শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
থামছে না চলন্ত বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ
মেহ্দী আজাদ মাসুম (প্রিন্ট সংস্করণ)
০৫ আগস্ট, ২০২২ ১৫:৪৬:২৫
প্রিন্টঅ-অ+

সড়ক-মহাসড়কে রাতের যাত্রীরা এখন অনিরাপদ! যারা দিবেন নিরাপত্তা তাদের রয়েছে চরম অবহেলা। উদাসিনতা রয়েছে মালিক-কর্তৃপক্ষেরও। আর এ কারণেই চলন্ত বাসে ঘটছে  ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা। হত্যার শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীকে। পৈশাচিক এমনসব ঘটনার পর তৎপর হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ধরা পড়ে অপরাধে সংশ্লিষ্ট পিশাচরা। সাজাও দিচ্ছেন আদালত। তবুও থামছে না চলন্ত পরিবহনে ডাকাতি-ধর্ষণের ঘটনা। গত মঙ্গলবার রাতেও কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাসে ঘটেছে লোমহর্ষক ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। তৎপর হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা রোধে ‘প্যানিক বাটন’ বসানোর কথা থাকলেও সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে পুলিশ। খরচ বহনে মালিক-কর্তৃপক্ষের অপরাগতায় এ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বিশিষ্টজনরা বলছেন, বাসে ডাকাতি, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দায় হাইওয়ে পুলিশ ও পরিবহন মালিকরা এড়াতে পারেন না। তাদের অবহেলা ও উদাসিনতায় ঘটছে এমন পৈশাচিক ঘটনা।


যাত্রীদের জিম্মি করে বাসে ডাকাতি-ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাসে থাকা নারী যাত্রীরা হচ্ছেন ধর্ষণের শিকার। কোথাও কোথাও এসব লোমহর্ষক ঘটনায় যাত্রীদের সাথে বাস চালক-হেলপারকেও  জিম্মি করা হচ্ছে। আবার কোথাও চালক-হেলপারই পৈশাচিক ঘটনার নায়ক। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে চলন্তবাসে ধর্ষণের ৩টি ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতেও কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাসে লোমহর্ষক ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হওয়ার পর মাঠে নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়। 


এর আগে ৩১ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তে এক বাসচালকের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধী এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় চালকের সহকারীকে। এরপর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই নারীকে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ঘটনা প্রসঙ্গে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছার পর ওই নারীকে একা পেয়ে চালক আলম খন্দকার ধর্ষণ করে। এ সময় নাজমুল বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে পাহারা দেয়।


গত ২৬ জুলাই টাঙ্গাইলের মির্জাপুর মহাসড়কের বাওয়ার কুমারজানি এলাকায় চলন্ত বাসে শিউলী আক্তার (২৬) নামের এক নারী গার্মেন্টসকর্মীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করার পর পুলিশ ৩ জনকে আটক করে। তারা সবাই ধর্ষণ এবং হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলো।


এর আগে ৮ এপ্রিল ধামরাইয়ে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হন এক নারী শ্রমিক। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে পুলিশ ৫ জনকে আটক করে। আটককৃতরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওই পোশাক শ্রমিককে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে গাজীপুর যাওয়ার পথে বাস চালক ও দুই সহকারী বাসের মধ্যে হাত-পা ও মুখ বেঁধে এক নারীকে ধর্ষণ করে। গত বছরের ২৫ অগাস্ট রাতে বাসে করে সিরাজগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে বাস চালক ও হেলপারের হাতে ধর্ষণের পর খুন হন সিরাজগঞ্জের তাড়াশের জাকিয়া সুলতানা রুপা। ওই রাতে টাঙ্গাইলের মধুপুর থানা পুলিশ ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের পঁচিশ মাইল এলাকায় রাস্তার পাশ থেকে রুপার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় চারজনের ফাঁসির আদেশ ও একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। বরিশালে চলন্ত বাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রী ও শ্যালিকাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে ৬ পরিবহন শ্রমিক। ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি রাতে এ ঘটনা ঘটলেও লোক-লজ্জার ভয়ে আর নানা সামাজিক চাপের কারণে ভুক্তভোগীরা প্রথমে মামলা করেনি। পরে ঐ বছরের ১৬ মার্চ মামলা দয়ের করা হয়।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন কর্মকর্তা আমার বার্তাকে জানান, পরিবহনে   ডাকাতি রোধে ‘প্যানিক বাটন’ বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও তা সম্প্রতি বাতিল করা হয়েছে। এই প্যানিক বাটন বসানো সম্ভব হলে অপরাধ সংঘটনের সময় এতে চাপ দিলেই বার্তা পৌঁছে যাবে জরুরি সেবা ৯৯৯, স্থানীয় থানা ও পরিবহন মালিক বা ম্যানেজারের কাছে। সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়ে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, প্যানিক বাটন চালাতে যে খরচ হবে, তা দিতে রাজি হয়নি মালিকপক্ষ। যে কারণে এ পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।


