শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
মন্ত্রী রেজাউলের দুর্নীতি তদন্তে মাঠে নামছে দুদক
বশির হোসেন খান
০৩ জানুয়ারি, ২০২২ ১৯:২৭:৪৯
প্রিন্টঅ-অ+

এক বছরেরও বেশি সময় আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছিল। মাঝখানে এতটা সময় পার হওয়ার পর অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে সংস্থাটি। দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার দৈনিক আমার বার্তাকে জানিয়েছেন, দুদকের একটি দল শিগগিরই মাঠে নামবে অভিযোগের তদন্তে।


তবে, জমাপড়া লিখিত অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য উল্লেখ থাকলেও তদন্ত শুরু হতেই কেন এই দীর্ঘসূত্রিতা? এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়নি কারো কাছ থেকে। কমিশনার পদমর্যাদার একজন দুদক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ধরন বুঝে আগে-পরে তদন্ত শুরু হয়। শ ম রেজাউল করিম মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হওয়ায় হয়ত একটু দেরি হয়েছে।


দুদকে জমাপড়া অভিযোগটি করেছেন পিরোজপুর সদরের বাসিন্দা জনৈক রফিকুল ইসলাম সুমন। ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর তার স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী রেজাউল করিম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।


অভিযোগপত্রে দেখা গেছে, সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং বর্তমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এমপি ও তার পরিবার, ভাই ও বোন এবং বোন জামাইদের দুর্নীতি ও অনিয়ম, জমি দখল নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, আত্মসাৎ বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রী রেজাউল করিম নিজ নামে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে একাধিক প্লট নিয়েছেন। তিনি রাজউক এর আইন ভঙ্গ করে উত্তরা ৭ নং সেক্টরে ৫ কাঠা ও পূর্বাচল প্রকল্পে ৫ কাঠার প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া, গ্রামেই বাস করে, ঢাকায় কোন দিনও আসেননি, এমন বন্ধুদের নামে রাজউক আইন ভঙ্গ করে পূর্বাচল প্রকল্পে একাধিক প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন তিনি। বন্ধুদের কাছ থেকে তিনি ও তার ছোট ভাই নুরে আলম সিদ্দিকী শাহিন পাওয়ার অব এ্যাটর্নী নিয়ে রেখেছেন। এ সংক্রান্ত প্রমাণ ও নথিপত্র দুদকে জমা দেয়া হয়েছে।


অভিযোগে আরো বলা হয়, রেজাউল করিম মন্ত্রী হওয়ার পর তার নিজ উপজেলায় ভ‚মি অফিসে প্রায় দেড়শ দলিল করেছেন নিজ নামে। শত শত বিঘা সম্পত্তি ক্রয় করেছেন তিনি। এছাড়া, শ ম রেজাউল করিম এমপি এর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ভুয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধে দÐিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সহযোগিতায় ২০০৫ সালে গেজেটে নিজের নাম, তার বাবার নাম, তার ২ ভাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন রেজাউল করিম। তার জন্ম তারিখ অনুযায়ী ৮ বছর বয়সে মুক্তিযোদ্ধা দেখিয়েছেন, যা ভুয়া জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রতারণা করেছেন। এ বিষয়টি নিয়ে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিবাদও করেছেন।


আরো অভিযোগ করা হয়, শ ম রেজাউল করিম এমপি গণপূর্তমন্ত্রী হয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে জামায়াত-বিএনপি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসিয়ে নিজে সুবিধা নিয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে রিপোর্ট দিয়েছেন। রেজাউল করিম তার নিজের পত্রিকায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সকল বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য নিজের ডিও লেটার দিয়ে নির্দেশ দেন এবং সব বিজ্ঞাপন নিয়ে দুর্নীতি করেছেন।


অভিযোগপত্রে বলা হয়, রেজাউল করিমের ছোট ভাই নুরে আলম সিদ্দিকী শাহীনকে পিএ বানিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সকল কাজ করিয়েছেন। এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন। তার আপন বোন জামাই বিএনপি নেতা আবুল কাসেমকে দিয়ে পিরোজপুরে সকল নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করেছেন। শ ম রেজাউল করিম মন্ত্রীর প্যাডে তার নির্বাচনী এলাকায় সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিজস্ব লোকের নাম দিয়ে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করিয়েছেন।


