শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে কবে ইমরান হোসাইন ইমন
৩১ জানুয়ারি, ২০২২ ১১:১৮:০৯
প্রিন্টঅ-অ+

আজকাল প্রশ্নপত্র ফাঁস শব্দটি যেন বাংলাদেশের অশিক্ষিত মানুষের কাছে ও সুপরিচিত শব্দে পরিণত হয়েছে । এদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সামাপনী, নি¤œ-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি এবং চাকরির পরীক্ষাসহ সব পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায় । 


বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস অতিসাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর গণমাধ্যমের শিরোনামে স্থান দখল করে নিছে পূর্বে একাডেমিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলে ও এখন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যাছে।


স¤প্রতি প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ে অডিটর নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান, একজন সাবেক সেনা সদস্য, আরেকজন রেলওয়ে কর্মকর্তা। স্বয়ং একজন জনপ্রতিনিধি , এমন রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাÐের সাথে জড়িত থাকার খবর চারিদিকে প্রচারিত হওয়ার সাথে-সাথেই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একই সাথে তিনি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত থাকায়, আওয়ামীলীগের সৎ এবং ত্যাগী নেতাকর্মীরা ও বিব্রোতবোধ করছেন।


প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা শুধুমাত্র অডিটর নিয়োগ পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত বছর নভেম্বর মাসে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন পাঁচটি সরকারি ব্যাংকের 'অফিসার ক্যাশ’ পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে, পরীক্ষাটি বাতিল করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে ও ব্যাপক প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল ।


পাঁচটি সরকারি ব্যাংকের ‘অফিসার ক্যাশ’ পদে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে , আহ্ছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির একাধিক কর্মচারীকে গ্রেফতার ও  জিজ্ঞাবাদে বুয়েটের একজন অধ্যাপকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গিয়েছিল। তথ্যনুযায়ী, বিগত ৬ বছরে বুয়েটের এই অধ্যাপকের ব্যাংক হিসাবে ১০ কোটি টাকার লেনদেনের পেয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দেশের সর্বোচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকের দ্বারা এ ধরনের জঘন্য কর্মকাÐ দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং একই সাথে দুঃখজনক ঘটনা! 


তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, অডিটর নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা পূর্বেও বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত ছিলেন এবং একাধিকবার গ্রেফতার ও হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হছে , তাদের নামে একাধিক মামলা থাকা সত্তে¡ও , কেন তারা একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাছেন?


অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন অপরাধী তার অপরাধের পূর্বপরিকল্পনায়, অপরাধের ফলে প্রাপ্ত শাস্তির মাত্রা এবং লাভের পরিমাণের মধ্যে তুলনা করেন। অপরাধীর কাছে, অপরাধের শাস্তির চেয়ে লাভের পরিমাণ বেশি মনে হলে, তিনি অপরাধ করতে অত্যধিক আগ্রহী হন এবং একসময় অপরাধ করেন । প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের সদস্যদের ক্ষেত্রে ও ঠিক এমনটিই যেন ঘটছে । কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, কেউবা আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে, অপরাধ করা সত্তে¡ও প্রাপ্ত শাস্তির হাত থেকে যেকোনভাবে রেহাই পাছেন এবং একই ধরনের অপরাধের পুনারাবৃত্তি ঘটাছেন। ফলশ্রæতিতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের হাত থেকে কোনোভাবেই ফাঁস ঠেকানো যাছে না ।


প্রশ্নপত্র ফাঁসের অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হছে ডিজিটাল ডিভাইস। দুষ্কৃতকারীরা, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যহারকে পুঁজি করে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে প্রশ্নপত্র পাঠাছেন এবং সেখান থেকে পরীক্ষার্থীদের নিকট প্রশ্নপত্রের সামাধান পৌঁছে দিছেন।  


এই কাপুরুষোচিত কর্মকাÐের সাথে জড়িত আছেন দেশের অসংখ্য রাঘব-বোয়ালরা। আবার এরাই নিজেদের শিক্ষিত হিসেবে দাবি করেন । এরা প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে, পরীক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকেন। আর সুযোগ পেলেই, মুহূর্তের মধ্যেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন। 


এদের অপকর্মের ক্রমধারা ক্রমশ বেড়েই চলছে। অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে, অর্থের কাছে নিজের আত্মসম্মান আর বিবেকবোধকে বিক্রি করে হাতিয়ে নিছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে, ফাঁসকারী চক্রের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তরা ও লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরি নিচ্ছেন, পরে এরাই  ঘুষগ্রহণসহ বিভিন্ন  দুর্নীতিমূলক কর্মকাÐে লিপ্ত হচ্ছেন। 


এভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে লাগামহীন দুর্নীতির কারণে দিন দিন দুর্নীতির মাত্রা বেড়েই চলছে। ২০২১ সালের দুর্নীতির ভিত্তিতে বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৩ তম, গতবার ছিল ১২তম। যা শুধু এদেশের মানুষের নিকট দেশের সুনাম ক্ষুণœ করেনি, আন্তর্জাতিক মহলে ও দেশের মান-সম্মান আজ প্রশ্নবিদ্ধ! 


এদিকে স্বপ্নভঙ্গ হছে এদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারদের। তারা নির্দিষ্ট বয়সে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে না পেরে বেকারত্বের অভিশাপে অভিশপ্ত জীবনযাপন করছেন। উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ ও টাকার অভাবে সরকারি চাকরি জোটাতে পারছেন না। এই প্রশ্নপত্র ফাঁস বেকারত্ব ও দুর্নীতিবাজ সমাজ তৈরীর প্রধান মাধ্যম, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রগুলোর স্বপ্নভঙ্গের কারণ ! 


এ যেন দেশ ও জাতি ধ্বংসের অঘোষিত কোন এক নীলনকশা!  স্নাতক পাশ করা চাকরি প্রত্যাশী মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিটি যুবকের মনে আজ শুধু একটি প্রশ্নই বারবার জাগে, বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস আদৌ কি বন্ধ হবে? আর যদি বন্ধ হয়, তাহলে কবে নাগাদ প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে । 


লেখক : শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর 

আরো পড়ুন