শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
নবীজিকে চিঠি
আদিল মাহমুদ
১৪ অক্টোবর, ২০২১ ২০:১২:৫২
প্রিন্টঅ-অ+

ওগো নবীজি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ...আমি তোমার উম্মত ‘আদিল মাহমুদ’। আমি জানি আল্লাহর পরেই তোমার আসন। তুমি পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মানবকুলের সর্দার, আশ্চর্য চরিত্রের অধিকারী, অতুল সৌন্দর্যে মন্ডিত রাহমাতুল্লিল আলামীন হাজার সালাম তোমাকে।


সর্বপুণ্যময় ভ‚মি, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল, মক্কা নগরীতে মা আমেনার নয়নমনি, সাহাবায়ে কেরামদের পরশমনি, দুজাহানে শিরোমণি, আমার নবীজী তুমি জন্মগ্রহণ করেছিলে। যখন পুরো পৃথিবী নিকষ আঁধারে ছেয়ে গিয়েছিল, মাবুদের উপাসনা করার মত কেউ ছিল না পুরো পৃথিবীতে, ঠিক তখনই মানবজাতিকে অন্ধকারের ঘোর অমানিশা থেকে আলোর মিনারায় স্থানান্তরিত করলে তুমি। বর্বরতার অতল গহŸরে তলিয়ে যাওয়া একটি সময়, সে সময়ের আরবের মানুষগুলোকে সোনালি সময় এবং নতুন জীবন দান করলে তুমি। মানব গোলামীর জিঞ্জির ভেঙে একনিষ্ঠ ইবাদতের সুযোগ করে দিলে তুমি। তুমিই বিশ্বের অদ্বিতীয় ব্যক্তি। আমার মন চক্ষু ও জীবনের চেয়েও প্রিয়।


রাহমাতুল্লিল আলামিন! আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি তুমি। তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য সুন্দরতম নমুনা হিসেবে প্রেরণ করেছেন তিনি। শারীরিক গঠন কাঠামোর দিক দিয়েও তুমি ছিলে নজিরবিহীন। তোমার মতো অঙ্গ সৌষ্ঠবের অধিকারী এত সুন্দর আর কেউ ছিল না, কিয়ামত পর্যন্ত হবেও না। তোমাকে অনুপম চরিত্র মাধুরী দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তিনি। চারিত্রিক সৌন্দর্যে তুমি ছিলে সমস্ত সৃষ্টির সেরা। বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থ পাঠ করে জানতে পেরেছি, তুমি অতিশয় দ্যুতিময় একজন মানুষ, যার প্রতিটি কর্ম সকলের জন্য অনুকরণীয়। তুমি বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় কথা বলতে। অসঙ্কোচ, অনাড়ষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক ও অর্থপূর্ণ কথা। সহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার গুণবৈশিষ্ট্য তোমার মধ্যে ছিল।


তুমি ছিলে সর্বাধিক লাজুক প্রকৃতির। লজ্জাশীলতা ও সম্মানবোধ এত প্রবল ছিল যে, কারো মুখের ওপর সরাসরি অপ্রিয় কথা বলতে পারতে না। তুমি ছিলে সবচেয়ে বেশী ন্যায়পরায়ণ, পাক-পবিত্র, সত্যবাদী এবং বিশিষ্ট আমানতদার। তুমি সব ধর্মের প্রতি উদারতায়, বিধর্মীদের সাথে ব্যবহারে, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মহামানবতায়, স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধায়, নারীজাতির উন্নয়ন ও মাতৃভক্তিতে, সাম্য ও মৈত্রী স্থাপনে শিখরে ছিল তোমার স্থান। সেই সাথে বীরত্ব ও বাহাদুরীর ক্ষেত্রে তোমার স্থান ছিল সবার উপরে।


শিশুদের সঙ্গে তোমার ব্যবহার ছিল স্নেহপূর্ণ, কোমল ও বন্ধুসুলভ। তুমি তাদের হাসি আনন্দে যোগ দিতে। সবসময় হাসিমুখে কথা বলতে। শিশুরা তোমার কাছে এলে নিজেদের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতো। শিশুদের প্রতি ভালো আচরণ করার জন্যে তুমি বলেছিলে, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না সে আমার দলভুক্ত নয়।’ কিশোরদের সাথে তোমার আচার-আচরণ কেমন ছিল, তা আমরা হজরত আনাস রা. বিবরণ থেকে জানতে পারি। আনাস রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আমি তাঁর যতটা খেদমত করেছি, তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি আমার খেদমত করেছেন। দীর্ঘ দশ বছরে তিনি আমার কোনো কথা বা আচরণে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি। তিনি সর্বদাই ছিলেন আমার প্রতি অতিশয় সদয়।


ব্যক্তিগত জীবনে তুমি ছিলে অত্যন্ত নির্মল, স্বচ্ছ ও পবিত্র। সকল মৌলিক মানবীয় গুণাবলীর সমাহার ছিল তোমার ব্যক্তিগত জীবনে। তোমার এই গুণের কারণে অসভ্য বর্বর আবর জাতির মনের আদালতে এমনই বিশ্বাসের সৌধ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলে, যার ফলে তুমি প্রথম ‘আল-আমিন’ উপাধি লাভ করেছিলে। পারিবারিক জীবনে তুমি ছিলে অনুপম আদর্শের প্রতীক। পারিবারিক জীবনে তুমি পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, অসহায়-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সকলের অধিকার নিশ্চিত করেছ। এমনকি পিতা-মাতার অবর্তমানে তাদের বন্ধু-বান্ধবদের অধিকারও নিশ্চিত করেছ এবং পারিবারিক কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করেছ।


