শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
রিকশাচালক সেলিম খান যেভাবে কোটিপতি
বশির হোসেন খান
২৩ এপ্রিল, ২০২২ ২২:৪৭:০১
প্রিন্টঅ-অ+

সিনেমাকে হার মানিয়েছেন সেলিম খান। কেবলমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে রাতারাতি ভাগ্য বদলে রিকশাচালক থেকে কোটিপতি তিনি। নিম্ন আয়ের রিকশাচালক হিসাবে জীবন শুরু করলেও আজ তার দিনে আয় ৫০ লাখ টাকারও বেশি। রূপকথার মতোই তার জীবন। খুব গরীব ঘরে জন্ম। ডাকাতির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিন্তু সে সবই এখন অতীত। তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী ও নেতা। সিনেমায় বিনিয়োগ করে গ্ল্যামার জগতেও নামডাক ছড়িয়েছেন। একাধারে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ঠিকাদার, প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। তিনি এখন মেঘনায় অবৈধ ড্রেজিং ও একচেটিয়া বালু ব্যবসা করে শত কোটি টাকার মালিক। আন্ডারওয়ার্ল্ডেও রয়েছে হট কানেকশন। জমি দখলেও তিনি সিদ্ধহস্ত। 


দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, সেলিম খান আত্মগোপনে দেশের বাইরে যেতে পারেন। তাই খুব শিগগিরই তার বিদেশ গমনের ওপর নিষেজ্ঞা আনা হবে। সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে চাঁদপুরের লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সেলিম খান। তখন থেকে বর্তমান পর্যন্ত তিনি ওই পদে রয়েছেন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জোয়ার তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূর। অর্থ এবং বিলাসবহুল জীবন তাকে স্বেচ্ছায় অনেক কিছু দেয়।


মেঘনায় বালু সন্ত্রাস: সরেজমিনে সেলিমের বালুর রাজ্যের আসল পরিস্থিতি নদীর পার থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। দুয়েকটি বাল্কহেডের আনাগোনা ছাড়া নদীতে আর কিছুই দেখা যায় না। আসল চিত্র আরও গভীরে। একেবারে নদীর মাঝ বরাবর। ডাকাতিয়া-পদ্মা-মেঘনা-তিন নদীর মোহনায় বিশেষ বাঁধ ‘মূলহেড’। সেখান থেকে গভীর ইঞ্জিন চালিত ভাড়া করা ট্রলার চলাচল শুরু করে। নদীপথে ৪০ মিনিট পর সেলিমের বালুর রাজ্য দেখা যায়। ভাসমান ড্রেজারের সারি সারি দেখা যায়। বাতাসে কালো ধোঁয়া উড়ছে। প্রায় ৫০টি ড্রেজার নদীতে ভাসছে। পাইপ দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নোঙর করা বাল্কহেডের চেম্বারে ফেলে দেয়া হচ্ছে। ভাসমান ড্রেজারে লেখা আছে সেলিম চেয়ারম্যানের ছেলের নাম ‘শান্ত খান ড্রেজিং প্রকল্প’-১, ২, ৩, ১৫, ২০ ইত্যাদি।


জানা যায়, প্রতিটি বাল্কহেডের বালু ধারণক্ষমতা ৫ থেকে ১৫ হাজার ঘনফুট। প্রতি ঘনফুটের দাম তিন টাকা। সে হিসাবে ৫ হাজার ঘনফুটের একটি বাল্কহেড থেকে আয় ১৫ হাজার টাকা। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই শতাধিক বাল্কহেড বালু বিক্রি হচ্ছে। ফলে একচেটিয়া বালু সাম্রাজ্য থেকে তার দৈনিক গড় আয় ৫০ লাখ টাকার বেশি।


ট্রলার চালক ড্রেজিং এলাকার ছবি তুলতে আর যেতে রাজি হননি। কারণ নদীতে সেলিম চেয়ারম্যানের নিরাপত্তা টহল রয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দেখলে তারা তাকে মারধর শুরু করে। মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয়। এ কারণে সাধারণ ট্রলারগুলো ভয় পায় সেখানে যেতে।


