শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
সমন্বয় নয় : অবশেষে বাড়লো ভাড়া
জহির হাসান
০৮ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৫৭:০৭
প্রিন্টঅ-অ+


প্রত্যাহার হলো ধর্মঘট। বিআরটিএ-এর সঙ্গে বাস-মালিকদের দরকষাকষির মাধ্যমে অবশেষে ভাড়া বাড়ল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ৩ দিনের আন্দোলনের (ধর্মঘট) মুখে বাসের ভাড়া বাড়িয়েছে সরকার। রাজধানীসহ সারা দেশে নতুন করে নির্ধারিত ভাড়ায় চলছে গণপরিবহন। এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির সাথে সাথেই যেসব বাস সিএনজিচালিত সেগুলোও সরকার নির্ধারিত বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ২৩ ভাগ। দাম বৃদ্ধির বিপরীতে নতুন নির্ধারিত ভাড়া তালিকায় লঞ্চের ভাড়া বেড়েছে ৩৫ ভাগ, মহানগর (মিনিবাস) ২৬ ভাগ, মহানগর (বাস) ২৬.৫ ভাগ এবং দূরপাল্লায় ২৭ ভাগ।

এদিকে বর্ধিত গণপরিবহন ভাড়া প্রত্যাখ্যান করে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য বাস ও লঞ্চ ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তারা বলেন, যাত্রীর স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে গলাকাটা ভাড়া নির্ধারণের ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনসাধারণকে আরও একদফা গভীর সংকটে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সঠিক ব্যয় বিশ্লেষণ করলে বড়জোর ১ টাকা ৬০ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা যেত। তা না করে নানা খাতে অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি দেখিয়ে একলাফে ১ টাকা ৪২ পয়সার ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ৫ অক্টোবর শুক্রবার ভোর থেকে বাস-মালিক সমিতি সারা দেশে হঠাৎ করেই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া জয় সকল ধরনের গণপরিবহন, সাথে বন্ধ করা হয় পণ্যবাহী যান চলাচলও। জ্বালনি তেলে দাম বাড়নোর প্রতিবাদে টানা ৩ দিন বন্ধ করে রাখা হয় সকল ধরনের গণপরিবহন, পরে বন্ধ করে দেয়া হয় লঞ্চ চলাচলও। এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে সড়কে চলাচলে। সরকারি চাকরি পরীক্ষা নানা একাডেমিক পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কাজে যারাই বাইরে বের হয়েছেন পথে পথে পড়তে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগে।

নানা মহল থেকে সমস্যা সমাধানের আহবান জানানো হলেও ৩ দিন পর রোববার সকাল থেকে বাস-মালিক সমিতি সাথে বৈঠকে বসে বিআরটিএ। ৩ দিন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অবশেষে বাড়ানো হলো বাস ও লঞ্চের ভাড়া। টানা ৭ ঘণ্টা বৈঠক শেষে মহানগরে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ১৫ পয়সা আর দূরপাল্লায় ১ টাকা ৮০ পয়সা করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। নতুন নির্ধারিত ভাড়ায় বাসে সর্বনিম্ন ৮ টাকা ৮০ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর লঞ্চে ১৮ টাকা থেকে এক লাফে বাড়ানো হলো ২৫ টাকা। এর পরই ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় পরিবহন ও লঞ্চ মালিকরা।

এদিকে বর্ধিত গণপরিবহন ভাড়া প্রত্যাখ্যান করে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য বাস ও লঞ্চ ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তারা বলেন, যাত্রীর স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে গলাকাটা ভাড়া নির্ধারণের ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনসাধারণকে আরও একদফা গভীর সংকটে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সঠিক ব্যয় বিশ্লেষণ করলে বড়জোর ১ টাকা ৬০ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা যেত। তা না করে নানা খাতে অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি দেখিয়ে একলাফে ১ টাকা ৪২ পয়সার ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে।





ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজধানীসহ সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট শুরু করে বাস, ট্রাকসহ পণ্যবাহী যানবাহনের মালিকেরা। পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্টরা বলছিলেন, ডিজেলের দাম না কমানো হলে গণপরিবহনসহ অন্যান্য পরিবহনে ভাড়া সমন্বয় করতে হবে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার বিআরটিএকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। দাবি না মানা পর্যন্ত তারা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয়। এর প্রেক্ষিতে গত রোববার রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে গণপরিবহনে ভাড়া পুনর্নির্ধারণে পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। তবে বৈঠকে পুরোটা সময়ই বাস-মালিকদের দাবি ছিল ভাড়া বাড়ানো। তেলের দাম কমানোর কারণ দেখিয়ে তিনদিন সকল ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করছিল বাস মালিকরা। গত রোববার পুরোটা সময়ই বিআরটিএ’র কাছে তাদের দাবি লক্ষ্য করা গেছে ভাড়া বাড়ানোর, সেখানে তেলের দাম কমিয়ে ভাড়া স্থিতিশীল রাখার বিষয়টি তাদের মাঝে লক্ষ্য করাই যায়নি। যাই হোক সবকিছু শেষে বাড়তি ভাড়ার যে চাপটা আসলো সেটা সাধারণ মানুষরই ওপর পড়েছে। বাড়তি ভাড়ার এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়ে যাত্রীরা বলেন, এ দাম বাড়ার ফলে আমাদের আরো নানা সমস্যার সম্মুখিন হতে হবে। কারণ প্রত্যেকটা জায়গায় প্রত্যেকটা জিনিসের দাম আরো বাড়বে। বাড়তি যে চাপের বোঝা সেটি আসলে সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তায়।

