শিরোনাম :

  • নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল সুদান, সংঘর্ষে নিহত ৭দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ইয়াছিন নিজামী ইয়ামিন
অপার নেয়ামত পানি
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ২১:৫১:১৬
প্রিন্টঅ-অ+

প্রতিটি জীবের জীবন ধারণের জন্য দৈনন্দিন যত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও উপকরণ রয়েছে, তার মধ্যে পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। তাই বলা হয় ‘পানির অপর নাম জীবন’। পানি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মনুষ্যজাতির উপর বিশেষ এক রহমত এবং নেয়ামত। কিন্তু এই নেয়ামতের প্রতুলতায় এর যথার্থ মূল্যায়ন হয় না। অথচ, এই যে আমাদের দেশের মাটি এত উর্বর, এত সবুজ-শ্যামলিমার, নানান প্রকার গাছ-গাছালি আর ফলফলাদি ও ফসলের সমারোহ, এসবের মূলেই কিন্তু পানি। 


কিন্তু দেখা যায় ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় পানি অপচয়ে আমরা স্বেছাচারিতা করি। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেছেন, তোমরা খাও এবং পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। [সূরা আরাফ] 


আমাদের দেশ নদীমাতৃক হওয়ায় আমাদের নিকট এই পানির মূল্য একেবারেই নগণ্য। কিন্তু ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট পানির মূল্য আমাদের মুক্তা-মানিকের চেয়ে কিছু অংশেই কম নয়। যেখানে বেশ কিছুদিন আগ থেকেই দেখা দেয় পানির তীব্র সংকট। পানির খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটছে মানুষ। এজন্য আন্দোলন, প্রতিবাদসহ অবরোধ পর্যন্ত হয়েছে দেশটিতে। এতে আহত হওয়া সহ নিহতও হয়েছে বেশ অনেকজন। অনেক বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘আমি তৃষ্ণার্ত, আমাকে পানি দাও’।


যেখানে মানুষ পান করার জন্য পানি পাচ্ছে না, সেখানে আমাদের অপচয় কী পরিমাণ হচ্ছে, ওদের দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের নেয়ামতের হিসাব কষতে পারি, এবং এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এই পানি অপচয় না করার ব্যাপারে আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদিস পাক থেকে চমৎকার একটি উপমা উপস্থাপন করা যেতে পারে।


‘হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাআদ (রা.) এর পাশ দিয়ে যাছিলেন, তখন সাআদ (রা.) অযু করছিলেন। তার অযুতে পানি বেশি খরচ হছিল দেখে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সা'আদ (রা.)কে ডেকে বললেন, সাআদ! এই অপচয় কেনো? সাআদ (রা.) আদব সমেত আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ!  অযুতেও কী অপচয় হয়? 


রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এমনকি বহমান নদীতে অজু করলেও! [সুনানে ইবনে মাজাহ]


অন্য একটি হাদীসে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তিনটি নেয়ামত এমন যা সর্বসাধারণের জন্য ব্যাপক করে দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে পানি, ঘাস, বাতাস। [আবু দাউদ]


এদিকে বর্তমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার পানির জন্য আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। বিশ্বের চার ভাগের তিন ভাগ পানি হলেও এক গ্লাস খাবার পানির জন্য মানুষকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হবে। তখন পানি হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কোনো কিছু যখন সহজে বা স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়, তখন 'পানির দরে' শব্দটি এর বাগধারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে অতিশীঘ্র হয়তো এই বাগধারাটি তার স্বল্পমূল্যে অধিক পাওয়ার উদ্দেশ্যটি হারাবে।


বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বিভিন্ন রোগ ও উপসর্গের প্রকোপ বাড়ে প্রতিনিয়ত। এতে যেমন কষ্টে নিপতিত হয় সাধারণ মানুষ তেমন নষ্ট হয় দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু দূষিত পানির সংকট মোকাবেলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষ যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করবে তারও কোনো উপায় নেই! অথচ, দেশে বোতলজাত ও কনটেইনার সরবরাহকৃত বিশুদ্ধ পানির নামে ভোক্তাদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণা করা হচ্ছে।


এর চেয়ে বড় আশঙ্কার কথা হছে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও পানি সংকট শুরু হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর ট্রান্সফরমিং ইন্ডিয়া’ (নিটি আয়োগ) ২০১৮ সালের কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্সের উপসংহারে যা বলা হয়েছে তা ভারতের জন্য এক সতর্কবার্তা বটে। এজন্য মোদি ‘জল জীবন মিশন’ নামের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যায় ভারতের এই ‘জল জীবন মিশন’ এর মত পুরোবিশ্ব বৃষ্টি ও জলাধারের পানি সংরক্ষণ করা, নদী দূষণ রোধ করে নদীর পানিকে খাওয়ার উপযোগী করে জনসাধারণের মধ্যে সুষমভাবে বন্টন এবং সঠিকভাবে পানি ব্যবস্থাপনার কাজে এগিয়ে নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একাজগুলো মোটেও মামুলি বিষয় নয়। বরং এখন এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 


সুতরাং আমাদের এখন উপলব্ধির সময় এসেছে পানির মতো ভীষণ প্রয়োজনীয় নেয়ামতের মূল্যায়ন করা। আর যদি এর যথার্থ মূল্যায়ন করতে না পারি তাহলে কুরআনুল কারীমের সূরা ইব্রাহীমে আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে হুমকি এসেছে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে তোমাদের নেয়ামতকে বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আমার শাস্তি ভীষণ ভয়াবহ।


সুতরাং এই নেয়ামতের প্রাপ্তি ও আধিক্যের জন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। এবং আমাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। না হয় যে সংকট চারপাশে শুরু হয়েছে, তা যদি ব্যাপকতা লাভ করে, তাহলে মানুষের মধ্যে কতটা বিশৃঙ্খলা আর উন্মুক্ততা বিস্তার লাভ করবে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা আমাদের প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য। এটাই একমাত্র বিপদ এড়ানোর পথ!



yasinnizamiyamin123@gmail.com



 

আরো পড়ুন