শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ঈদ-অর্থনীতির আকার হবে দেড় লাখ কোটি টাকার
৩০ এপ্রিল, ২০২২ ১০:৩১:৫৫
প্রিন্টঅ-অ+

কেনাকাটার ধুম পড়েছে দোকানপাট-মার্কেট আর শপিংমলে। ফুটপাতেও জমজমাট বেচাকেনা। ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি পেয়েছে নতুন গতি। সংশ্লিষ্টদের আশা, এবারের ঈদ-অর্থনীতির আকার হবে দেড় লাখ কোটি টাকা। 


করোনার কারণে গেল দু’বছরের ঈদ ছিল পানসে, আনন্দহীন। প্রত্যাশিত কেনাকাটা না হওয়ায় স্থবির ছিল ঈদ কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য।  


তবে করোনার প্রকোপ কমায় এবারের চিত্র ভিন্ন। ব্যবসায়িক কর্মকাÐ স্বাভাবিক হওয়ায় গতিশীল হয়েছে সার্বিক অর্থনীতি। বেড়েছে মানুষের ক্রমক্ষমতা। কেনাকাটায় উৎসবমুখর দোকানপাট, মার্কেট ও শপিংমল।


বিক্রেতারা বলছেন, গেল চার মাসে যা ক্রেতা পেয়েছেন তারচেয়ে অনেক বেশি পেয়েছেন এই ঈদের আগ দিয়ে। 


এফবিসিসিআই বলছে, এবারের ঈদ-অর্থনীতির আকার হবে কমপক্ষে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে পোশাকেই ব্যয় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া জুতা-কসমেটিকস-ভোগ্যপণ্যে-ইলেকট্রনিক্স-জুয়েলারি-পর্যটন ও যাতায়াতে ভোক্তারা খরচ করবেন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিপুল অর্থ যাবে যাকাত-ফিতরায়।  


বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “এক কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে যাবে, এ সময় পরিবহন খাতের ব্যাপক প্রভাব ফেলে, এছাড়া যে পরিমাণ যাকাত-ফেতরা দেয়া হয়। এই সবকিছু মিলে এক লক্ষ পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন হাজার কোটি টাকার একটা বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাÐ।”


এদিকে বায়তুল মোকাররম ব্যাবসায়ী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায় বলেন, গত দুই বছরের থেকে এবারে ভালো বাজার হবে এই প্রত্যাশা আমরা রাখি। এই ধাপে আমরা ভালো রাজস্ব সরকারকেও দিতে পারবো।


করোনার ক্ষতি পোষাতে ব্যবসায়ীদের জন্য এবারের ঈদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।


বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সহ-সভাপতি এবং ঢাকা চেম্বার অফ কমার্সের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, বাজেটের ঠিক পূর্বে আমরা এই যদি আমরা এই ইকোনোমিটাকে স্টিমুলেট করতে পারি তাহলে কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক রিকভারিতে প্রভাব ফেলবে।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে ভোক্তাদের বাড়তি ব্যয় আরো চাঙ্গা করবে দেশের অর্থনীতিকে।


এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মনজুর হোসেন বলেন, সারাবছর যা ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে নেয়া যায় এই সময়।


ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে ফেরে লাখো মানুষ। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়ে ইতিবাচক প্রভাব।


স্থানীয় ফ্যাশনের বাজারে ৭৫ শতাংশই বিক্রি হয় ঈদের বাজারে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। করোনার কারণে গত দুই বছর এর অর্ধেক বেচাবিক্রিও করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে রোজার আগে থেকে ক্রেতাদের প্রচুর ভিড় দেখছেন তারা। করোনার কারণে গত দুই বছর যেসব কাস্টমার পোশাক-জুতা, অলঙ্কার কিনতে পারেননি তারাও ভিড় করছেন মার্কেটগুলোতে। গত দুই বছরে ঈদ-উল-ফিতরের উৎসবে করোনার কারণে ফ্যাশন হাউসগুলোর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এবার পরিবেশ খুব ভাল। এখন পর্যন্ত বিক্রির অবস্থা বলছে এবার আমরা লোকসান করব না। সারাদেশে বিক্রীত স্থানীয় পোশাকের ৭০-৮০ শতাংশের জোগান দেয় ঢাকার কেরানীগঞ্জসহ বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকার উৎপাদকরা। নি¤œ ও মধ্যবিত্তের পোশাক উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ীদের উৎপাদিত পোশাকের ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদ-উল-ফিতরে।


