শিরোনাম :

  • রাজধানীতে ট্রাকের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারীসহ ১০ ডাকাত গ্রেফতার
নগর প্রতিবেদক, তেজগাঁও
০৮ আগস্ট, ২০২২ ১৪:৫৭:৫৭
প্রিন্টঅ-অ+

বহুল আলোচিত টাঙ্গাইলের মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেনসহ ডাকাত চক্রের ১০ জন  সদস্যকে ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।


সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে র‌্যাব জানায়, র‌্যাব সদর দপ্তর গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১২ ও র‌্যাব-১৪ এর আভিযানিক দল গতকাল বিকেল হতে রাত পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে সংঘবদ্ধ দুর্ধর্ষ ডাকাত চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী মোঃ রতন হোসেন (২১)কে গ্রেফতার করে। রতন টাঙ্গাইলের মধুপুরস্থ মজিবুর রহমানের সন্তান। এ সময় তার সহযোগী মোঃ আলাউদ্দিন (২৪), পিতাঃ মোঃ সাদেক মিয়া, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মোঃ সোহাগ মন্ডল (২০), পিতাঃ শামসুল মন্ডল, মেলান্দহ, জামালপুর, খন্দকার মোঃ হাসমত আলী ওরফে দীপু (২৩), পিতাঃ মোঃ সোলায়মান খন্দকার, সরিষাবাড়ি, জামালপুর, মোঃ বাবু হোসেন ওরফে জুলহাস (২১), পিতাঃ মোঃ জামির হোসেন, আশুলিয়া, ঢাকা, মোঃ জীবন (২১), পিতাঃ মৃত জাবেদ, নীলফামারী সদর, নীলফামারী, মোঃ আব্দুল মান্নান (২২), পিতাঃ মোঃ খলিল, মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি, মোঃ নাঈম সরকার (১৯), পিতাঃ মোঃ মমিন সরকার, কাশেমপুর, গাজীপুর, রাসেল তালুকদার (৩২), পিতাঃ মোঃ আবুল তালুকদার, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ এবং মোঃ আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হান (১৮), পিতাঃ মৃত আবুল তালকুদার, কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি মোবাইল, ০২টি রূপার চুড়ি, ১৪টি সীমকার্ড ও ডাকাতিতে ব্যবহৃত ০১টি দেশিয় অস্ত্র (ক্ষুর)। 


প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, রতন মিয়া ওই বাস ডাকাতির ৩ দিন আগে তার সহযোগী ডাকাত রাজা মিয়াকে বাস ডাকাতির প্রস্তাব দিলে রাজা মিয়া দলের অন্যান্য ডাকাতদের সংঘটিত করার কথা বলে। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃত রতন, মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানায় এবং ডাকাত মান্নান তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিনকে  নিয়ে ডাকাতিতে যোগ দেয়। উক্ত ডাকাতিতে রতনের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন ডাকাত অংশ নেয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রতনের নেতৃত্বে গত ২ আগস্ট ২০২২ তারিখ, দুপুরবেলা গাজীপুরের জিরানী বাজার এলকায় সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। মূল পরিকল্পনাকারী রতন উক্ত ডাকাতি কাজে যাবতীয় প্রস্তুতির আর্থিক খরচাদি বহন করে। চক্রের সদস্যদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে প্রত্যেকের কাজ বুঝিয়ে দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রতন ডাকাত ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ২টি ধারালো কাঁচি ও ০১টি ক্ষুর সংগ্রহ করে।


এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ডাকাতির রাতে ডাকাত রাজাসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় পৌছালে ডাকাত রাজা বাসটিকে থামার সংকেত দেয় এবং যাত্রীবেশে প্রথমে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহন বাসটিতে উঠে। পরবর্তীতে আরো দুই দফায় ডাকাতচক্রের অন্য সদস্যরা বাসটিতে যাত্রীবেশে আরোহন করে। বাসটিতে ২৪ জন সাধারণ যাত্রী থাকায় ডাকাত চক্রের অধিকাংশ সদস্য বাসের পিছনের দিকে বসে। বাসটি বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা অতিক্রম করছে গ্রেফতারকৃত রতন ডাকাত দলের সদস্যদেরকে চাকু ও ধারালো কাঁচি প্রদান করে। আউয়াল ডাকাত ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যায় এবং অন্যান্যদের ইশারা প্রদান করলে রাজা, রতন, মান্নান ও নূরনবী ড্রাইভিং সীটের কাছে গিয়ে ড্রাইভারকে মারধর করে এবং ডাকাত রতন বাসের ড্রাইভিং সীটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক ও সুপারভাইজার, হেলপারসহ অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদেরকে হাত মুখ বেঁধে সীট কভার দিয়ে মুখে মুখোশ পড়িয়ে মুখমন্ডল ঢেকে দেয় এবং যাত্রীদের সাথে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে এবং শ্লীলতাহানী ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের হাটুভাঙ্গা মোড় হয়ে মধুপুরে যাওয়ার পথে মধুপুরের রক্তিপড়া এলাকায় গ্রেফতারকৃত রতন গাড়ি চালনার সময় লুটকৃত মালামাল নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে বাক-বিতন্ডার কারণে রতন পিছনে তাকালে বাসটি রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুটি ও বালুর সাথে বাসের সংঘর্ষ হলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ে। তৎক্ষনাৎ ডাকাতদলের সবাই লুটকৃত মালামালসহ বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়।


