শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
এখনো ভরসা করোনাযোদ্ধা সাহিদের গড়া ‘প্লাজমা ব্যাংক’
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ মে, ২০২২ ১৬:০০:১০
প্রিন্টঅ-অ+


দেশে মহামারির এই সময় অনেক তরুণ এগিয়ে এসেছেন। মানুষের সেবায় দিনরাত কাজ করছেন তারা। বিপদগ্রস্তদের খাবার, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভসসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে হাত বাড়িয়েছেন তারা। দেশের বিপদাপন্ন মানুষের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। ২০২০ সালের মার্চের শেষে বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তখন থেকে এই ভাইরাসের আতঙ্ক সবার মধ্যে। এর মধ্যে গণমাধ্যমে একে একে খবর প্রকাশ হয়, করোনার উপসর্গ থাকায় সন্তান মাকে রাস্তায় ফেলে গেছে। করোনা রোগীর পাশে নেই স্বজনরা। মৃত্যুর পরেও পরিবারের কেউ লাশ নিতে আসেনি! ঠিক তখন জীবনের মায়া ত্যাগ করে একদল তরুণ বেরিয়ে আসে। মহামারির মধ্যে নেমে পড়ে মানবতার সেবায়। মুমূর্ষু রোগীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে ভর্তি করায়, চিকিৎসার বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখে। এমনকি মৃত্যু হলে স্বজনরা এড়িয়ে গেলেও তারা পাশে থেকে লাশ সৎকার করছে। এদেরই একজন সাহিদ আহমেদ। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনা আক্রান্ত রোগীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন সাহিদ ও তার দল। শুধু হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি করে থেমে থাকেনি।

এরপর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্লাজমা থেরাপি শুরু হয়। হঠাৎ করোনা চিকিৎসায় দেবদূতের মতো প্লাজমা থেরাপির আগমন। প্লাজমা চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করেন অসংখ্য করোনাআক্রান্ত রোগী। কিন্তু এই ব্যবস্থায় বিপত্তি ঘটে। সচেতনতার অভাবে অনেকের ইচ্ছে থাকার পরেও প্লাজমা দিচ্ছেন না। লকডাউনের মধ্যে রোগীর স্বজনদের জন্য প্লাজমা ম্যানেজ করা এতোটা সহজ ছিলনা।

ফলে চাহিদার অনুপাতে ১০ শতাংশেরও কম রোগী প্লাজমা থেরাপির সুযোগ পাচ্ছেন। রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেননি সাহিদের। তারা করোনা রোগীকে প্লাজমা দিতে করোনা থেকে সুস্থ ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠে নামেন। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে করোনা যোদ্ধা তরুণ সাহিদ আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করা হয় ফেসবুক ভিত্তিক জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘প্লাজমা ব্যাংক অব বাংলাদেশ’। অল্প সময়ে প্ল্যাটফর্মটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।

(২৯ মে ২০২০) সালে যাত্রা শুরু করে সাহিদের এই উদ্যোগে দুই লাখের বেশি মানুষ যুক্ত হয়েছে। সরাসরি প্লাজমা ডোনারকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে। প্ল্যাটফর্মটিতে ডাক্তার, শিক্ষার্থীসহ অনেকেই যুক্ত হয়েছেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই উদ্যোগের সঙ্গে বেশ কয়েকজন চিকিৎসক যুক্ত রয়েছেন। তারা করোনা থেকে বাঁচতে করণীয় নানা বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে করোনাকালে রক্ত পাওয়া খুব দুরূহ হয়ে পড়েছে। কিন্তু মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা তো বলে–কয়ে আসে না। তাই এই সময়ে গ্রুপ থেকে রক্তও ম্যানেজ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অনলাইনে সবচাইতে বড় এই প্লাজমা প্লাটফর্ম। এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় হাজারের বেশি মানুষকে প্লাজমা ম্যানেজ করা দেওয়া হয়েছে। তেমনি গ্রুপে স্বেচ্ছায় প্লাজমা দান করছেন অসংখ্যা স্বেচ্ছাসেবী। অগণিত মানুষ এই গ্রুপ থেকে রক্ত পেয়েও উপকৃত হচ্ছেন।

