শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
হিসাব-নিকাশে শেষ হোক হিজরি বর্ষ
মাহফূযুর রহমান
০৫ আগস্ট, ২০২১ ২১:৪৯:৫৭
প্রিন্টঅ-অ+


জিলহজ মাস। হিজরি বর্ষের শেষ মাস। এ মাসের মধ্য দিয়েই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আরো একটি হিজরি বর্ষ। আগমন করবে নতুন একটি আরবি বর্ষ। এ মাসের সমাপ্তি একটু ব্যতিক্রম। যেমন ব্যতিক্রম তার সূচনা। মাসটি শুরু হয়েছিল হজের বার্তা নিয়ে। শেষ হচ্ছে একটি হিজরি বর্ষকে বিদায় জানিয়ে। তার এ আগমন ও বিদায় জুড়ে রয়েছে বহু শিক্ষণীয় বিষয়। রয়েছে উপদেশ গ্রহণ করার মতো বহু রসদ। অন্য দশটি মাসের মতো তার গতানুগতিক আগমন নয়। স্বাভাবিক ও সাধারণ নয় তার বিদায়ও। তা শুরু হয় হজ ও কুরবানির টানে আমাদের উজ্জীবিত করে, সওয়াবের আশায় আমাদের আশান্বিত করে। আর  শেষ হয় আমাদের মাঝে মৃত্যুর বার্তা দিয়ে। মুহররম মাস থেকে শুরু হয় আমাদের মুসলমানদের বর্ষ। শেষ হয় জিলহজ মাসের মধ্য দিয়ে। প্রকৃতির নিয়মে ব্যত্যয় ঘটে না কখনো। মহান আল্লাহ বলেন,  তবে তোমরা আল্লাহর স্থিরীকৃত নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবে না এবং তোমরা আল্লাহর স্থিরীকৃত নিয়মকে কখনো টলতেও দেখবে না। (সূরা ফাতির, ৪৩)

এই প্রকৃতি আমাদের বড় পাঠশালা। এর মাঝে রয়েছে আমাদের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয়। যদিও আমরা তা দ্বারা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকি। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃজনে, রাত-দিনের একটানা আবর্তনে, সেইসব নৌযানে যা মানুষের উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগরে বয়ে চলে, সেই পানিতে যা আল্লাহ আকাশ থেকে বর্ষণ করেছেন এবং তার মাধ্যমে ভূমিকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করেছেন ও তাতে সর্বপ্রকার জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং সেই মেঘমালাতে যা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে আজ্ঞাবহ হয়ে সেবায় নিয়োজিত আছে, বহু নিদর্শন রয়েছে সেই সকল লোকের জন্য যারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। (সূরা বাকারা, ১৬৪)

এই যে মুহররম দিয়ে বছর শুরু হয়ে জিলহজ দিয়ে তা শেষ হয়, আমাদের জীবনটাও কিন্তু এভাবে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। আর মৃত্যুর মাধ্যমে তার যবনিকাপাত হয়। অতএব, ‘জন্মিলেই মরিতে হইবে’ এই অমোঘ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি আমরা। ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’। (সূরা আলে ইমরান, ১৮৫)

দ্বিতীয়ত আমরা অনেকেই মৃত্যুর কথা বেমালুম ভুলে যাই। মনে করি, মৃত্যু আসতে এখনো বহু দেরি। জিলহজ মাস আমাদেরকে সতর্কবার্তা দেয়। জাগ্রত করে আমাদের উদাসীন হৃদয়। বুঝিয়ে দেয় মৃত্যু কতো নিকটবর্তী! স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের একটু পেছনের কথা। যেদিন আমরা মুহররম মাসকে বরণ করে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়েছিলাম, ফেটে পড়েছিলাম আনন্দ-উল্লাসে, ঠিক মানুষের জন্মদিনের মতো; কিন্তু কদিন না যেতেই সে নববর্ষের বিদায়ঘণ্টা বেজে ওঠে। কাউকে না জানিয়েই সে চলে যায় বিদায় নিয়ে। হারিয়ে যায় মহাকালের মাঝে। ঠিক তদ্রুপ আমাদের সকলের মৃত্যুও অগত্যা চলে আসবে। আমরাও কাউকে না জানিয়েই প্রস্থান করবো রং-তামাশার এ জগত থেকে। যাত্রা করবো অনন্তকালের পথে।

বছর শেষে ব্যবসায়ীরা লাভ-লোকসানের হিসাব নিয়ে বসে। আমাদের এ মাসে পুরো বছরের হিসাব নিতে হবে। একথা বলে যেতেই আমাদের দরজায় কড়া নেড়েছে জিলহজ। হযরত উমর (রা.) বলেন, হিসাব নেয়ার আগেই তোমরা নিজেরা নিজেদের হিসাব নাও। (সুনানে তিরমিযি, ২৪৫৯)। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, যারা দুনিয়াতেই নিজেরা নিজেদের হিসাব নেবে, আখেরাতে তাদের হিসাব হালকা হয়ে যাবে। (হিলয়াতুল আওলিয়া ২/১৫৭)। বুযুর্গ আলেম মায়মুন বিন মাহরান (রহ.) বলেছেন, একজন মানুষ তখনই মুত্তাকি হতে পারবে, যখন সে নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করবে কঠোরভাবে। এমনকি একজন ব্যক্তি তার অংশীদার থেকে যেরকম হিসাব নেয় তারচেয়েও কঠোরভাবে। এতোটা কঠোরভাবে যে, কোত্থেকে আসে তার আহারাদি ও বস্ত্রাদি একথাও সে জেনে নেবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৩৫৬২৫)

নিজেকে শুধরে নেয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। একজন ব্যবসায়ী যেমন হিসাব-নিকাশ শেষে আত্মসমালোচনা করে ভবিষ্যতে সংশোধনের পথ খোঁজে, ঠিক তদ্রæপ ইমানদারকেও নিজের ত্রæটিগুলো খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। এরপর ভবিষ্যতে পুরোপুরি শুদ্ধ, পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের শপথ নিতে হবে।

সম্পাদিত নেক কাজগুলো কবুল করানোর চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য আশ্রয় নিতে হবে বেশি বেশি দোয়া ও কান্নাকাটির। এজন্য কায়মনোবাক্যে প্রভুর দরবারে করতে হবে রোনাজারি। বিনয়াবনত হয়ে কাকুতি-মিনতি করে করতে হবে প্রার্থনা। হযরত আলি (রা.) বলেন, তোমরা আমলের চেয়ে বেশি যত্নবান হও তার কবুলের প্রতি। শুনোনি আল্লাহ কী বলেছেন, ‘আল্লাহ তো মুত্তাকিনদের পক্ষ হতেই কবুল করেন। (সূরা মায়েদা, ২৭) লাতায়েফুল মাআরিফ, ২০৯। আমাদের পূর্বসূরীরা আমল করার পর ছয় মাস পর্যন্ত শুধু তা কবুলের দোয়া করতেন। আমাদেরও তাই করতে হবে। তাহলেই আমরা তাদের  মতো আল্লাহর পুরস্কারপ্রাপ্ত হবো। অর্জন করতে পারবো তাঁর নৈকট্য।

লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, চরশুভী মাদরাসা, দৌলতখান, ভোলা।



 


আরো পড়ুন