শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
স্বস্তির ধারায় রেমিট্যান্স
বিশেষ প্রতিবেদক
০২ আগস্ট, ২০২২ ১৩:৪৫:২৭
প্রিন্টঅ-অ+


  • একক মাস হিসাবে দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এল জুলাইয়ে আগের অর্থবছরের একই মাস জুলাইয়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.৫৬%


  • দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে গত বছরের জুলাইয়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার


  • প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের নেতিবাচক অবস্থার পর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি রেমিট্যান্সে খারাপ সময় কাটবে বলে আশা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের



নেতিবাচক গতিপ্রবাহ উৎরে স্বস্তির ধারায় ফিরল প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। চলতি ২০২২-২৩ অর্থ বছরের প্রথম মাস অর্থ্যাৎ সদ্য বিদায়ী জুলাই মাসে প্রায় ২১০ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ নানা দুর্যোগে বৈশি^ক সংকটের আঁচ লাগে বাংলাদেশেও। জুনেও রেমিট্যান্স কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকে, যা নীতিনির্ধারক-অর্থনীতিবিদ সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।   

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য মতে, ১ জুলাই শুরু হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে প্রবাসীরা ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।  যা বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা) হিসাবে টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতিদিন ৬ কোটি ৭৬ লাখ ডলার করে পাঠিয়েছেন তারা; টাকার হিসাবে প্রতিদিন দেশে এসেছে ৬৪০ কোটি টাকা। একক মাস হিসাবে দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে জুলাইয়ে।  

২০২১ সালের মে মাসে ২১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই কেবল ২০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল।

৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে মন্দা দেখা দেয়। পুরো অর্থবছরে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার এসেছিল; গড়ে প্রতিদিন ৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, এসময়ে আগের অর্থবছরের একই মাস জুলাইয়ের চেয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে গত বছরের জুলাইয়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের নেতিবাচক অবস্থার পর চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি রেমিট্যান্সে খারাপ সময় কাটবে বলে আশা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের প্রথম দিকে যে আশা দেখিয়েছিল তা পরেও বজায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, জুলাই শেষে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আগের মাস জুনের চেয়ে ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। ওই মাসে এসেছিল ১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২০ সালের জুলাইতে সবচেয়ে বেশি ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসীদের রেমিটেন্স পাঠাতে প্রণোদনা বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রবাসীদের বৈধভাবে রেমিটেন্স পাঠাতে উৎসাহ দিয়ে আসছে। আগের চেয়ে বেশি দর পাওয়ায় প্রবাসীরা উৎসাহী হয়ে জুলাই মাসে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।’

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে অর্থনীতি নিয়ে যখন নানান হতাশার তথ্য, তখন স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের বিস্ময়কর উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। চলতি জুলাইয়ের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই অর্থবছরে তৈরি হবে নতুন রেকর্ড। এতে অনেকটাই চাপমুক্ত হবে দেশ।

গত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার; প্রবৃদ্ধি হয় ঋণাত্বক ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার; প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ।

সরবরাহ সংকটে সম্প্রতি ডলারের দাম বেশ কয়েক মাস থেকেই বাড়ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি খোলা বাজারেও ডলারের দাম বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ডলার সংগ্রহে ব্যাংকগুলো বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে বেশি দরে প্রধান এ বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে।

গত ৩০ মে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের উপর ছেড়ে দেয়।

এরপর থেকে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। এসময় ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ১০০ টাকার উপরে কিনে নেয়। কোনো কোনো ব্যাংক ১০৭ টাকা দিয়েও ডলার কিনেছে গত সপ্তাহে।

এতে আগের চেয়ে বেশি দাম পাওয়ায় প্রবাসীরাও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে শুরু করেছেন বেশি পরিমাণে।

চলতি জুলাইয়ের শুরুর দিক থেকে রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণ বাড়ছিল। প্রথম ২১ দিনেই জুনের পুরো মাসের আয় ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২১ জুলাই পর্যন্ত দৈনিক গড়ে ৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছিল। মাস শেষে তা দাঁড়ায় দৈনিক গড়ে ৭ কোটিতে।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটে ২০২০-২১ অর্থবছরে। সে সময় ২ হাজার ৪৭৮ কোটি (২৪.৭৮ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। ওই অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৬ কোটি ৭৯ ডলার প্রবাসী আয় হিসেবে দেশে এসেছিল।

এসব হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে রেমিট্যান্সে রয়েছে ঊর্ধ্বগতি। এই প্রবণতা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে এবং এই অর্থবছরে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম।

তিনি বলেন, ‘গত অর্থবছরে সাড়ে ৭ লাখ লোক কাজের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে গেছেন। তারা ইতোমধ্যে রেমিট্যান্স পাঠাতে শুরু করেছেন। সে কারণেই ঈদের পরও রেমিট্যান্স বাড়ছে। এই ইতিবাচক ধারা পুরো অর্থবছর জুড়েই অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করছি।’

সাধারণত দুই ঈদের আগে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ে; ঈদের পর কমে যায়। তবে এবার কোরবানির ঈদের আগে যে গতিতে রেমিট্যান্স এসেছে, সেই ধারা ঈদের পরেও অব্যাহত আছে।

দেশে গত ১০ জুলাই কুরবানির ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহে ঢল নামে। ঈদের ৯০ কোটি ৯৩ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ঈদের পরে ২১ দিনে এসেছে ১১৮ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের কিছু বেশি।

ঈদের পরেও কেন রেমিট্যান্স বাড়ছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েক মাসে ডলারের দর বেশ খানিকটা বেড়েছে। প্রণোদনার পরিমাণ দুই শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ করা হয়েছে। এসব কারণে প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সে কারণেই বাড়ছে রেমিট্যান্স।’

তিনি বলেন, ‘এই সময়ে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির খুবই দরকার ছিল। নানা পদক্ষেপের কারণে আমদানি ব্যয় কমতে শুরু করেছে। রপ্তানির পাশাপাশি রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে আশা করছি এখন মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।’

রেমিট্যান্স বাড়ার আরেকটি কারণের কথা বলেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি চাঙা হয়েছে। সেখানে কর্মরত আমাদের প্রবাসীরা বেশি আয় করছেন। দেশেও বেশি টাকা পাঠাতে পারছেন। দেশে ডলারের সংকট চলছে। মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা চলছে। রিজার্ভ কমছে। এই মুহূর্তে রেমিট্যান্স বাড়া অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো হবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ও তেমন পূর্বাভাস দিয়েছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরজুড়ে (২০২১-২২) ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে থাকা প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে নতুন অর্থবছরে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।

এই অর্থবছরে রেমিট্যান্স বাড়ার কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শ্রমিক নতুন করে বিদেশে যাওয়ায় তাদের কাছ থেকে বাড়তি পরিমাণ রেমিট্যান্স পাওয়া যাবে।’

দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর হালচাল নিয়ে তৈরি করা পাক্ষিক প্রতিবেদনেও রেমিট্যান্স নিয়ে সুসংবাদের আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত ২১ জুলাই প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে রেমিট্যান্সে নগদ প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। করোনা মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় সব প্রবাসী তাদের কর্মস্থলে ফিরেছেন। টাকার বিপরীতে ডলার বেশ খানিকটা শক্তিশালী হয়েছে। এই বিষয়গুলো আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স বাড়াতে সাহায্য করবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুন ২০২২-২৩ অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে বলা হয়, রেমিট্যান্স ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং চলতি অর্থবছরে গত বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি আসবে।



 



আমার বার্তা -জন







 


আরো পড়ুন