শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
লড়াকু বাঙালির মার্চ
টিক্কা খানকে গভর্নরের শপথ পড়াতে সম্মত হননি কোনো বিচারক
সাদেকুর রহমান
০৯ মার্চ, ২০২২ ১০:৫০:১২
প্রিন্টঅ-অ+

মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ ছিল মঙ্গলবার। এদিন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী সচিবালয় সহ সারাদেশে সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, হাইকোর্ট ও জেলাকোর্ট প্রভৃতিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু  যেসব সরকারি অফিস খুলে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন কেবল সেসব অফিস চালু থাকে। গভীর রাতে ইসলামাবাদে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক শাসক নিয়োগ করা হয়। এই নিয়োগ ৭ মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। টিক্কা খান ৭ মার্চ ঢাকা আসেন। ৬ মার্চ তাকে পূর্বাঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করা হয়। আজ তার গভর্নর হিসেবে কার্যভার গ্রহণের কথা ছিল।


কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হরতাল চলাকালে ঢাকা হাইকোর্টের কোনো বিচারপতি নবনিযুক্ত সামরিক গভর্নরের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে অস্বীকৃতি জানান। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম  বিবিসিতে খবরটি বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়। 


বলা হয়, ‘আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবের নির্দেশে কোনো বিচারপতি পূর্ব পাকিস্তানের নব নিযুক্ত গভর্নরের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে সম্মত হননি।’ বিভিন্ন প্রামাণ্য দলিল বলছে, এদিন আওয়ামী লীগ প্রধান, সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ন্যাপ প্রধান মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মধ্যে টেলিফোনে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিকেলে ঢাকার পল্টন ময়দানের বিশাল জনসভায় তুমুল করতালির মধ্যে মওলানা ভাসানী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে ছুঁড়ে দেন তার তীর্যক বক্তৃতা। বলেন, ‘ইয়াহিয়াকে তাই বলি, অনেক হয়েছে আর নয়।


তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই। ‘লা-কুম দ্বীনিকুম অলইয়া দ্বীন (অর্থ্যাৎ তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার)’ এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা মেনে নাও।’ তিনি মুক্তিকামী জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হে বাঙালিরা, আপনারা মুজিবের উপর বিশ্বাস রাখেন, তাকে খামোকা কেউ অবিশ্বাস করবেন না, কারণ মুজিবকে আমি ভালোভাবে চিনি।’ এদিন তিনি তার ভাষণের সাথে ১৪-দফা দাবিও পেশ করেন।  


ভাসানী তার ভাষণে পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রতি ইঙ্গিত করে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বলেন,‘১৩ বছর আগে আমি কাগমারি সম্মেলনে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছিলাম। মরহুম শহীদ সোহরাওয়ার্দী তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি হয়েও সেদিন আমার কথা অনুধাবন করতে পারেননি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, দুই অংশ যদি একত্রে থাকে তাহলে কালব্যাধি য²ার জীবাণু যেমন দেহের হৃদপিন্ডের দুই অংশকে নিঃশেষ করে দেয়, তেমনি পাকিস্তানের দুই অংশই বিনষ্ট হবে। তাই বলেছিলাম যে, তোমরা তোমাদের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কর এবং আমরা আমাদের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করি। শেখ মুজিব ঘরের ছেলে আজ ঘরে ফিরে এসেছে। পূর্ব বাংলা স্বাধীন হবেই।’ তিনি এও বলেন, ‘মুজিবের নির্দেশ মতো আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কিছু না হলে আমি শেখ মুজিবের সাথে মিলে ১৯৫২ সালের মতো তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলব।’ 


সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতীয় সরকার গঠনের আহŸান জানানো হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নেতৃত্বে গঠিত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ এর ছাত্রসভায় গৃহীত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষনার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন এবং  ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। 


সামরিক কর্তৃপক্ষ রাত ৯টা থেকে রাজশাহী শহরে ৮ ঘন্টার জন্য কারফিউ জারি করেন। রাজশাহীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিদিন নৈশ কারফিউ জারির পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সেনাবাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে ঘোষণার পর রাজশাহীতে হঠাৎ সান্ধ্য আইন জারির কারণ বোধগম্য নয়। এই সান্ধ্য আইন জারি জনসাধারণের জন্য উস্কানি ছাড়া আর কিছু নয়।’ বিবৃতিতে অবিলম্বে কারফিউ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি এক প্রচারপত্রে ‘স্বাধীন বাংলা’ প্রতিষ্ঠার লড়াই বেগবান করতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে।


প্রচারপত্রে বলা হয়, ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্টরা বাংলাসহ পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে লড়াই করছে দীর্ঘকাল ধরে। বিভিন্ন ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণ একটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের যে দাবি জানিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি তাকে ন্যায্য মনে করে এবং তাই পূর্ব বাংলার জনগণের বর্তমান সংগ্রামেও কমিউনিস্টরা সর্বশক্তি নিয়ে শরিক হবে।’ সকালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) বাঙালি কর্মচারীরা অধুনালুপ্ত তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে মিছিল করে ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এলে তিনি তাদের সাক্ষাৎ দেন।


এদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব মি. উ থান্ট ‘প্রয়োজনবোধে’ পূর্ব পাকিস্তান থেকে জাতিসংঘের স্টাফ ও তাদের পরিবারবর্গকে প্রত্যাহারের জন্য ঢাকাস্থ জাতিসংঘের উপ আবাসিক প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেন। জাপানের পররাষ্ট্র দফতর পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তার দেশের নাগরিকদেরও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিম জার্মান সরকার তার দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য সামরিক বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

আরো পড়ুন