 ‘প্লাজমা ব্যাংক অব বাংলাদেশ‘ প্রায় দুই বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় গ্রুপটির পথচলার শুরুতে মো. সাহিদ আহমেদ প্রচুর ধাক্কাও খেয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে করোনাযোদ্ধা সাহিদ আহমেদ জানান, আমি আমার পরিবারের একমাত্র ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি মেঝো। করোনার শুরু থেকে অন্যান্যদের মত আমার পরিবারও চেয়েছিল আমি যেন সাবধানতা অবলম্বন করি। অতিরিক্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাই। যেহেতু আমি পেশায় সাংবাদিক সুতরাং খবরের সাথে সংযোগ থাকার কারণে একটি সংবাদ আমাকে প্রচুর আবেগী করে দেয়। আমি আমার মা একত্রেই খবরটি দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকি। অবাক হই করোনা আক্রান্ত ভেবে নিজ জন্মদাত্রীকে কিভাবে সন্তানরা জঙ্গলে ফেলে চলে যায়! এরপর আমার মাকে বুঝাতে সক্ষম হই। যে আমি বয়সে তরুণ দেশের কিছু মানুষের পাশে যদি দাঁড়াতে পারি। তা আমার জন্য বিরাট পাওয়া হবে। আম্মু নির্ধিধায় রাজি হয়ে গেলেও যখন ব্যাগ গুছিয়ে আমাকে বিদায় দিতে আসেন: আম্মুর চোখ বেয়ে পড়া সেই কান্নার পানি আজও আমার চোখে ভাসে। আম্মু প্রচুর দোয়া করেছিল আমাকে। এমনকি যারাই আত্ম- মানবতার সেবায় নিয়োজিত ছিলেন সকলকে দোয়া করেছেন। একপর্যায়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে নানান পেশার মানুষের করোনা টেষ্টের ব্যবস্থা করানো, এম্বুলেন্সে আনা নেওয়া এই জাতীয় সেবা স্বেচ্ছায় দিতাম।

সাহিদ বলেন, যেহেতু করোনা আক্রান্তদের সংস্পর্শে যাওয়া হত তাই আমরা একটি গোডাউনে থাকতাম। এমনও হয়েছে জরুরী ফোন কল আসার কারণে সকালের নাস্তা না করেই বেড়িয়ে যেতাম। সারাদিন পর রাতে এসে পোষাক চেঞ্জ করা, পোষাক ভিজিয়ে রাখা ইত্যাদি করার পর নাস্তা, দুপুরের খাবার খেতাম।

তিনি আরো জানান, ফেসবুকে পোষ্ট শেয়ার করার পর মানুষ আমাকে প্রচুর ভরসা করতে লাগলো। যেকোন তথ্যের জন্য আমার কাছে ফোন কল আসতে থাকলো। একপর্যায়ে প্রচুর মানুষের প্লাজমা চেয়ে পোষ্ট চোখে পড়ে। সে থেকে সিদ্ধান্ত নেই একটা ফেসবুক গ্রুপ ক্রিয়েট করবো। যার মাধ্যমে প্লাজমা দাতা ও গ্রহীতাকে সংযোগ করিয়ে দেওয়া যাবে। সেখান থেকেও মানুষের প্রচুর সহযোগীতা পাই। অন্যদিকে বিড়ম্বনায় পড়ে যাই যখন প্রতারক চক্র প্লাজমা চেয়ে পোষ্ট গুলো থেকে নাম্বার নিয়ে প্লাজমা দেওয়ার কথা বলে গাড়ি ভাড়া দাবী করতো। অসহায় মানুষেরা বিশ্বাস করে টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠিয়ে প্রতারণার স্বীকার হতো এবং প্রতারকেরা টাকা বুঝে পাওয়ার পর ফোন বন্ধ করে দিতো।  একপর্যায়ে আমি গ্রুপটির ফাউন্ডার হিসেবে অভিযোগ পাই। সাংবাদিক আদিত্য আরাফাত  এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার মুজিব আহম্মদ পাটওয়ারী ভাইয়াদের সহযোগীতায় প্রতারক চক্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারি।  প্রায় দুই বছর ধরে প্লাজমা ব্যাংক অব বাংলাদেশ গ্রুপটি সততাও সফলতার সাথে চলছে। এখন অবদি করোনার টিকা সংশ্লিষ্ট নানান প্রশ্ন জিজ্ঞাসাও রক্ত চেয়ে পোষ্ট আসে এবং সেগুলোর সেবাও দেওয়া হচ্ছে। আশাকরি যতদিন সম্ভব মানুষের সেবায় গ্রুপটিকে কাজে লাগাবো। আমাদের এই গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যক্তি ইমেজ আছে। তাছাড়া গ্রুপটির এডমিন ,মডারেটর আমরা সবাই নিষ্ঠার সাথে কাজ করছি। এবং আমি চাই মানুষের ভরসা টুকুকে বাঁচিয়ে রাখতে।

উল্লেখ্য, দেশে করোনা মহামারীর শুরুতেই স্বেচ্ছায় অসহায় রোগীদের অ্যাম্বুলেন্সে আনা-নেওয়া, করোনা টেস্ট করা, ভর্তি করানো, অক্সিজেন সেবা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ, মাস্ক ও খাবার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোঃ সাহিদ আহমেদ।


আরো পড়ুন