শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
আলম খানের শেষ গান এবং রত্নভাণ্ডারের বয়ান
আসলাম আহসান
১৭ জুলাই, ২০২২ ১৪:২৭:০০
প্রিন্টঅ-অ+

২০২০ সালে আজাদ রহমান ও ২০২১-এ অনুপ ভট্টাচার্যের প্রয়াণের পর ভাবছিলাম; কে রইল আর! কেউ কি রইল? বাংলাদেশে আমাদের ক্লাসিক কম্পোজারদের বৃত্তটা পূর্ণ হতে আর বাকি নেই। এ বছর জুলাই মাসের ৮ তারিখে এসে সুরস্রষ্টা আলম খান (১৯৪৪-২০২২)-এর নামের শেষেও বন্ধনীচিহ্নে দুটি সাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে জায়গা করে নিল!  


আবদুল আহাদ, ধীর আলি মিয়া, সমর দাস, রবীন ঘোষ, খান আতাউর রহমান, দেবু ভট্টাচার্য, আলতাফ মাহমুদের হাতে যে সমৃদ্ধ সুরের ধারাটি তৈরি হয়েছিল, তা বেগবান হয়েছে সত্য সাহা, আলী হোসেন, খোন্দকার নূরুল আলম, সুবল দাস, আনোয়ার পারভেজের কম্পোজিশনে। অতঃপর আলাউদ্দীন আলী। চলচ্চিত্রের গানে মেলোডিকে তিনি অনন্য মহিমায় স্থাপন করেছিলেন। একটু ভিন্নভাবে তা সঞ্চারিত হয়েছে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সংগীতে।  


ভুলিনি যে, শেখসাদী খান ও সুজেয় শ্যাম এখনও আমাদের মাথার মণি। তবু আলম খানের প্রস্থানের মধ্য দিয়ে সংগীতে আমাদের ক্লাসিক যুগের যবনিকাপাত হয়ে গেছে, এটা মানতেই হবে। ব্যাপারটা যদি এমন হতো যে, পূর্বপূরিরা যাচ্ছেন এবং যথারীতি উত্তরসূরিও তৈরি হচ্ছেন, সিলসিলা বজায় থাকছে; তাহলে এ নিয়ে আক্ষেপ করার কিছু থাকত না। কিন্তু সেটা থাকেনি। প্রসঙ্গত, শচীনদেব বর্মনের পরে তাঁর উত্তরসূরি পুত্র রাহুলদেব বর্মন বাবার পদাঙ্ক হুবহু অনুসরণ না-করলেও কাজ করেছেন নিজস্ব স্টাইলে এবং সংগীতের ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা হয়ে আছে সোনার আখরে।  


কারা কাজ করছেন এখন আমাদের চলচ্চিত্রের সংগীত অঙ্গনে? আধুনিক গানে? মকসুদ জামিল মিন্টু একটা আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন। সত্য সাহার ছেলে ইমন সাহা বেশ আশা জাগিয়েছিলেন, এখন তো প্রবাসী! কিংবা বশির আহমদের ছেলে রাজা বশির? খান আতার ছেলে আগুন? এস আই টুটুল? শওকত আলী ইমনেরই-বা কী খবর?  আলাদা আলাদাভাবে তাদের কাজ হয়তো ভালোই। কিন্তু এই বিছিন্ন ধারা দিয়ে কি বেগবান নদী তৈরি হবে?    


আলম খানের বিদায়ে এইসব চিন্তা বড় হয়ে উঠছে। এমন আপাদমস্তক মিউজিশয়ান আবার কবে জন্মাবে! জীবনের শুরুতেই সংগীতের দিকে আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা সাবধান করে বলেছিলেন: ‘গান বাজনা করবা? শেষ পর্যন্ত না খাইয়া মরবা!’ জেনে-শুনে আলম খান তবু সংগীতের অনিশ্চিত পথেই পা বাড়িয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। প্রস্তুতিপর্বটা বেশ পোক্ত। শাস্ত্রীয় সংগীত ও আধুনিক গানের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যথাক্রমে ওস্তাদ ননী চ্যাটার্জী ও করিম শাহাবুদ্দিনের কাছে। রবিন ঘোষ, আলতাফ মাহমুদ, খোন্দকার নূরুল আলম, খান আতাউর রহমান প্রমুখের কাছেও তিনি বিভিন্ন সময়ে তালিম নিয়েছেন।  


