শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
মুহাম্মাদ আবূ মূসা কাসেমী
প্রভুর কাছেই সব আর্জি
২৫ নভেম্বর, ২০২১ ২১:৪৩:৫৭
প্রিন্টঅ-অ+

আল্লাহ তাআ’লা বলেন, বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ; তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা যুমার : আয়াত ৫৩)


ভোর চারটা। চারদিক পিনপতন নীরব। সবাই ঘুমের ঘোরে বিভোর। ভাবলাম, একজন সজাগ, তিনি আমার রব। তিনি সবাইকে ঘুম পাড়ান, নিজে ঘুমান না। তিনি সবাইকে সংরক্ষণ করেন, নিজে ঘুমাতে যান না। সামান্য পেটের পীড়া অনুভূত হলো। মনে মনে ভাবলাম, তাকেই ডাকি। 


বললাম, রববে কারীম, ক্ষমা করো, সবর দাও। নাহ, পীড়া বাড়তেই থাকলো, ফরজ আদায় করে দুয়া চাইলাম, রব, মাফ করো, সবরের শক্তি দাও।


২০.১১.২০২১ শুক্রবার। সকাল ৮টা। একমাত্র আদরের ধন, নয়নের দুলাল পুত্রকে নিয়ে বাসার পাশেই ফরাজী হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে গেলাম। সামান্য ওষুধ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। পীড়া কমলো না। বাড়তেই থাকলো। পাশের ডাক্তার ডেকে সুই পুশ করলাম। পেরেশানি বাড়তে থাকলো। কুড়িল কাজী বাড়ীর জামে মসজিদে জুমআর খেতাবতের দায়িত্ব। মুতাওয়াল্লী মহোদয়, হজরত মাওলানা আতীক সাহেব হুজুর, জনাব হেদায়তুল ইসলাম ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে একমাত্র ছেলেকে জুমআর নামাযের জন্য পাঠালাম। আল হামদুলিল্লাহ, তার জীবনের প্রথম জুমআ হলেও ভালোই পড়িয়েছে। সব শুকর আল্লাহর।


বাদ জুমআ, আশ্চর্য ঘটনা। মনের অজান্তেই, চরম আবেগে আঁখি জল বেরিয়ে এলো। ফোন বেজে উঠলো। ধরার সাথে সাথেই অপর দিক থেকে শব্দ এলো, হুজুর কেমন আছেন, বললাম ভালো। সেতো আর কেউ নয়, সে হলো, আমার জিগার, আমার চরম বিপদের সময়ের নিজের জান বাজি রেখে দোস্ত -দুশমন সবাইকে একদিকে রেখে, যখন নিজের কাছের লোকেরাই অপরিপক্ব মেধার মাধ্যমে আপনকে পর মনে করে, আর পরকে হিতৈষী মনে করেছে। অনেকের ধারণায় বিপদসঙ্কুল মুহূর্তে সব উপেক্ষাকে তুয়াক্কা করে আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে। সেই জামিয়া আফতাবনগর ঢাকা-এর মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম। মজলুমের দোয়া বিফলে যায় না। আল্লাহ তাকে উভয় জগতে কামিয়াবি দান করবেন ইনশাআল্লাহ। মোটামোটি ভালোই চলছিলাম।


আসর ও মাগরিবের পর করুণার আঁধারের কাছে দোয়া চাইলাম, রব! মাফ করো, সবর দাও। রবের ইচ্ছা, অসুস্থতার কারণে বাদ মাগরিব মাদরাসা উসমান রা. বাংলাদেশ-এর দোয়ার অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়নি, তবে সেখানে সবার জন্য দোয়া হয়েছে। সুখের কথা হলো, মাদরাসা উসমান- এ জামিয়া আফতাবনগর ঢাকা-এর মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম, জামিয়ার মুহাদ্দিস মুফতি আবদুল্লাহ আল-মামুন, জামিয়ার মুহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা আবু মুসা কবীর, নুরে মদীনা মডেল মাদরাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ ইউসুফ, বায়তুল মামুর জামে মসজিদ-এর ইমাম মাওলানা মাহবুবুর রহমান, গ্রীন রোড জামে মসজিদ-এর ইমাম মুফতি মশিউর রহমান, জামিয়ার অন্যতম শিক্ষক সাংবাদিক মাওলানা মাসউদুল কাদিরসহ আরো অনেকে ছিলেন। এরা সবাই আমার প্রাণ ও আত্মজ। সেখানে বাস্তবমুখী কাজ ‘মিথ্যা, মুনাফেকি ও দুর্নীতি দমন পরিষদ গঠনের খসড়া আলোচনাও হয়। বাদ এশা পেটের পীড়া আবারো বাড়তে লাগলো।


মাদরাসা উসমান রা. বাংলাদেশ-এর মহাপরিচালক, অনুজ মাওলানা আবু মুসা কবীর-এর সহযোগিতায় বন্ধুবর ডাক্তার সাঈদুল আলম ভাইয়ের পরামর্শে ‘নাপাডোল’ সেবন করে রাত শেষ করলাম। দোয়া করলাম, রব! তুমিই তো আপন। মাফ করো, সবর করার তাওফিক দাও।