বৈঠক শেষে বাস-মালিক পক্ষ দাবি করছেন, যে বাড়তি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, এটা ২০১৯ সালেই তাদের একটি প্রস্তাবনা ছিল সেটিরই একটি বর্ধিত অংশ। তেলের দাম বেড়েছে সে কারণে বাড়েনি, তারা দাবি করছেন যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো আছে সেগুলোর যে দাম বেড়েছে এটার সাথে ভাড়া বৃদ্ধির কোন সম্পৃক্ততা নেই। তার মানে সরকার থেকে যেটা বলা হচ্ছিল- আন্তর্জাতিক দাম কমলে তেলের দাম কমতেও পারে। সেক্ষেত্রে এই যে বাস ভাড়া কমায় সেই সম্ভাবনাটা কিন্তু নেই বললেই চলে।

এদিকে বৈঠকে সিএনজিচালিত বাস বাড়তি ভাড়ার আওতায় আসবে না বলে জানান বিআরটিএ চেয়ারম্যান, তবে তা মানতে নারাজ মালিকপক্ষ। বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে ব্রিফিংয়ে বলা হয়, সিএনজিচালিত বাস তার ভাড়া বাড়বে না। এখন কথা হচ্ছে- একই রুটে একই ব্রান্ডের বাস চলছে কোনটা তেল দিয়ে কোনটা গ্যাস দিয়ে সেটা যাত্রী গাড়িতে উঠার সময় তো আর দেখে উঠবে না, সেখানে সমন্বয়হীনতা হবেই। ফলে বোঝাই যাচ্ছে সিএনজিচালিত বাস ও তেলচালিত বাসে একই দুর্ভোগে পড়বে যাত্রীরা।

যাত্রী কল্যাণ একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ। এ আগে যখন সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়নো হয়েছিলো তখন এ বাস মালিকরাই সে সময়ও তাদের ভাড়া বড়িয়ে নিয়েছে। কারণ তখন বলা হয়েছে একটা বড় অংশ গ্যাসে চলে। এখন যখন তেলে দাম বাড়ানো হয়েছে একই কথা তারাই বলছে। কিন্তু গত রোববার বিআরটিএ ও বাস মালিক সমিতির বৈঠকে তারা দাবি করে রাজধানীর সিএনজিতে চলে মাত্র ২ শতাংশ বাস, যেখানে পরিসংখ্যান বলছে ৯৫ শতাংশ।

জ্বালনি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই সবাই ধরে নিয়েছিলো বাস মালিক কর্মচারী বা শ্রমিকরা যে ধর্মঘট বা আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে সেটি তেলের দাম কমানোর। কিন্তু তা না কমিয়ে বাড়ানো হলো ভাড়া। বিআরটিএ ও মালিকদের বৈঠক শেষে জানানো হলো বাড়ছে ভাড়া। প্রতিবারই গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধির পর আন্দোলন বা ধর্মঘট শেষে দেখা যায় মালিকদের মূল দাবি বা আন্দোলনের বিষয়বস্তু থাকে দাম কমানো না বরং ভাড়া বাড়ানো।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালনি তেলের দাম বাড়ার ফলে শুধুমাত্র বাসের ভাড়া বাড়লো তা নয়, বাড়বে অন্যান্য পণ্যের ভাড়াও, বাড়বে নিত্যপণ্যের দাম। বিদ্যুৎ-তেল দিয়ে যে সমস্ত যন্ত্র, জেনারেটর, পাওয়ার স্টেশন চলে সবকিছুর খরচই বাড়বে। এ দাম বৃদ্ধিতে শুধু বাস ভাড়া বাড়লো তা নয়, সকল জিনিসের দাম বাড়বে। বাড়বে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও।

কয়েকদিন পর পর ভাড়া বাড়ে এবং কর্তৃপক্ষ তাদের কাছেই নতজানু হয় এক্ষেত্রে সমাধানটা কোথায়? জনগণের পক্ষে বা সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলবে কে? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সমন্বয় এটা যেমন স্বাভাবিক, এটা যদি ধাপে ধাপে করা হতো তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর হঠাৎ করে চাপ পড়তো না, তাই এই বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে, তবে সেটি যেন একবারে বোঝা হয়ে না পড়ে সে বিষয়গুলে একটু ভেবে দেখা উচিত।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 


আরো পড়ুন