শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
তুরাগে নার্সারির প্লট বরাদ্দেই সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়েছে একটি চক্র
মিজানুর রহমান, উত্তরা (প্রিন্ট সংস্করণ)
০৫ আগস্ট, ২০২২ ১৫:৫২:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(রাজউক) উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের তুরাগ থানা এলাকায় কয়েকশ প্লটে গড়ে উঠেছে অবৈধ নার্সারি। এসব নার্সারি ব্যবসার আড়ালে চলে রমরমা মাদক ও দেহ ব্যবসা। দখল বাণিজ্যসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে নার্সরিগুলোর বিরুদ্ধে। শুধুমাত্র এসব নার্সারির প্লটের বরাদ্দতেই সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়েছে একটি চক্র। এর বাইরে মাসে ভাড়া হিসেবে উঠে প্রায় ৬ লাখ টাকা।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের তুরাগ থানা এলাকায় ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ নাম্বার সেক্টর জুড়ে বিশাল বিস্তৃত এলাকায় তিন শতাধিক খালি প্লটজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ নার্সারি পট্টি। এসব নার্সারি মালিকদের দাবি রাজউকের খালি প্লটগুলোর দখল নিতেই তাদের প্লট প্রতি দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকা করে দিতে হয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের।


রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতায় প্রভাবশালী চক্রের সহায়তায় গড়ে ওঠা এসব নার্সারির ভিতরে রয়েছে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। এগুলোতে দিনের আলো পেরিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই শুরু হয় মাদক সেবন, বেচাকেনা ও দেহ ব্যাবসা। স্থানীয়দের দাবি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে এই সকল অবৈধ কর্মকাণ্ড। সার্বক্ষণিক পেট্রোল ডিউটি থাকা এই এলাকায় এসে তুরাগ থানার পুলিশ যেন দেখে ও দেখেনা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পুলিশ নিয়মিত মাসোহারা নেয় তাই তারা কোন ব্যাবস্থা নেয় না বরং অপরাধীদেরকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। দ্রুত এসব অপরাধ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয় সচেতন বাসিন্দার।


জানা গেছে, প্রতিটি প্লটে নার্সারি করতে কথিত দখলদার মালিককে এককালীন দেড়লাখ টাকা থেকে এক লাখ ৮০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। এর বাইরে প্লটের আকার ভেদে মাসিক ১৫শ টাকা থেকে ২৫শ টাকা দিতে হয় বলে জানিয়েছেন নার্সারি মালিক সিরাজ, জাকির, মানিক, মোল্লা, ফয়সাল আনোয়ারসহ আরো অনেক নার্সারী মালিক। সমীকরণে দেখা যায় প্লট প্রতি দেড় লাখ হিসেবে ৩শ প্লট থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। এছাড়া মাসে এসব প্লট থেকে মাসিক ভাড়া বাবদ ওঠানো হয় আরো প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা। এসব টাকা বাটোয়ারা হয় স্থানীয় প্রশাসন, রাজউক কর্মকর্তা, ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক নেতা ও লাইনম্যানদের মাঝে।


মাসিক ২ হাজার টাকা করে হলে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা নার্সারিতে উঠে এই টাকা কে নেয় কারা এর ভাগ পায় জানতে চাইলে সিরাজ ও ফয়সাল জানান, রাজউকের ড্রাইভার মহসিন, রবিনসহ অনেকেই জড়িত। তারা নিয়মিত মান্থি (মাসিক ভাড়া) নিয়ে থাকে। টহল পুলিশ থানা এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কিছু অসাধু লোকও জড়িত বলে জানিয়েছেন তারা। সিরাজ বলেন, নজরুল মোল্লার নেতৃত্বে ফয়সাল, আনোয়ার টাকা পয়সা তুলে ভাগাভাগি করে নেন। তবে ফয়সাল জানিয়েছেন, নজরুল মোল্লাই হল মেইন। তার সহযোগী আনোয়ার। শুধু তাই নয় প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসে এই এলাকায় এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নার্সারির ভিতরে গড়ে উঠা ঝুপড়ি ঘরগুলোতে সন্ধ্যার পর শুরু হয় যত অনৈতিক কর্মকাণ্ড। মাদক ও দেহ ব্যবসার মত ঘটনাও চলেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।


মিরপুর ডিওএইচএস থেকে স্বপরিবারে ঘুরতে আসা আসাদুল করিম এই প্রতিবেদককে জানান, স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে এসে রীতিমতো হেনস্থার শিকার হয়েছেন তিনি। আশপাশের কোথায় পাবলিক টয়লেট না থাকায় একটি নার্সারীতে যান তার স্ত্রী। সেখানে যাওয়ার পর বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন তার স্ত্রী। পরবর্তীতে তিনি এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয় অনৈতিক কাজে যুক্ত কয়েকজন। পরে সেখান থেকে কোনমতে পালিয়ে বাঁচেন এই দম্পতি।


পাশ্ববর্তী চন্ডলভোগ এলাকার কামাল বলেন, আমরা গরু ছাগল আনতে গেলে আপত্তিকর অনেক কিছুই দেখতে পাই। স্থানীয়রা কেন কিছু বলেনা এমন প্রশ্নের  উত্তরে তিনি বলেন, ভাই তাদের বিশাল সিন্ডিকেট, বলে কি বিপদে পড়বো নাকি বলেন? আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও যেন দেখেও দেখেনা। 


লাইনম্যান হিসেবে রাজউকের গাড়ি চালক রবিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখন এ সম্পর্কে জানি না। ঈদের পর থেকে আমি আর মাঠে নেই। তাহলে ঈদের আগে আপনি কিভাবে জড়িত ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কিছু বলতে পারবো না। আপনি প্রমাণ নিয়ে আমার সামনে আসেন। অভিযুক্ত গাড়ি চালক মহসিনও কথা বলেছেন একই সুরে। তিনি এখন মাসোহারা তোলার কাজ কে করেন সে প্রশ্ন এড়িয়ে বলেন, এখন কে কিভাবে করে তা জানি না। তবে আমি কখনই এসব কাজে জড়িত ছিলাম না।


নার্সারি মালিক সিরাজ জানান, তিনি ৩ টি প্লট দখলে নিয়ে তার নার্সারি দিয়েছেন। প্রতিটি প্লট দখল হস্তান্তর করতে দেড় লাখ টাকা করে দিয়েছেন সিন্ডিকেটকে। এইভাবে অনেকেই একাধিক প্লটের দখলে আছে বলে জানান তিনি।


রাজউকের প্রকৌশলী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার হাফিজের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার বার্তাকে বলেন, আমরা মাঝে-মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে থাকি। কিন্তু অভিযান শেষে পুনরায় দখল হয়ে যায়। বর্তমানেও ভাঙ্গার আদেশ আমার হাতে রয়েছে দ্রুতই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি। তবে রাজউকের কারো জড়িত থাকার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।


এ বিষয়ে তুরাগ থানার ওসি মেহেদী হাসানকে মুঠোফোনে জানতে চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাহা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির উত্তরা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোঃ মোর্শেদ আলমের সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, আমাকে এ ধরনের দু’একটা ফুটেজসহ প্রমানাদি উপস্থাপন করলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

আরো পড়ুন