শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
আবুল ফাতাহ কাসেমি
ফুঁ দিয়ে নেভানো যাবে না ঈমানের আলো
২৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ২০:০০:১৬
প্রিন্টঅ-অ+

ফুঁ দিয়ে নেভানো যাবে না ঈমানের আলো 


আবুল ফাতাহ কাসেমি 


ইসলাম এক ইলহামি ধর্ম। মুসলিম উম্মাহ এ ধর্মের ধারক বাহক। মুসলমান পৃথিবীর অপরাপর জাতির মত নয়। মুসলিম জাতিকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার দাসত্ব করার জন্য। এবং এ দাসত্ব করা হবে কুরআন সুন্নাহর আলোকে। আর কুরআন সুন্নাহ টিকে থাকবে দাওয়াতের মাধ্যমে। তাই মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহ তাআলা দাওয়াত ও তাবলিগের বিশেষ এক দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। দাওয়াত ও তাবলিগ মুসলিম উম্মাহর সে দায়িত্বের একটি অংশ।


মুসলমান হলো পৃথিবীর বুকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সংবাদ বহনকারী এক জামাত। এ জামাতের কাজ হচ্ছে, সার্বজনীন দাওয়াতের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি সেক্টরে এর প্রচার প্রসার করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মুসলমান! তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মাহ, তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা মানুষদের সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্ত করবে। (সূরা ইমরান : ১১০)


কুরআনে তাবলিগ জামাতকে উম্মাহর সফলতা যিম্মাদার সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের তিনটি কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক. উম্মাহকে কল্যাণের পথে আহ্বান। খ. সৎকাজের প্রচার প্রসার। গ. অসৎকাজে প্রতিরোধ। মুসলিম উম্মাহর মাঝে যতদিন যে হারে এ জামাত বিদ্যমান ছিল ততদিন সে হারে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ চালু ছিল। পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে জামাত পর্যায়ে থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে নেমে এসেছে। 


যুগে যুগে বিভিন্ন মনীষী পথ ভুলা এ উম্মাহকে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। গত কয়েক শতাব্দি পূর্বে উপমহাদেশের এক মনীষী বর্তমান তাবলিগ জামাতের এ মহতি কাজের সূচনা করেন। তিনি আলস্যে মূহ্যমান এ উম্মাহকে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে সজাগ করে তুলেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এ মেহনতের নাম ছিল ‘ঈমানি আন্দোলন’ কেননা এ কাজের ভিত্তিই হচ্ছে ঈমানি আলোচনার উপর। ইমানের মেহনতকে সামনে নিয়ে উম্মাহর মধ্যে ঈমানি চেতনা জাগ্রত করতে ও আত্মভোলা উম্মতকে ইমানের রশিতে বাঁধতেই এ আন্দোলনের সূচনা। পরে ব্যাপকায় এ আন্দোলনের নাম পড়ে যায় তাবলিগ জামাত। ১৯২৬ সালে মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি কর্তৃক উত্তর ভারতের মেওয়াতে দেওবন্দি আন্দোলনের একটি শাখা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।মাওলানা ইলিয়াছ রহ. উপলব্ধি করেন যে, ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন করা না গেলে সামষ্টিক জীবন অপূর্ণ থেকে যাবে। ব্যক্তিসত্তায় ইখলাস, তাকওয়া ও পরকালীন জবাবদিহি সঞ্চার করা গেলে তা জীবনের সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ব্যক্তি জীবনে যদি কেউ আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তা হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের যেকোনো গুরু দায়িত্ব তার ওপর নির্র্দ্বিধায় ন্যস্ত করা যায়।