একক সংগীত পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন আবদুল জব্বার খান পরিচালিত কাঁচকাটা হীরে [১৯৭০] সিনেমার মাধ্যমে। এ ছবিতে রূপা খানের কণ্ঠে ‘জল তরঙ্গ মন আমার’ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। তাঁরপর শুধুই উত্থান। আলম খানের সংগীত পরিচালনায় মাস্টারপিস আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত সারেং বউ [১৯৭৮]। এ ছবিতে মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের কণ্ঠে ও ফারুকের লিপে ‘ওরে নীল দরিয়া’ বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা গান। 


আলম খান যত দিন কাজ করেছেন, দাপটের সঙ্গে করেছেন। শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশের কিংবদন্তি পপ শিল্পী আজম খান তাঁর ছোট ভাই। জীবন নৌকা [১৯৮১] ছবিতে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘তুমি তো এখন আমারই কথা ভাবছো’ এর গীতিকার আলম খানের সহধর্মিণী গুলবানু খান। দুই পুত্র আরমান খান ও আদনান খান সংগীত পরিচালনায় যুক্ত।  


অনেকেরই অজানা; শিবলি সাদিকের পরিচালনায় ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তিনকন্যা’ ছবিতে কলকাতার নবাগত ‘শানু ভট্টাচার্য’কে দিয়ে প্রথম প্লেব্যাক করান আলম খান। এই শানু ভট্টাচার্যই পরবর্তীকালে মুম্বাই সিনেমাজগতে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ‘কুমার শানু’ নামে। ‘তিনকন্যা’ ছবির শিরোনাম গানটি (‘তিন কন্যা এক ছবি / চম্পা চন্দা আর ববি।’) তাঁকে দিয়ে গাওয়ানো হয়েছিল। 


আলম খানের সুর ও সংগীত পরিচালনায় কিছু শ্রোতানন্দিত গান :           


১. ওরে নীল দরিয়া- কথা : মুকুল চৌধুরী, কণ্ঠ : মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, ছবি : সারেং বউ [১৯৭৮]


২. আমার প্রেমের তরি বইয়া চলে- কথা : আফজালুর রহমান; কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, ফেরদৌস ওয়াহিদ; ছবি : মহেশখালির বাঁকে [১৯৭৮]


৩. তুমি, তুমি বলে ডাকলে বড় মধুর লাগে- কথা : মুকুল চৌধুরী, কণ্ঠ : মোঃ খুরশিদ আলম, ছবি : আরাধনা [১৯৭৯]


৪. আমি না জানিলাম না চিনিলাম রে- কথা : মুকুল চৌধুরী, কণ্ঠ : ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, ছবি : আরাধনা [১৯৭৯] 


৫. কত দূরে ভালোবাসার ঠিকানা-  কথা : মুকুল চৌধুরী, কণ্ঠ : রুনা লায়লা, ছবি : সখি তুমি কার [১৯৮০]


৬. তুমি আছো সবই আছে-  কথা : মুকুল চৌধুরী, কণ্ঠ : মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, ছবি : সখি তুমি কার [১৯৮০] 


৭. তুমি তো এখন আমারই কথা ভাবছো- কথা : গুলবানু খান, কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, ছবি : জীবন নৌকা [১৯৮১]


৮. আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো- কথা : মাসুদ করিম, কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, ছবি : রজনীগন্ধা [১৯৮২]  


৯ ভালোবেসে গেলাম শুধু- কথা : মনিরুজ্জামান মনির, কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, ছবি : কেউ কারো নয় [১৯৮২]  


১০. হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস- কথা : সৈয়দ শামসুল হক, কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, ছবি : বড় ভালো লোক ছিল [১৯৮২]


১১. চাঁদের সাথে আমি দেব না- কথা : সৈয়দ শামসুল হক; কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লা; ছবি : আশীর্বাদ [১৯৮৩]  


১২. চোখ বুজিলে দুনিয়া আন্ধার- কথা : মনিরুজ্জামান মনির, কণ্ঠ : সৈয়দ আব্দুল হাদী, ছবি : প্রাণ সজনী [১৯৮৩]


১৩. সখি কারে ডাকে ওই বাঁশি নাম ধরিয়া- কথা : মনিরুজ্জামান মনির, কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, ছবি : প্রাণ সজনী [১৯৮৩] 


১৪. ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে- মূল রচয়িতা: আসাদউদ্দৌলা সিরাজী, পরিবর্তন/পরিমার্জন: মনিরুজ্জামান মনির, কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, ছবি : প্রাণ সজনী [১৯৮৩] 


১৫. সবাই তো ভালোবাসা চায়- কথা : গাজী মাজহারুল আনোয়ার; কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর; ছবি : সারেন্ডার [১৯৮৭]  


১৬. জীবনে সাধ হলো আরো একবার- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লা; ছবি : সততা [১৯৮৭]


