শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
সারা দেশে ১০ লাখ ইজিবাইকে প্রতিদিন বিদ্যুতে চুরি হয় আড়াই কোটি টাকা
বিদ্যুতের চুরি বন্ধে উদ্যোগ অপ্রতুল
মেহ্দী আজাদ মাসুম:
২০ জুলাই, ২০২২ ১০:৫৫:৫৪
প্রিন্টঅ-অ+

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’র সংকট মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময় কমিয়ে আনা, মার্কেট-দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করা, পর্যায়ক্রমে ১ ঘণ্টা লোডশেডিং, খরচ কমাতে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সাময়িক বন্ধ রাখা ও পেট্রোল পাম্প সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখার মত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে সরকারের এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে ‘বিদ্যুৎ চুরি’র মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নেই। অথচ রাজধানীতে প্রতিদিনের বিদ্যুৎ চুরির চিত্র ভয়াবহ। গুলিস্তান, বায়তুল মেকাররাম, নয়া পল্টন, মৌচাক, মালিবাগ, খিলগাঁও, ফার্মগেট, মহাখালি, উত্তরা, মিরপুর ও নিউমার্কেটের ফুটপাতের দোকান, অননুমোদিত মাছ ও শবজির বাজার, রাজধানীর অসংখ্য বস্তিঘর এবং সারা দেশে ১০ লাখ অটো-ইজিবাইকে চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান বিদ্যুৎ। আলোচিত এসব স্থানে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা নির্ধারিত হারে বিদ্যুতের বিল দিলেও তা পাচ্ছে না সরকার। ডেসকো ও ডিপিডিসির এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারির যোগসাজশে দালাল চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে বিদ্যুতের কোটি কোটি টাকা। এ বিষয়ে কঠোর কোন পদক্ষেপ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শাস্তি দিয়েছে, এমন তথ্য দিতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ বা মন্ত্রণালয়। তবে ডিপিডিসির টাস্কফোর্স প্রধান (কোম্পানি সচিব) আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০১৮তে পাস হওয়া আইনের ৪৮ ধারায় তারা বিদ্যুৎ চুরির বিষয়ে শাস্তি দিয়ে থাকেন। নতুন আইনে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার এখতিয়ার তাদের নেই। অপরদিকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই বিদ্যুৎ চুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা-না হলে সাশ্রয়ী হওয়ার সরকারের কোন উদ্যোগই ফলপ্রসু হবে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি’র তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। এই সংকট মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। বাংলাদেশেও এই সংকট উত্তরণে গত গত সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এ বৈঠক থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ে নেয়া হয় কঠোর পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পর বিষয়টি নিয়ে সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন  বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। জানান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা। প্রতিদিনের ভয়াবহ বিদ্যুৎ চুরির ঢাকা পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশরী বিকাশ দেওয়ান গতকাল আমার বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের সিস্টেম লস ও চুরি বন্ধ করা এই মুহুর্তে খুবই জরুরি। এও বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোন নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। কারণ দুর্নীতি বা চুরি বন্ধ করা আমাদের দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ। বর্তমান সংকট উত্তরণে আমরাও সোচ্চার হয়েছি। প্রথমে চুরি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিবো। তারপর সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে নতুন উদ্যোগ গ্রহন করবো।’ রাজধানীতে কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরির বিষয়টি অকপটে শিকার করেন ব্যবস্থপনা পরিচালক। 


বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ডিপিডিসির টাস্ক ফোর্স প্রধান (কোম্পানি সচিব) আসাদুজ্জামান গতকাল আমার বার্তাকে বলেন, ‘পুরনো আইনে বিদ্যুতের চুরি ঠেকাতে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার সুযোগ ছিলো। ২০১৮তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নতুন আইন পাস হয়। এই আইনে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার কোন সুযোগ নেই। নতুন আইনের ৪৮ ধারায় টাস্ক ফোর্স এবং স্পেশাল টাস্ক ফোর্স দ্বারা চুরি ঠেকাতে এবং চুরির বিষয়ে শাস্তি অভিযান পরিচালনা করতে হয়।’ এ পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারি (মাস্টার রোল) এবং গ্রাহককে শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন এই টাস্কফোর্স প্রধান। 


এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম আমার বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের চুরি বন্ধে ডিপিডিসি এবং ডেসকোকে নিজেদের ঘড় থেকে অভিযান শুরু করতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ চুরির সাথে এক শ্রেনীর বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন। তা নাহলে কোনভাবেই চুরি হওয়া সম্ভব নয়। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসব কর্মকর্তা চুরিতে সায় দেন। এতে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে সরকার। বিশেষ করে এখনই এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ। নইলে বিদ্যুৎ-জ্বালানির সাশ্রয়ে সরকারে কোন উদ্যোগই ফলপ্রসু হবে না।’


বিদ্যুৎ-জ্বালানির সাশ্রয়ে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে লোডশেডিং করলে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জেনারেটরে ব্যবহার বাড়বে। ফলে এ খাতে ডিজেল বেশি ব্যবহূত হবে। এক দিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখলে ব্যবহার কমবে না, উল্টো পাম্পে তেল নিতে ভিড় বাড়বে। বিশ্নেষকরা বলছেন, মসজিদে শুধু নামাজের সময়ই এসি চলে। এসির বেশি ব্যবহার অফিসগুলোতে। অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা এসি, পাখা ও বাতি ব্যবহারে সচেতন নন। সরকারি ভবনগুলো বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ী নয়। দিনেও বাতি জ্বালাতে হয়। তাই বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্ববসম্মত নয় বলে তারা মনে করেন।


ইজিবাইক ও ব্যটারিচালিক রিকশা: জানা গেছে, ইজিবাইক ও ব্যটারিচালিক রিকশার ব্যাটারি রিচার্জ করতে চুরি করা বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। টাকা বাঁচাতে মালিকপক্ষ এ পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। জানতে চাইলে কদমতলী এলাকার একজন ইজিবাইক মালিক বলেন, বৈধভাবে রিচার্জ করতে গেলে একদিনে কমপক্ষে চারশ’ টাকার বিদ্যুৎ লাগবে। এ কারণে আমরা গ্যারেজ থেকে চার্জ করাই। গ্যারেজগুলোতে বিদ্যুতের অবৈধ লাইন থাকে বলে রিচার্জ করতে অর্ধৈকেরও কম টাকা লাগে।


জানা গেছে, ঢাকাসহ সারাদেশেই চোরাই বিদ্যুতে ইজিবাইকের ব্যটারি রিচার্জ করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকেই ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের  দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে গ্যারেজ মালিকদের এই সুযোগ করে দেন। রাজধানীর জুরাইন, মুরাদপুর, যাত্রাবাড়ী, মীরহাজিরবাগ, ডেমরা, শ্যামপুর, হাজারীবাগ, উত্তরখান, দক্ষিণখান এলাকাসহ বহু স্থানে এরকম গ্যারেজ আছে। এসব গ্যারেজের বিদ্যুতের সংযোগ অবৈধ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেইন লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ লাগানো। ইজিবাইক মেকানিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত একটি ইজিবাইকের জন্য চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ৮০০ থেকে ১১০০ ওয়াট হিসেবে ৫ থেকে ৬ ইউনিট (দিনে বা রাতে কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা) বিদ্যুৎ খরচ হয়। সে হিসেবে দেশের প্রায় ১০ লাখ ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জের জন্য জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার থেকে ১১শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার কথা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম  ৫ টাকা করে হিসাবে ধরলে সারাদেশে ১০ লাখ ইজিবাইকের জন্য প্রতিদিন বিদ্যুতের খরচ আড়াই কোটি টাকা। এ হিসাবে মানুষের ভোগান্তির কথা বাদ দিলে সরকার প্রতিদিন ইজিবাইকের কারণে আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। 


সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি’র সংকট মোকাবেলায় সারা দেশে এলাকা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ১ ঘণ্টা লোডশেডিং, প্রয়োজনে পরবর্তী সপ্তাহ থেকে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং করা, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা, সারা দেশের মার্কেট-দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করা, পেট্রোল পাম্প সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অফিসে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাশ্রয়ি হওয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা বন্ধ রাখা, সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা, ‘উপাসনালয়ে এসি ব্যবহার বন্ধ রাখা, জেলা প্রশাসন পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ি হওয়ার নির্দেশনা দেয়া ও আলোক সজ্জা বন্ধ রাখা। তবে সকল শিল্প কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

আরো পড়ুন