টাঙ্গাইলের পৈশাচিক ঘটনায় ক্ষোভ সর্বত্র: গত ২ আগষ্ট রাতে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাসে লোমহর্ষক ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ঘটনা জানাজানির পরই তৎপর হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গতকাল বৃহস্পতিবার একজনকে আটক করা হয়েছে। মহাসড়কে বাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করে আড়াই ঘন্টাব্যাপি বিভিন্ন সড়কে ঘুরে লুটপাট ও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় চলছে দেশজুড়ে। এ ঘটনায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ডাকাতরা আড়াই ঘণ্টা ধরে পৈশাচিক ঘটনা ঘটালেও হাইওয়ে পুলিশ কিংবা থানা পুলিশের নজরে না আসার বিষয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল ও বাস মালিকরা।


টাঙ্গাইল শহরের বাসিন্দা কলেজশিক্ষক মো. আবু তাহের আমার বার্তাকে বলেন, ‘এর আগে কলেজশিক্ষার্থী রূপাকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করেছিল পরিবহনশ্রমিকরা। বাসেই তাকে হত্যার পর লাশ বনে ফেলে রেখে যায় তারা। একই ঘটনা ঘটেছে মঙ্গলবার রাতেও। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল ও চেকপোস্ট না থাকায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে পুলিশের জোরালো কোনও পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়ছে না। ফলে যাত্রীদের উদ্বেগ বাড়ছে।’


টাঙ্গাইল শহরের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন আমার বার্তাকে বলেন, ‘আগে মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল ও চেকপোস্ট চোখে পড়তো। এখন টহল ও চেকপোস্ট কোথাও নেই। মহাসড়কের যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়। ফলে যাত্রী সেজে ডাকাতরা বাসে উঠে ডাকাতি ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়। মহাসড়কে বাস থামিয়ে যাত্রী তুললেও হাইওয়ে পুলিশ পরিবহন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। আবার অধিকাংশ ঘটনা পরিবহন শ্রমিকদের যোগসাজশে হচ্ছে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’


ঈগল এক্সপ্রেসের পরিচালক সোলাইমান হক আমার বার্তাকে বলেন, ‘ডাকাতরা বাসটির চালকসহ যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হাত-পা, মুখ ও চোখ বেঁধে ফেলে। এরপর সবার টাকা-পয়সা ও মালামাল লুট করে নেয়। ঘটনার পর থেকে বাসের চালকসহ তিন স্টাফ পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘আগে নিয়মিত মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হতো। কিন্তু এখন চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে না। সড়কে চেকপোস্ট থাকলে এমন ঘটনা ঘটতো না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিল হাইওয়ে পুলিশের।’


বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সংস্থাটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ আমার বার্তাকে বলেন, ‘যাত্রীবাহী বাসে এ ধরনের ঘটনা ন্যক্কারজনক। যাত্রীরা এমন ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট বসানো জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’


এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার মোহাম্মদ কায়সার আমার বার্তাকে বলেন, ‘বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করে পুলিশ। রাতে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে যাত্রীদের তিনটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’ বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে বলেও জানা তিনি।

আরো পড়ুন