স্থানীয়রা বলছেন, নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে আশপাশের এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার রাজ রাজেশ্বর ইউনিয়নের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে নদীতে ভেসে গেছে। এমনকি শহরের বেড়িবাঁধ মারাত্মক ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে ইলিশের প্রজনন। জলজ পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হিসাব-নিকাশের বাইরে।


প্রাসাদোপম বাড়ি: চাঁদপুর শহর থেকে লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে একটু দূরেই লক্ষ্মীপুর বাজার। সরু রাস্তার একপাশে প্রস্তাবিত চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড দৃশ্যমান। বামদিকের ঢালে নামতেই প্রাসাদোপম এক বাড়ি। দুই পাশে খোদাই করা বিশাল স্তম্ভের মাঝখানে একটি ফটকের আকারে একটি লোহার গেট রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্য নকশা। দোতলা বাড়ির মূল কাঠামো দুটি বিশাল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপীয় নকশায় তৈরি তরঙ্গায়িত ছাদ। বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরের একপাশে তৈরি হচ্ছে যান্ত্রিক জলের ফোয়ারা ও সুইমিং পুল।


কয়েকজন পথচারী জানান, এখানে কেউ থাকে না। সেলিম চেয়ারম্যান সময়ে সময়ে এসে নির্মাণ কাজ তদারকি করেন। বাড়ির পূর্ব পাশে গাড়ি বারান্দায় একটি র‌্যাব-৪ মডেলের জিপ (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৩-৬৪৬৩) পার্ক করা। কাঁচে লেখা ‘ভয়েস প্রেস’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেলিম চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত সব গাড়িতেই ‘প্রেস’ লেখা রয়েছে। কারণ তিনি একটি স্থানীয় পত্রিকা কিনেছিলেন। ‘ভয়েস টিভি’ নামে তার একটি আইপি টেলিভিশনও রয়েছে।


অঢেল সম্পদ: চাঁদপুর ও ঢাকায় সেলিম চেয়ারম্যানের অঢেল সম্পদের খোঁজ মেলে। লক্ষ্মীপুরে একটি বাজার বসানো হচ্ছে। নাম- ‘সিনেবাজ লিমিটেড মার্কেট’। এরই মধ্যে দোকান বিক্রি ও দখল ভাড়া নেয়া শুরু হয়েছে। সাইনবোর্ডে দেয়া নম্বরে ফোন করা হলে একজন বলেন, এখন শুধু দোকান ভাড়া দেয়া হচ্ছে। সিঙ্গেল দোকানের পজেশন ভাড়া ৩ হাজার ও ডাবল ৫ হাজার। বেশিরভাগই ইতিমধ্যে ভাড়া দেয়া হয়েছে।


এছাড়া চাঁদপুরের কালীবাড়ি মোড়ে কিনেছেন আসলাম ম্যানসন (লাভলী স্টোর), ওয়ান মিনিটের মোড়ে সুভাষ চন্দ্র রায়ের বাড়ি কিনেছেন ৪ কোটি টাকায়। শহরের টাউন হল মার্কেটের ৪, ৫ এবং ৬ তলা লিজ নেয়া হয়েছে। ইচলি চুন ফ্যাক্টরির পাশে মেয়ের নামে কিনেছেন ৭০ শতাংশ মূল্যবান জায়গা। লক্ষ্মীপুর মৃধাবাড়িসংলগ্ন নদীর পাড়ে প্রায় ২শ একর জায়গা ব্লক ফেলে দখল করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার কাকরাইলে আছে ৪ তলা বাড়ি। নারায়ণগঞ্জের ভূঁইগড় এলাকায় ১০ তলা ভবন। সেলিমের হাতে রয়েছে দুটি লাইসেন্সকৃত পিস্তল এবং শটগান।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেলিম খান লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলেও তিনি বেশির ভাগ সময় ঢাকায় থাকেন। রাজধানীর রাস্তায় চলাফেরা করেন গাড়িবহর সহযোগে। কোটি টাকা মূল্যের ল্যান্ডক্রুজার জিপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মডেলের বেশ কিছু গাড়ি রয়েছে তার। বড় ছেলে শান্ত খান, মেয়ে পিংকি ও পুত্রবধূসহ পরিবারের সদস্যরা সবাই বিলাসবহুল প্রাইভেট কার ব্যবহার করেন। গত এক মাস আগে তিনি বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার জিপ কিনেছিলেন। এছাড়া ঢাকার সিনে জগতে বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। তার মালিকানাধীন শাপলা মিডিয়া এখন দেশের সবচেয়ে বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে নির্মিত ছবির সংখ্যা ৭টি। আরও ১০০ ছবি নির্মাণের চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়েছেন সেলিম খান।