প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত কয়েকশত ধরে পৃথিবীর আনাচে কানাচে এ মেহনত ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহর দেয়া জান, আল্লাহর দেয়া মাল ও আল্লাহর দেয়া সময়কে কুরবান করার স্লোগান নিয়ে এ জামাতের আবির্ভাব হয়। জাতিয়তাবাদের দোহাই দিয়ে উসমানি সাম্রাজ্যের সর্বশেষ ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার পর তাবলিগের এ মেহনত মুসলিম উম্মাহকে এক রশিতে বাধতে চেষ্টা করে আসছে। মুসলিম জাতির স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে এ জামাতের একতার বন্ধনে। এ পৃথিবীর বুকে যতদিন আকাশের ছায়া থাকবে ততদিন দাওয়াত তাবলিগের মেহনতের এ ধারা চলমান থাকবে। 


গত ৬ ডিসেম্বর শত বছরের পুরনো ইসলাম প্রচারের এ সংগঠন তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আরব। বিশে^র কোটি কোটি মুসলমান এই সিদ্ধান্তে আহত হয়েছেন। তাবলিগ জামাত বিশে^র সবচেয়ে বৃহৎ ধর্মীয় সংগঠন, যার সাথে রাজনীতি ও উগ্রবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাওহিদের স্বীকৃতি, ঈমান ও নেক আমলের দাওয়াত, ব্যক্তি চরিত্র সংশোধন, মানুষের সাথে সদাচরণ, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালীন জবাবদিহি তাবলিগ জামাতের মূল উদ্দেশ্য।


ভারতের প্রখ্যাত আলিম আল্লামা শায়খ সালমান হুসাইনি নদভি এ বিষয়ে সৌদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সৌদি সরকার যে আন্তর্জাতিক ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অ্যাজেন্ট’ হয়ে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে কাজ করছে, এমন নির্দেশনায় সেটি আরো স্পষ্ট হলো। বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলিম মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভি বলেন, সৌদি সরকার শতবর্ষী একটি দ্বীনি আন্দোলনকে এভাবে একতরফা নিন্দা ও নিরুৎসাহিত করতে পারেন না। সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাবলিগ জামাতের বিরুদ্ধে প্রচারণা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের কারণে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মুফতি আবুল কাসেম নুমানী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হজরত মাওলানা ইলিয়াস রহ: দারুল উলূম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ.-এর অন্যতম ছাত্র ছিলেন। তিনিই তাবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠা করেন যার অধীনে বড়দের নিষ্ঠাপরায়ণ চেষ্টা ও মেহনত দ্বীনি ও আমলি ক্ষেত্রে উপকার বয়ে আনছে। শাখাগত মতভেদ সত্ত্বেও তাবলিগ জামাত নিজের মিশনে কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় গোটা বিশ্বেই তাদের কাজ ছড়িয়ে আছে। এর সাথে যুক্ত সদস্য ও জামাতের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর শিরক, বিদআত ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দারুল উলুম দেওবন্দ এর নিন্দা জানাচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি সরকারের কাছে আবেদন করছে, তারা যেন নিজেদের এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন এবং তাবলিগ জামাতের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকেন।


তাবলিগি কাজ সম্পর্কে উপমহাদেশীয় আলিমদের সাথে কথা বলে মন্তব্য করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথোরিটি আল-হাইআতুল উলয়া-লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি আল্লামা মাহমুদুল হাসান হাফি.। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইসলামের তাবলিগ তথা ঈমান আমলের দাওয়াতের কাজের নিন্দা করার আগে এর ভালোমন্দ সবদিক বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ ঈমান, ইসলাম ও ইহসানের দিকে ধাবিত হচ্ছে তাবলিগের মেহনতের ফলে। সৌদি আরবের আলিমদের উচিত তাবলিগি কাজ সম্পর্কে উপমহাদেশীয় আলিমদের সাথে কথা বলে মন্তব্য করা। আওলাদে রাসূল সা: হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ রাবে হাসানী নদভী, মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী, মাওলানা মুফতি ত্বকী উসমানীসহ বিশ্বের সেরা আলিমদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। 