২০.১১.২০২১ ইং শনিবার। আগের দিন অফডে হওয়ায় ডা. খুরশিদ আলমসহ একান্ত কয়েকজনের সাথে কথা হয়। সবাই বললেন, আগে একটা আলট্রা করুন। মুহতারাম ডাক্তার সাঈদ ভাইয়ের পরামর্শে একমাত্র অনুজ ছোটভাই, জামিয়া আফতাবনগর ঢাকা-এর শায়খ মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় বারিধারা নতুন বাজার-এর ফরাজী ডায়াগনস্টিক হাসপাতালের ডিরেক্টর ম্যনেজার মুহতারাম জাকির ভাইয়ের আন্তরিকতায় শনিবার বাদ মাগরিব কিছু চেকআপ করাবার সুযোগ লাভ করি। আলহামদুলিল্লাহ! সব শুকরিয়া তাঁর। মহামহিম জাকির ভাইয়ের আন্তরিকতা ভুলবার মতো নয়। তাঁর জন্য উত্তম কল্যাণের দোয়া করি। 


তবে আশানুরূপ ডাক্তার সেদিনও দেখাতে পারিনি।  মনে মনে ভাবলাম, বিপদের সময় অনেককেই পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় মাত্র  একজনকে, তিনি হলেন, আমার রব।


২১.১১.২১ রোববার।  আল্লাহ রোগ দেন। তিনি রোগ ও রোগী উভয়ের মালিক। আমাদের অপরাধের কারণে তিনি পরীক্ষামূলক রোগ দেন। আবার নিজের বান্দার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সুস্থ করে দেন। তবে আমাদের কাজ হলো, সবরের পরিচয় দেয়া। নিজের আমলকে দুরস্ত করা। অতীত গুনাহের জন্য তাওবা করা। আর ভবিষ্যতে গুনাহ না করার সংকল্প করা। রোববার সকাল ১০টা থেকে হাসপাতালে। কয়েকটি চেকাপ করে দুপুর ১২.৩০ মিনিটে বাসায় ফিরলাম। 


হাসপাতাল থেকে ফোন করলেন বিকাল ৪.৩০ মিনিটে। ডা. আশফাক আহমেদ সিদ্দিকী স্যার আসবেন, আপনি যথাসময়ে চলে আসুন। 


আসরের নামাজ আদায়ের পর যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা, যাকে আল্লামা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ. বলতেন,  ‘আমার ফরহাত’ আমারই মতো, সাদাসিধা, বিনয়ী, দরাজ দিলের অধিকারী। আল্লাহ তাকে অনেক ভালো রাখবেন। তার থেকে আমার দীনীবংশ অনেক উপরে যাবে, পিতার দোয়া কন্যার জন্য একশ’ ভাগ কবুল। তবে অনেকে দুনিয়ার দিক থেকে অনেক আগে, আর সে দীনের দিক থেকে। আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আালাইহি ওয়াসাল্লাম সাইয়িদ আসআদ মাদানী রহ. এর মুজায, রত্নগর্ভা মা, আমার নাতি- নাতনীর ‘নানুমনি’ তাকে সাথে নিয়েই হাসপাতালে ছুটলাম।


দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর সন্ধ্যা ৬.১৫ মিনিটে বন্ধুবর জাকির ভাইয়ের সুবাদে ডাক্তারের সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হই। দেখেই বললেন, হুজুর!  ভালো থাকবেন। রিপোর্টে কিডনির সামান্য সমস্যা মনে হয়। ইউরোলোজিক্যাল বিশেষজ্ঞ দেখালে ভালো হবে। জাকির ভাই দমে যাওয়ার পাত্র নন। সাথে সাথে ডা. হামুদুর রহমান স্যারকে কনটাক্ট করলেন। 


তিনি ভালো করে দেখলেন, বললেন, আমি আরো কিছু টেস্ট দিলাম। রিপোর্ট দেখে ওষুধের ব্যাপারে চিন্তা করবো।  পাঠক, এখানেই সবর এসতেকলালের চরম পরিচয়। তিনদিন গত হলো। এখনো মূল চিকিৎসাই শুরু হয়নি।


বললাম, রব! মাফ চাই, দয়া চাই। 


২২.১১.২১. সোমবার।  গতকালই পরামর্শ করি, পুরো বডি চেকাপ করাবো। তাই আজ সকালেই হাসপাতালে হাজির হই। আংশিক চেকাপ করে বাসায় ফিরি। তখন বেলা ১.৪৫ মিনিট। আজ ডাক্তার নেই। বাকি চেকাপ করে হয়তো রাতে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ হবে। বললাম, রব!


তুমিতো দয়ার সাগর। বান্দার অপরাধের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ো না। তাকাও তোমার রহমানিয়্যাতের দিকে। দয়ার সাগরের দিকে।  তোমার অধম এ-ই বান্দাকে মাফ করে দাও। পূর্ণ সবরের তাওফিক দাও। 


তোমার দীনের খিদমাতের জন্য হায়াত দাও। যতদিন গুনাহ মাফ না হয় ততদিন হায়াত দাও। যতদিন কারো কোনো পাওনা থাকে, ততদিন হায়াত দাও। যতদিন তুমি রাজী না হও, ততদিন হায়াত দাও।  রোগ ও রোগী উভয়ের মালিক তুমি। তাই সবকিছু তোমার উপর অর্পণ করে রাখলাম। আমীন। 


লেখক : শাইখুল হাদিস, জামিআ আফতাবনগর, ঢাকা


 

আরো পড়ুন