ঈদ উপলক্ষে জুতার বাজারে এখন জমজমাট কেনাকাটা চলছে। ঈদ সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের জুতাশিল্প। গত দুই বছরের তুলনায় এবার বেশি জুতা বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশের বড় ব্র্যান্ডগুলো। এছাড়া আমদানি করা এবং স্থানীয় জুতার খুচরা বিক্রেতারাও আশানুরূপ বিক্রির কথা শুনিয়েছেন। সব মিলিয়ে জুতাশিল্প করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদ মৌসুমে তারা যে পরিমাণ জুতা বিক্রির লক্ষ্য ঠিক করেছেন, ইতোমধ্যে তার অর্ধেকের বেশি হয়ে গেছে। আর করোনার আগের বছর ২০১৯ সালের চেয়ে এখন পর্যন্ত বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি। সাধারণত রোজার ঈদে সবচেয়ে বেশি জুতা বিক্রি হয় চাঁদ রাতে (ঈদের আগের রাত)। সেই হিসাবে এবারের ঈদে জুতা বিক্রির লক্ষ্য পূরণ হবে বলে আশা করছেন তারা। গত ১০ বছরের মধ্যে যেকোন ঈদের তুলনায় এবারই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতার ব্র্যান্ড এ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ফিরোজ মোহাম্মদ বলেন, এখন পর্যন্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। আর ২০১৯ সালের তুলনায় এখন ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আছে। এভাবে বিক্রি হতে থাকলে তাদেরও লক্ষ্য পূরণ হবে। জুতার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে জুতার বাজারের আকার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ব্র্যান্ডের জুতা বিক্রি হয় ২৫ শতাংশ বা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, আর নতুন ব্র্যান্ডের জুতার হিস্যা ৭৫ শতাংশ বা ৯ হাজার কোটি টাকা। স্থানীয়ভাবে তৈরি জুতার পাশাপাশি পাইকারি বাজারে চীনসহ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা জুতাও বিক্রি হয়। এসব জুতা খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের মাধ্যমে সারাদেশে চলে যায়। এ ছাড়া এ্যাপেক্স, বাটাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জুতার একটা অংশও পাইকারি বাজারের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।


ঈদ সামনে রাখে প্রবাসীরা আপন আত্মীয়-স্বজনের কাছে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। এর পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী খাতের চাকরিজীবীরা হাজার হাজার কোটি টাকার বোনাস পেয়েছেন। এছাড়া ঈদ কেনাকাটায় যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত তহবিল এবং সাধারণ সঞ্চয়। সবমিলিয়ে লাখ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য ও লেনদেন হবে ঈদ বাজারে। ইতোমধ্যে ঈদ-উল-ফিতরকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠাচ্ছেন দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীরা। এতে ব্যাংকের রিজার্ভে এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার জোয়ার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি এপ্রিল মাসের ২১ দিনে রেমিটেন্স এসেছে ১৪০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ২০ পয়সা) এ অর্থের পরিমাণ ১২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এতে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ কোটি টাকার মতো রেমিটেন্স দেশে আসছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি মাসের শেষে আয়ের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা। রেমিটেন্সের এই অর্থের সিংহভাগ ঈদ বাজারে ব্যয় করা হবে। কোন কোন বিক্রেতা বলছেন, ২০১৯ সালের ঈদ-উল-ফিতরের তুলনায় এবার বিক্রি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ। কোন কোন বিক্রেতা বিক্রির শতাংশিক প্রবৃদ্ধি জানাতে না পারলেও বিক্রি যে বেড়েছে তা জানিয়েছেন অকপটে। তবে বেশিরভাগ বিক্রেতার প্রত্যাশা ঈদের কেনাবেচায় এবার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে। আর ক্রেতারাও বলছেন, এবার তারা কেনাবেচায় কোন কার্পণ্য করছেন না। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা পরিবারের সবার জন্যই ঈদের কেনাকাটা করছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই কেনাকাটা শেষ করে ফেলেছেন। মার্কেটে মার্কেটে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা।

আরো পড়ুন