১৭. জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প- কথা : মনিরুজ্জামান মনির, কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, ছবি : ভেজা চোখ [১৯৮৮] 


১৮. আমি এক দিন তোমায় না দেখিলে- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর; ছবি : দুই জীবন [১৯৮৮] 


১৯. তুমি আজ কথা দিয়েছ- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর; ছবি : দুই জীবন [১৯৮৮]


২০. আবার দুজনে দেখা হলো- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর; ছবি : দুই জীবন [১৯৮৮] 


২১. সবারে আমি করলাম পার- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর; ছবি : মাইয়ার নাম ময়না [১৯৯০]


২২. বেলি ফুলের মালা পরে- কথা : কবীর আনোয়ার, কণ্ঠ : সাবিনা ইয়াসমিন, এন্ড্রু কিশোর, ছবি : বেপরোয়া [১৯৯২] 


২৩. এখানে দুজনে নিরজনে- কথা : মনিরুজ্জামান মনির; কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লা; ছবি : অন্তরে অন্তরে [১৯৯৪] 


ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে বেতারে তিনি কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না। সে কারণে, তুলনামূলকভাবে বেসিক আধুনিক গানে তাঁর সুর একেবারে অল্প। তবু অল্প পরিসরে রচিত অল্প ক’টা আধুনিক গানও শ্রুতিমধুর। কিছু নমুনা :   


১. ও মাধবী গো, থাকো মোর অন্তরে- কথা : মুকুল চৌধুরী, প্রথম শিল্পী : রওশন আরা মোস্তাফিজ, দ্বিতীয় শিল্পী : সাবিনা ইয়াসমিন, প্রকাশকাল : ১৯৬৭ [?]


২. কখন ছুটি হবে- কথা : শহীদুল ইসলাম, কণ্ঠ : আব্দুর রউফ, প্রকাশকাল : ১৯৭৬


৩. আমাকে দেখার সেই চোখ তোমার কই গো- কথা : মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, কণ্ঠ : রুনা লায়লা, প্রকাশকাল : ১৯৭৮  


৪. ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে- কথা : সৈয়দ শামসুল হক, কণ্ঠ : এন্ড্রু কিশোর, প্রকাশকাল : ২০১৯ 


উক্ত তালিকায় একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় : গীতিকার হিসেবে আলম খানের প্রথম পছন্দ ছিলেন মুকুল চৌধুরী। মুকুল চৌধুরীর পর তাঁর বিশেষ পছন্দের গীতিকার ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। পুরুষ কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে এন্ড্রু কিশোরকে যে তিনি আলাদা করে দেখতেন, এ তো আরো বেশি স্পষ্ট। 


১৩ মার্চ ২০১৪ তারিখে আলম খানের সঙ্গে আমার প্রথম মুখোমুখি দেখা শেখের টেকে তাঁর বাসায়। [তখন তিনি গান-বাজনা থেকে মোটামুটি অবসর নিয়েছেন।] আমি অপেক্ষা করছিলাম নিচে বসার ঘরে। রহস্য উপন্যাসের মতো ঘোরানো প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে তিনি নামলেন। সাদা হাফ শার্ট-পরা দীর্ঘদেহী একজন মানুষ। গোফের আড়ালে স্মিত হাসি।  


এরপরও আরও কয়েক বার তাঁর বাসায় গিয়েছি, নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। কীভাবে মুকুল চৌধুরী আর তিনি মিলে দিনের পর দিন গান তৈরি করতেন আড্ডার ছলে, বহু ‘গল্প’ শুনেছি তাঁর কাছ থেকে। সেসব লিখে রাখা উচিত ছিল। কিছু প্রসঙ্গ তো কখনোই ভোলা যাবে না। বিশেষ করে সৈয়দ হক প্রসঙ্গ। সে আলোচনায় যাবার আগে রেডিওতে প্রচারিত তাঁর সুরে স্মরণীয় একটি গানের প্রসঙ্গ : ‘কখন ছুটি হবে/ কখন বাজবে সেই ঘণ্টা।’ গানটি ১৯৭৬ সালে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল। গীতিকার শহীদুল ইসলাম। কণ্ঠ দিয়েছিলেন আব্দুর রউফ যিনি মূলত লোকগান করতেন। গানটির রেকর্ডিং-এর সময়কার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আলম খান। ‘গানের প্রথম অংশের ছন্দটা তো দেখেছেন, কেমন ফুর্তির ভাব। কখন ছুটি হবে! প্রথম অন্তরা শেষ। মিউজিক বদলে গেল এখান থেকে। তালও। ‘ঢঅঅং’ করে বাজল ঘণ্টা। পর পর দুই বার! এই ঘণ্টা আনন্দের না। শেষ বিদায়ের ঘণ্টা!’ 


তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। কে বাজিয়েছিল বুককাঁপানো ঘণ্টাটা? তিনি বললেন, ‘এক হিন্দু ভদ্রলোক ছিলেন যন্ত্রীদের মধ্যে। আমার নির্দেশমতো তিনিই বাজিয়েছিলেন ঘণ্টাটা। রেকর্ডিং তো হয়ে গেল। বাইরে আসতেই আরডি সাহেব জড়িয়ে ধরলেন আমাকে আর বললেন, ‘করেছেন কী আপনি! করেছেনটা কী!’  


আলম খানের সঙ্গে শেষ দেখা ২০১৭ সালে। ঠিক এর আগের বছর প্রয়াত হয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সৈয়দ হকের লেখা শেষ ক’টা গানের সুর সংযোজনে মনোযোগ দিয়েছেন তখন তিনি। ফোনে আমাকে ডাকলেন লিরিক সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে আলাপ করার জন্য। ফোনেই বললেন, ‘হক ভাইয়ের কিছু কবিতায় সুর করলে কেমন হয়?’ উচ্ছ্বসিত আমি বললাম, ‘খুবই ভালো হয়!’ সেই মোতাবেক সৈয়দ হকের কিছু কবিতার বই সঙ্গে নিয়ে গেলাম তাঁর বাসায়। পছন্দের কিছু কবিতা পেন্সিল দিয়ে দাগিয়ে নিয়েছিলাম আগেই।  


অদ্ভুত ব্যাপার, আলম খান শেষ পর্যন্ত যে-গানটা এন্ড্রু কিশোরকে দিয়ে রেকর্ড করিয়েছিলেন, সেটা আমার পছন্দের একটি কবিতা। [সে সময়ে লেখা সৈয়দকের অন্য লিরিকগুলোর শেষ পর্যন্ত কী হলো, আমি জানি না।] কবিতাটি ‘কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ ছায়ায়’ বই থেকে নেয়া। প্রথম পঙ্ক্তি ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে’। এটাই আলম খানের শেষ সুরারোপ এবং এন্ড্রু কিশোরের শেষ কণ্ঠদান।


‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে


ধূপের গন্ধের মতো তোমাদের শান্ত সকালে


থেকে যাব তোমার রুমালে ॥’ 


একবার জানতে চেয়েছিলাম, ১৯৮৩ সালে 'চাঁদের সাথে আমি দেব না’ গানটির পর সৈয়দ হক হঠাৎ করে গান লেখা একেবারেই ছেড়ে দিলেন, কেন? এই প্রশ্নে আলম খান কিছুটা কুণ্ঠিত হলেন। বললাম, একান্ত ব্যক্তিগত কোনো বিষয় হলে বলার দরকার নেই। তিনি বললেন, ‘তেমন কিছু না। তবে বিষয়টা নিয়ে আমার একটু অপরাধবোধ আছে। বিষয়টা বলি আপনাকে। তখন আমি ভীষণ ব্যস্ত। প্রচুর কাজ হাতে। দম ফেলার সময় নাই। তো, এই ব্যস্ততার মধ্যে হক ভাই একদিন ফোন করে তাঁর বাসায় যেতে বললেন আমাকে। তিনি কিছু গান লিখেছেন। সুর করতে হবে। ‘আজ-কাল-পরশ’ করতে করতে হক ভাইয়ের সাথে আমি আর দেখা করতেই পারলাম না। হক ভাই খুব আপসেট হলেন। তিনি ধরে নিলেন, আমি তার কথায় গুরুত্ব দিইনি! বেশ পরে একটু ফ্রি হয়ে যখন তার সাথে দেখা করতে গেলাম, তিনি আর গান নিয়ে কথা বলতে রাজি হলেন না। বললেন, ‘আমি এখন খুব ব্যস্ত!’ তাঁর সাথে আমার কাজ করা হলো না। রাগ করে তিনি গান লেখা ছেড়ে দিলেন! 


জীবনের অনেক কিছুই হয়তো রঙিন ফানুসের মতো চুপসে যাবে। তবু কথার জাদু, সুরের মোহ, কণ্ঠের আবেশ আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। আলম খানের সুর ও সংগীতের ইন্দ্রাজাল আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখবে আরও আরও বহুকাল : রুমালের ভাঁজে ফুলের গন্ধের মতো, মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো।  


‘আজ তুমি ছাড়া প্রতিটি ক্ষণ


লাগে যেন এক যুগের মতন


এই প্রহরগুলো জানি তুমিও গুনছো...’

আরো পড়ুন