথবা দুই দিন পর চুরি হওয়া রিকশা  সন্ধান মালিক পক্ষকে দেন দালাল। এরপর শুরু হয় দর কষাকষি। পায়ে চালানো রিকশা চুরি হলে চোর সিন্ডিকেটকে তা ৮/১০ হাজার টাকায় আর আটো রিকশাটি ৩০/৪০ হাজার টাকায় মালিককে বুঝিয়ে দেন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা টাকা হাতে পাওয়ার পর দালালকে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে লোক পাঠাতে বলে। মালিক পক্ষ সেখানে অবস্থানের কোনো এক সময় রিকশা সড়কের উপর রেখে চোর চক্রের ডেলিভারির সদস্য সটকে পড়ে এবং মোবাইলে জানিয়ে দেন রিকশা ফেরত দেয়ার কথা। 


রাজধানীর  ডেমরা, শ্যামপুর, জুরাইন, মান্ডা, খিলগাঁও, মাদারটেক, বাসাবো, বাড্ডা, খিলক্ষেত, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগসহ বেশ কিছু এলাকায় নির্ধারিত গোপন আস্তানায় চোরাই রিকশাগুলো জমা হয়। রিকশা চুরি হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দালালদের মাধ্যমে জানা হয়ে যায় রিকশাটি কার আস্তানায় আছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া রিকশাই চুরি হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ এসব রিকশা চুরি হলে মালিক হয়রানির ভয়ে থানা পুলিশে যেতে চায় না। পুলিশের চেয়ে তখন দালালই একমাত্র ভরসা রিকশা মালিকের। নির্দিষ্ট পরিমাণ জরিমানা দিয়ে রিকশা ফেরত পাওয়া খুব সহজ। টাকা দিলে রিকশা পেতে কোনো সমস্যা হয় না। চোর হলেও তারা ঈমানদার। গ্যারেজ বা সারিবদ্ধ করে রাখা রিকশাগুলো চুরি হয় না বললেই চলে।  রাজধানীজুড়ে রিকশা চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ রিকশা মালিক। রিকশার চুরির এসব ঘটনায় অতিষ্ঠ মালিকরা। মালিকের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চোরচক্র। রিকশা চুরি হলে হয়রানির ভয়ে কেউ পুলিশকে জানায় না। দালালচক্রের মাধ্যমে রিকশা উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।

আরো পড়ুন