জমি কেলেঙ্কারি ফাঁস: স¤প্রতি চাঁদপুরের প্রস্তাবিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণ কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে সেলিম চেয়ারম্যানের নাম। সরকারি টাকা লুটপাটের অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয়। তদন্তের নামে মাঠ প্রশাসন। অন্তত ৬২ একর জমি রয়েছে তার পরিবারের নামে। মৌজা মূল্যের অন্তত ২০ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে এসব জমি সরকারের কাছে বিক্রির চেষ্টা করা হয়।


জানা গেছে, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমি দখলের মহোৎসব চলছে। অস্ত্রের মুখে অগণিত মানুষের জমি-জমা বিলীন হয়েছে। যারা রাজি হয়নি তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। বিনা পয়সায় বা নামমাত্র মূল্যে অনেকেই জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে খোঁজ করতে গিয়ে অনেক ভিকটিম দেখতে পাই। তাদের অনেকেই ভিটা ছাড়া। দখলের শিকার অন্তত ২০ জনের নাম এসেছে । তাদের মধ্যে রয়েছেন সোবহান ভূঁইয়া, নেছার মুন্সী, আজিজ রাড়ি, ইদ্রিস আকন, সেলিম গাজী, হানিফ খান, নুরুল ইসলাম, শাহ আলম খান, মিজান খান, মিলন গাজী, মোস্তফা মুন্সী, করিম পাটোয়ারী, শাহদাত গাজী ও হাবিব মুন্সী। দখলের সময় রাজন খান ও মিজান খানের বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।


জানা গেছে, জমি দখলের শোকে হঠাৎ স্ট্রোকে গুরুতর অসুস্থ হন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। জাহাঙ্গীরের ভাই জাকির হোসেন বলেন, কার কাছে এসব অভিযোগ করব? তিনি (সেলিম চেয়ারম্যান) হাজার হাজার মানুষের জমি হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কেউ মুখ খুলবে না। সেলিমের নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি দলীয় নেতাকর্মীরা। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহবায়ক সফিকুর রহমান গাজী জানান, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একথা শুনে সেলিম খান রেগে যান। তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হয়। একপর্যায়ে নগরীর হাকিম প্লাজার সামনে তার ওপর হামলা হয়। তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। মামলা চলছে। এদিকে জমি কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর সেলিম চেয়ারম্যান গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। ইতিমধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।


দুদকের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, সেলিম খান স¤প্রতি তার সম্পদের বিবরণে মৎস্য চাষের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। সেই তথ্য যাচাই-বাছাই করতেই তাদের তলব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ওই আড়ত মালিকদের হিসাবের যাবতীয় খাতার অনুলিপিসহ হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়। ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেলিম খান ও তার স্ত্রী শাহানারা বেগমের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দিয়েছিল দুদক।


প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেলিম খানের আয়কর বিবরণীসহ বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই শেষে তার পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায় ৩৪ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ও ঋণসহ তার মোট আয় পাওয়া যায় ৬১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। তবে দুদকে তথ্য রয়েছে যে,সেলিম খানের মোট যে সম্পদ রয়েছে তার মূল্য ২০ কোটি ৬৯ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু এ সম্পদের বৈধ কোনো উৎস ও রেকর্ডপত্র নেই।


দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া সেলিম খানের স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে- চাঁদপুর সদর উপজেলায় ৪.২১ একর কৃষি ও অকৃষি জমি, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১০ তলা বাড়ি, ঢাকার কাকরাইলে ৪ তলা একটি বাড়ি ও ঢাকার কাকরাইলের একটি ফ্ল্যাট। এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ১৪০ টাকা।