তুমি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রবর্তন করে আমাদের ন্যায় বিচারের পথ দেখিয়েছ। তোমার বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল মানুষের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। বিবাদ-বিসম্বাদকারীদের মধ্যে ন্যায়ভিত্তিক বিচার করা। তোমার আন্তর্জাতিক নীতির মূলকথা ছিল বিশ্ব ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। এ ভ্রাতৃত্বই সারা বিশ্বের মানুষকে একই সুতায় গ্রোথিত করতে সক্ষম। ভাষা, বর্ণ, পেশাগত ও ভৌগোলিক দিক দিয়ে যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠে, তা মানুষকে শান্তি দিতে ব্যর্থ। সকল মানুষই এক সম্প্রদায়ভুক্ত। বিদায় হজ্জের ভাষণেও তুমি এমনটা বলেছিলে।


এ পর্যন্ত পৃথিবীর কোন মহামনীষীর গুণাবলী ও আদর্শ চরিত্র তোমাকে অতিক্রম করতে পারেনি। পৃথিবীর সকল মহাপুরুষের মহৎ গুণাবলী তোমার মাঝে এককভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। ফলে তুমি যে কোন বিবেচনায় জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ। তুমি একমাত্র মহামানব, যে বিশ্বসাহিত্যে আদর্শ ও ব্যক্তি চরিত্রের বিচারে সবচাইতে বেশি স্মরণীয়। কুরআন-হাদিসের কথা ছাড়াও সাহিত্য ও ঐতিহাসিকতার ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত এমন মহাপ্রাণ আর একজনও নেই। তোমার মহান জীবন চরিত্র বিশ্ববাসীর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক জীবন্ত উৎস। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী লেখক মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর বইতে বলেন, মুহাম্মাদকে সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় শীর্ষস্থান দেয়াটা অনেক পাঠককে আশ্চর্যান্বিত করতে পারে এবং অন্যদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সেকুলার এবং ধর্মীয় উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ সফল ছিলেন।


আরবের দুলাল! ইতিহাসে আর কোনো ধর্মই ইসলামের মতো এত দ্রæত বিস্তার লাভ করেনি। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে তোমার চালচলন, আচারআচরণ, চারিত্রিক মাধুর্য। দরিদ্র লোকদের প্রতি তোমার সদয়তা, তাদের অভাব মোচন করা, তাদের সাথে কথা-বার্তা বলা এবং তাদের দুঃখ-দুর্দশার জন্য গভীর সহানুভ‚তি প্রকাশ করা। বন্ধু-আগন্তুক, ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল সবার সাথে সমতার সাথে ব্যবহার করা। তুমি ইসলামের চারিত্রিক সৌন্দর্যের প্রতি প্রত্যেককে সবসময় আহবান করতে। তোমারও সাহাবায়ে কেরামের চারিত্রিক মাধুর্য হাদিসের কিতাবগুলোতে চিরউজ্জ্বল হয়ে আছে, যা কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীবাসীকে পথ দেখিয়ে যাবে। ইসলামের দিকে আহবান করবে। এই পৃথিবীতে যারা তোমার ও সাহাবীদের দেখানো পথে চলবে, পরকালে তারাই জান্নাতে যাবে। তারাই জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।


সৌন্দর্যমন্ডিত দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী! আমি শামায়েলে তিরমিজিতে পড়েছি, যে কেউ তাকে প্রথম দর্শনে হতভম্ব হয়ে পড়ত এবং একথা বলতে বাধ্য হত, জীবনে এমন সুন্দর মানুষ দ্বিতীয়জন দেখিনি। আফসোস! সরাসরি তোমাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। দোহাই তোমার প্রেমের, স্বপ্নে একটাবার দেখা দাও এই অধম উম্মতের সাথে। আমি তো তুমি যা বলেছ তা সত্য বলে মেনে নিয়েছি। তোমার অনুসরণ ও আনুগত্য করি। তোমার সুন্নাতকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করি। তোমার নামের জন্য আমি কোরবান হতে চাই। কি আনন্দ, কি আনন্দ লাগে! যখন তোমার জীবনী পড়ি, তোমার কথা ভাবি, তোমাকে নিয়ে লিখি। তখন মনে হয় আমার আত্মার ঘর আলোকিত বেহেশতী বাগান। আমি তোমার আদর্শে উজ্জীবিত হতে চাই। ওগো আল্লাহ! আমাকে দাও অপার করুণা। নবীর আদর্শে উজ্জীবিত করো আমার জীবন।


ওগো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তোমার সুপারিশ পাবার জন্যে এই চিঠিটা যেন হয় আমার রোজ হাশরে বিপদকালের শ্রেষ্ঠ সাথী।


ইতি


তোমার অধম উম্মত ‘আদিল মাহমুদ’


আমার বার্তা/ সি এইচ কে

আরো পড়ুন