পরবর্তীতে বাসে করে ডাকাত চক্রের সদস্যরা টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় যায় এবং অটোরিক্সাযোগে মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের নিকটাত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে লুন্ঠিত মালামাল নিজেদের মধ্যে বন্টন করে। তারপর ডাকাত রতন গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। গ্রেফতারকৃত মান্নান, আলাউদ্দিন ও বাবু পৃথকভাবে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত আসলাম, নাঈম, রাসেল প্রথমে নিজের এলাকায় ও পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত জীবন কোনাবাড়ীতে আত্মগোপন করে। ডাকাত দীপু প্রথমে টাঙ্গাইলের পিরোজপুর গ্রামে ও পরবর্তীতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত সোহাগ প্রথমে জিরানী বাজার ও পরবর্তীতে জামালপুর জেলায় এবং পুনরায় জিরানী বাজারে আত্মগোপন করে।


জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত রতন হোসেন ওই ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। সে পেশায় গাড়ীর হেলপার তার বিরুদ্ধে পূর্বেও ডাকাতির অভিযোগ আছে। গ্রেফতারকৃত রতন ২০১৮ সালে গ্রেফতারকৃত নূরনবী, জীবন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে রোডব্লক করে সাভার পরিবহনের একটি বাস ডাকাতি করে। ঐ বাস ডাকাতির ঘটনায় রতন গ্রেফতার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে ২০২০ সালে পুনরায় গ্রেফতারকৃত নূরনবী, জীবন ও আউয়ালকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিক্সা ছিনতাই করে। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা জীবনকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। উক্ত ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার হয়ে রতন প্রায় ১ বছর কারাভোগ করে। কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে সে তার সিন্ডিকেট নিয়ে সাভার, গাজীপুর বা সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে আরো বেশ কয়েকটি ডাকাতি করে।


গ্রেফতারকৃত জীবন পেশায় গাড়ির হেলপার। হেলপার পেশার আড়ালে সে বেশ কয়েকটি পরিবহন ডাকাতিতে অংশগ্রহণ করে। বর্ণিত ডাকাতিতে সে যাত্রীদের মালামাল লুটের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ইতোপূর্বে সে ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুটি ডাকাতির মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে। 


গ্রেফতারকৃত মান্নান গাজীপুরের একটি গার্মেন্টস এ চাকুরী করত। সে ২০১৯ সালে আশুলিয়া থানায় একটি চুরির মামলায় কারাভোগ করেছে বলে জানা যায়। তার নেতৃত্বে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন গার্মেন্টসে চাকুরীরত গ্রেফতারকৃত আলাউদ্দিন, সোহাগ, বাবু, দীপু, রাসেল, রায়হান, নাঈম উক্ত ডাকাতিতে অংশগ্রহণ করে। 


গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।


গত ২ আগস্ট তারিখ দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস টাঙ্গাইল অতিক্রম করার সময় ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। উক্ত ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় এক যাত্রী বাদি হয়ে মধুপুর থানায় অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করে যার মামলা নং -০৩, তারিখ ০৩ আগস্ট ২০২২। ডাকাতি ও একই সাথে ধর্ষণের ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। ফলশ্রুতিতে র‌্যাব জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। 


উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কে আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব। গত ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ রংপুর জেলার পীরগঞ্জ এলাকায় হানিফ পরিবহনের চালক হত্যাসহ বাস ডাকাতির ঘটনায় আন্তঃজেলা বাস ডাকাত চক্রের মুলহোতাসহ ০৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এছাড়াও গত ০৪ জুন ২০২২ তারিখ ডাকাতির প্রস্তুতিকালীন সময়ে দুর্ধর্ষ আন্তঃজেলা ডাকাতচক্র ‘ঠান্ডা-শামীম বাহিনী’র ডাকাত সর্দারসহ ১১ জন এবং ১২ জুন ২০২২ তারিখ আশুলিয়ায় হানিফ পরিবহন ও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে স্টার লাইন পরিবহনের বাসে ডাকাতিসহ বিভিন্ন সময়ে দূরপাল্লার বাসে ডাকাতির সাথে জড়িত দুর্ধর্ষ আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের ১০ সদস্যকে দেশি ও বিদেশি অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করেছে র‌্যাব।

আরো পড়ুন