অন্যদিকে তার দুটি জিপ গাড়ি, চারটি ড্রেজার, একটি শটগান, স্বর্ণালংকার ও আসবাবপত্র রয়েছে; যার মূল্য ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া ব্যবসায়িক মূলধন হিসেবে ২ কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার ২৪৫ টাকাসহ তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ধরা হয়েছে মোট ৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ৮৪৫ টাকা।


এছাড়া তিনি ‘শাহেনশাহ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ‘প্রেম চোর’ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণে ২ কোটি ৭ লাখ টাকাসহ ৬ থেকে ৭টি সিনেমা নির্মাণে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন বলে বিভিন্ন নথিপত্রে উঠে এসেছে। এরও কোনো বৈধ উৎস এখনো পাননি দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা।


এ ব্যাপারে চেয়ারম্যান সেলিম খান বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। তিনি বলেন, আয়কর ফাইলে তার সব সম্পদ দেখানো হয়েছে। তিনি পরপর দুবার চাঁদপুরে সেরা করদাতার পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি বৈধ ব্যবসা করেন। তিনি আরো বলেন, তার বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ জমি বিক্রেতা শারীরিকভাবে রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত থাকে। যারা স্বেচ্ছায় জমি রেজিস্ট্রি দিয়েছেন তাদের দখল নিয়ে অভিযোগ করা ঠিক হবে না। ড্রেজিং ও বালু সন্ত্রাসের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী তিনি প্রায় ৩১ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করতে পারবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বরাদ্দের চেয়ে অনেক কম বালু তুলে নিচ্ছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগ খন্ড করে সেলিম বলেন, বাংলাদেশের কোথাও মৌজা দামে জমি বিক্রি হয় না। কারণ ২০১৫ সাল থেকে মৌজার দাম বাড়েনি। এরপরও বিষয়টি আদালতে তোলা হয়। এ বিষয়ে তিনি হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত নেবেন।


বিআইডব্লিউটিএর চাঁদপর জেলার উপপরিচালক কায়সারুল ইসলাম বলেন, কেবল চাঁদপুরেই নয়, যেকোনো নদ-নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হলে পাশের শহর হুমকির মধ্যে পড়বে।


নদ-নদী থেকে বালু তোলার কাজে বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে ড্রেজার ব্যবহার করে, সেটি বোমা ড্রেজার নামে পরিচিত। এর দাপ্তরিক নাম সাকশন ড্রেজার। এই ড্রেজারের মাধ্যমে নিয়ম মেনে কখনোই মাটি ও বালু তোলা হয় না বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ের ড্রেজিং শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা বলেন, বোমা ড্রেজার দিয়ে পানির তলদেশ থেকে একটি জায়গা থেকে ৭০-৮০ ফুট গভীর পর্যন্ত বালু তোলা হয়। এতে আশপাশের জায়গা ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে এটি তীরে গিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি করে।


এভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশকে হুমকির মধ্যে ফেলে বালু উত্তোলন কি চলতে থাকবে, জানতে চাইলে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, ‘আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দেখেছি, সেলিম খানকে ডুবোচর থেকে বালু তোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বালু বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়নি। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার বালু তোলার প্রক্রিয়াটিও আইনানুগ হচ্ছে না। বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও ভূমি মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হবে।’


দুদক’র সচিব মাহবুব হোসেন বলেন, প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে চাঁদপুরে অভিযান পরিচালনা করে দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম। অভিযানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে সরকার নির্ধারিত মৌজা মূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দাম দেখানো হয়। এর মাধ্যমে ১৩৯টি উচ্চমূল্যের দলিল কারসাজির মাধ্যমে সরকারের ৩৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে জেলা প্রশাসনে জমির দামে ফারাকের বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় তা করা সম্ভব হয়নি।


শিক্ষামন্ত্রীর পরিবারের কেউ এতে জড়িত কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন। আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের নাম চলে আসবে। এখানে গোপন করার কিছু নেই। তদন্তে উদ্ঘাটিত হবে কারা জড়িত।’


 

আরো পড়ুন