শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
রাহমাতুল্লিল আলামিন
মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী
২১ অক্টোবর, ২০২১ ২১:১৮:৪৭
প্রিন্টঅ-অ+

এ বিশাল পৃথিবীটা যখন অশান্তির চরম দুঃসময় অতিক্রম করছিল, পৃথিবীর মানুষ অপেক্ষা করছিল এমন একজন মুক্তিকামী মহামানবের জন্য, যিনি পৃথিবীর অবিন্যস্ত অবয়বটি পাল্টে দিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজাবেন পৃথিবীকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে আগমন করলেন সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার রহমত হিসেবে। পবিত্র কুরআনুল কারিমে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ হয়েছে,  আমি (আল্লাহ) আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত নং- ১০৭)।


মহানবি হজরত মুহাম্মদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য শ্রেষ্ঠতম আদর্শেরও নিদর্শন। গোটা মানবজাতির সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক সম্মানিত এবং সব নবি-রাসুলের নেতা পরিশেষে আগমন করেন। সর্বশেষ নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো একটি বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ভুক্ত নবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বনবি। কারণ তাঁর পর দুনিয়ায় আর কোনো নবির আগমন ঘটবে না। এই মর্মে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, অন্য নবিরা তাঁদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি বিশ্বের সব মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছি।


মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আরো ইরশাদ করেছেন, আমি শেষ নবি, আমার পরে আর কোনো নবির আগমন ঘটবে না। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  মানবগোষ্ঠীর প্রতি সত্য প্রচারে নিবিষ্ট হন এবং সত্যভ্রষ্ট, পাপাসক্ত মানব সমাজকে তিনি দেখিয়েছিলেন পরম কল্যাণ ও কামিয়াবির পথ। যাতে তারা ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে শান্তি ও সৌভাগ্য লাভ করতে পারে। আর অনাগতকাল ধরে তাঁর সে আদর্শের ছায়াতলে পরম শান্তি ও নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।


মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীতে আবির্ভূত হন এমন এক কঠিন সময়ে যখন সমগ্র পৃথিবী আইয়ামে জাহেলিয়াতের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। কোথাও শান্তি ছিল না, স্বস্তি ছিল না, ধর্মের নামে অধর্ম বিরাজ করছিল সর্বত্র। শিরক ও কুফরের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল সবাই। নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হছিল অবলীলায়, কন্যাসন্তানকে দেয়া হছিল জীবন্ত কবর। মারামারি, হানাহানি, খুন-খারাবির উন্মত্ততায় গোটা সমাজ ছিল টালমাটাল, পৃথিবীর সেই করুণ অবস্থা নিরসনের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মদ সা:-কে সিরাজুম মুনিরা বা প্রদীপ্ত চেরাগরূপে প্রেরণ করলেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, হে নবি! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁরই দিকে আহ্বানকারীরূপে এবং প্রদীপ্ত চেরাগরূপে। (সুরা আহযাব, আয়াত নং-৪৫-৪৬)।


মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্ব মানবতার জন্য সত্যিকার শান্তির পথ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মনোনীত বান্দা হওয়ার সত্যিকার পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনি মানুষে মানুষে হানাহানি দূর করে বিশ্বজনীন মানব সমাজ গড়ার পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের অথবা কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, কোনো কালোর ওপর কোনো সাদার অথবা কোনো সাদার ওপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সবাই আদম থেকে এবং আদম মাটি থেকে সৃষ্টি, শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো আল্লাহভীতি।


প্রিয়নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন, মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সম্প্রীতি ও সমবেদনার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, সুন্দর আখলাকের পরিপূর্ণরূপ দিতে আমি প্রেরিত হয়েছি। পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে তিনি ছিলেন সুন্দরতম ও সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ইরশাদ করেন, আমি কখনই এমনটি দেখিনি যে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশে কোনো অন্যায়কারীকে শাস্তি প্রদান করেছেন। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিবের পুত্র হজরত আলি (রা.) শৈশবকাল থেকে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে প্রতিপালিত হয়েছেন। কিশোরদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তিনি বলেন, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অতিশয় উদার, মহানুভব ও দয়ার্দ্রচিত্ত। সর্বাবস্থায় তাঁর হৃদয়ের কোমলতা ও দয়ালু স্বভাবই প্রতিভাত হতো, কঠোরতা তিনি পরিহার করে চলতেন। তাঁর মুখ দিয়ে কখনো খারাপ ও অশ্রাব্য বাক্য নির্গত হতো না। তিনি কখনো অন্যের দোষত্রুটি অন্বেষণ করতেন না। যদি এমন কোনো অনুরোধ তাঁর কাছে পেশ করা হতো, যা গ্রহণযোগ্য নয়, তা হলে তিনি যেমন তা অনুমোদন করতেন না, আবার সরাসরি তা নাকচও করে দিতেন না। যাঁরা তাঁকে জানতেন, তাঁরা সহজেই এর অর্থ অনুধাবন করতে পারতেন। তিনি এটা এ জন্য করতেন যেন অন্যের অনুভূতিতে এতটুকু আঘাত না লাগে অথচ অনুমোদনযোগ্য নয় এমন কাজ থেকেও সে নিবৃত্ত হয়। হজরত আলি (রা.) আরো বলেন,  তিনি ছিলেন অতিশয় পরোপকারী মহানুভব ব্যক্তি, কঠোরভাবে সত্যবাদী ও দয়ার্দ্রচিত্ত। তাঁর সাহচর্যে আসার সৌভাগ্য যাঁরা অর্জন করেছেন তাঁরাই হয়েছেন মুগ্ধ ও আনন্দিত। যে কেউ তাঁকে দেখেছে, প্রথম দর্শনেই তাঁর সৌম্যকান্তি তাঁকে আকর্ষণ করেছে এবং পরিচয় ঘনিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে তিনি তাঁকে মহব্বত করতে শুরু করেছেন।


তিনি ছিলেন সবার আদর্শ, তাঁর ধৈর্য, আত্মত্যাগ, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, বিনয় ও নম্রতা, দানশীলতা, আন্তরিকতা ও উদারতা বিশ্বের সব মানুষকে দান করেছে অতুলনীয় আদর্শ। তিনি মানুষকে স্বাবলম্বী হতে শিক্ষা দিয়েছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব কাজ নিজ হাতে করতেন, নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন, নিজের কাজকর্ম নিজেই সম্পন্ন করতেন।


রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে বিশাল জনসমুদ্রে ঘোষণা করেছিলেন, আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাছি। যত দিন তোমরা এর অনুসরণ করবে তত দিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) এবং তাঁর প্রেরিত রাসুলের সুন্নাহ। (মিশকাত শরিফ)।


বস্তুত বর্তমান সমস্যাসঙ্কুল বিশ্বে যেখানে মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হছে প্রতিনিয়ত, যেখানে সন্ত্রাস ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, দেশে দেশে হানাহানি ও যুদ্ধবিগ্রহ চলছে, নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরছে, যেখানে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য নষ্ট হছে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্য এবং আচার-আচরণের ভিন্নতা সহ্য করা হছে না, সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপম আদর্শ ও সর্বজনীন শিক্ষা অনুসরণই সমগ্র পৃথিবীতে এবং বিভিন্ন সমাজে বহু প্রত্যাশিত শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। আমিন!


লেখক : আলেম, প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক


 

আরো পড়ুন