মন্ত্রী রেজাউল করিমের ছোট ভাই নুরে আলম সিদ্দিকী শাহীন নিজের নামে ২০১৯ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিমরান মায়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে লাইসেন্স নিয়ে পিরোজপুরের সকল কাজ অবৈধভাবে করেছেন। অথচ তার লাইসেন্সে ৫-১০ লাখ টাকার কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও হাজার হাজার কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে অবৈধভাবে টেন্ডারের কাজ নিয়েছেন। অনেক রাস্তার কাজ না করে টাকা উত্তোলন করে আত্মস্যাৎ করেছেন। অবৈধ কাজে সহযোগিতা করেছেন নাজিরপুর উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন। রেজাউল করিমের ছোটভাই নুরে আলম ছিদ্দিকী শাহীন তাদের পত্রিকায় কাজের টেন্ডার ছাপিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি না নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে শত শত কোটি টাকার কাজ নিয়েছেন অবৈধভাবে।


আরো অভিযোগ করা হয়, শ ম রেজাউল করিমের আরো এক ছোটভাই নওশের বাদশা শামীম গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর ডিপোজিট টাকা নিজে কমিশন খেয়ে পছন্দ মতো ব্যাংকে ডিপোজিট রেখেছেন। তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন। রেজাউল করিমের বড় ভাই নজরুল ইসলাম বাবুল নাজিরপুর উপজেলায় হিন্দুদের জমি দখল নিয়েছেন এবং বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন।


অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, শ ম রেজাউল করিম দুর্নীতি করে উপার্জিত বেশির ভাগ অর্থ বেনামে রেখেছেন। তার ছোটভাই শামীমের স্ত্রী ও শ্যালকদের নামে এবং শ ম রেজাউল করিম-এর দেশের বাইরে বসবাসরত বন্ধুদের নামে রেখেছেন এই অবৈধ টাকা।


এছাড়া, রেজাউল করিমের ছোট ভাই নুরে আলম ছিদ্দিকী শাহীন তার ভাইয়ের ক্ষমতা প্রয়োগ করে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এফ-বøকে ২৬০০ ফিট ২টি ফ্ল্যাট এবং উত্তরায় ১টি ফ্ল্যাট কিনেছেন, যা তার শ্যালিকার নামে রয়েছে। শাহিন তদবির বাণিজ্য, জালিয়াতির মাধ্যমে কাজ নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। তার সিটি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, শাহজালাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক একাউন্টে শত কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়াও পূবালী ব্যাংক নাজিরপুর শাখায় রয়েছে তার কোটি কোটি টাকা।


সিমরান মায়ান ট্রেড ইন্টারন্যশনাল ঠিকাদারি লাইসেন্সের একাউন্ট নং: ০৪৯৩৩০০১৫৪৫-এ শত কোটি টাকা রয়েছে শাহিনের। এছাড়াও সিটি ব্যাংকের একাউন্ট নং: ২২০১৯০৭৯৫৭০০১-এ শত কোটি অবৈধ টাকা রয়েছে তার। শাহিনের শ্যালিকা আসমা আক্তার মুক্তির নামে ব্যাংক এশিয়ায় কোটি টাকা রেখেছেন শাহিন। শাহিন ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া, ভারত, সুজারল্যান্ড একাধিকবার বিনোদন ভ্রমণ করেছেন। সিঙ্গাপুর ব্যাংকে টাকা পাচার করেছেন।


আরো অভিযোগ আছে, শ ম রেজাউল করিম এমপি মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় ডি-বøক এ বিএনপি নেতা বরকতউল্লা বুলুর সঙ্গে অবৈধভাবে খাসজমি দখল করেছেন। আফতাবনগর রামপুরা ব্রিজের পরে জমি কিনেছেন তিনি। বেইলী রোডে ফ্লাট ও পল্টনে মেহেরবা প্লাজায় ফ্লোর কিনেছেন। তার এপিএস জুয়েল সেগুনবগিচায় ফ্ল্যাট এবং ডেমরায় ২টি ৬তলা বাড়ি কিনেছেন। দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে তিনি টাকা পাচার করেছেন।


এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দৈনিক আমার বার্তাকে বলেন, মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অনেকেই করে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখবেন। আমি কোন অনিয়ম-দুর্নীতি করি না। দুদকে অভিযোগ পড়েছে, দুদকই তদন্ত করে দেখবে। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।


দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার দৈনিক আমার বার্তাকে বলেন, দৈনিক অনেক অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করা হয়। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যতই শক্তিশালী হোক, তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরো পড়ুন