তিনি বলেন, প্রচলিত তাবলিগের কাজে তারা সমালোচনা বা সংশোধনী দিতে পারেন, কিন্তু একতরফা নিন্দা ও নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন না। অতীতের হুসামুল হারামাইন ফাতওয়ার দুঃখজনক ঘটনার মতো কোনো মহলের মিথ্যা প্রচারণা বা একতরফা অপবাদ শুনে তাবলিগি কাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন না। এর ফলে সারাবিশ্বে এই কাজে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রবণতা দেখা দিতে পারে। মুসলমানদের শত্রুরাই এতে খুশি ও লাভবান হবে।’ সৌদি প্রজ্ঞাপনটির বক্তব্যে বাংলাদেশ পাক ভারত উপমহাদেশের আহলে হক উলামায়ে কেরাম ও সর্বস্তরের তাওহিদি জনতা খুবই মর্মাহত হয়েছেন। তারা ভেবে পাচ্ছেন না, এ কথা সৌদি আলেমরা কোথায় পেলেন যে, তাবলিগিরা কবরকে সেজদার স্থান বানায়? দুনিয়ার কোথাও এমন নজির নেই, হতে পারে না। ইনসাফের স্বার্থেই তাদের এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার অনুরোধ জানাই। হারামাইন শরিফাইনের দ্বীনি খেদমতের জিম্মাদারির মহান মর্যাদা তাদের আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন। তাই দুনিয়ার মুসলমানদের কল্যাণকর দিকগুলো তাদের বিবেচনায় নিতে হবে। তাবলিগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং এর বিরোধিতা সমীচীন হবে না। কারণ বিশ্বে উম্মতের সাধারণ দ্বীনি ফিকির, ঈমানি ভাবনা, ন্যূনতম ঈমান আমলের চর্চা ও মুসলিম জীবনে শরিয়াসংশ্লিষ্টতা, ক্ষেত্রবিশেষে বেদ্বীনি ও বদদ্বীনি পরিবেশে মুসলিম পরিচয়টুকু ধরে রাখাসহ সারা বিশ্বে অমুলিমদের মাঝে ইসলাম প্রচারের জন্য এ শতাব্দীতে এই তাবলিগি কাজের সমপর্যায়ের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাবলিগি জামাতকে ‘সন্ত্রাসী ও গোমরাহ’ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এটার পরিণতি হবে দূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। এর জন্য সৌদি আরবকে বেছে নেয়া হয় যাতে অন্যান্য আরব ও মুসলিম দেশ অনুসরণ করতে পারে। 


আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামের উত্থান ও জাগরণকে বন্ধ করার জন্য নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের প্রবক্তারা সুপরিকল্পিত নীলনকশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এর বাস্তবায়নে তারা দেশে দেশে মুসলিম শাসকদের কাজে লাগাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রলোভনে। সৌদি আরব, মিসর, সিরিয়া, ইরাক, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও আরব আমিরাত তার প্রমাণ। ইসলামের আতুঁরঘর সৌদি আরবে সিনেমা হলের অনুমতি প্রদান, ফ্রি মিক্সিংয়ের প্রচার প্রসার ও অবাধ অশ্লীলতার যে ব্যাপক হাওয়া বইছে তা ভালো লক্ষণ নয়। তাবলিগের প্রতি বৈরিতা প্রকাশ সে ধারারই অংশ নয় তা উড়িয়ে দেন না চিন্তাশীল মহল। ইসলামের কেন্দ্রীয় এ মারকায সৌদি আরব ফিরে আসবে স্বরূপে। দাওয়াত তাবলিগসহ সব দীনি কাজের নেতৃত্বের আসনে আসবে এ মারকায। বর্তমানে উদ্ভূত অবস্থা ও পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এবং ঘটাতে হবে। বহমান এ নষ্ট সময়ে দীনের এ কাজ স্বমহিমায় জ্বলে থাকবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিমদের হৃদয়ে। সময়ের ব্যবধানে সৌদি আরব হতে পারে তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র। 


লেখক : অনুবাদক ও  শিক্ষক, জামিয়া কারিমিয়া আরাবিয়া, রামপুরা, ঢাকা


 

আরো পড়ুন