শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
রেলে মন্ত্রী আসে মন্ত্রী যায় ‘কালো বিড়াল’ রয়ে যায়
মেহ্দী আজাদ মাসুম (প্রিন্ট সংস্করণ)
০৩ আগস্ট, ২০২২ ১১:৪৭:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+

‘কালো বিড়াল’ আক্ষরিক অর্থে দুর্নীতির বড়পুত্র। যাদের দুর্নীতির প্রমাণ মেলার পরও অব্যাহতি বা উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাদের শেকড় এতই গভীরে থাকে যে, শত চেষ্টায়ও উপড়ে ফেলা যায় না! যেমনটি পারেননি দেশের বর্ষিয়ান রাজনীতিক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে’র অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ‘কালো বিড়াল’ তাড়াতে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন। উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন দুর্নীতির বীজ। তিনি জানতেন না যে, কালো বিড়ালের দৌরাত্ম কত ব্যপক, কত গভীরে এর শেকড়?


দায়িত্ব নেয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত টের পেতে শুরু করলেন কালো বিড়ালের ক্ষমতার দাপট কত ভয়াবহ। অক্টোপাসের মত ঘিরে ফেলেছিলো তাকেই। তবে খুব একটা সমস্যায় তাকে পড়তে হতো না, যদি না তার এপিএস (২০১২ সালের ৯ এপ্রিল) রেলের দুই কর্মকর্তাকে নিয়ে বিপুল পরিমান টাকাসহ বিজিবি’র হাতে ধরা না পড়তেন। আলোচিত সেই ঘটনাটি রেলের কালো বিড়ালের দৌরাত্মকে সামনে এনে দেয়। দায় মাথায় নিয়ে মন্ত্রণালয় ছাড়তে হয় তাকে।


রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত’র পদত্যাগের পর দায়িত্ব দেয়া হয় সে’সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মজিবুল হক। আর সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর নুরুল ইসলাম সুজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই থেকেই তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার সময়েই ব্যাপক আলোচনায় এসেছে সরকরি এই প্রতিষ্ঠানের টিকেট বিক্রয়ের দায়িত্ব দেয়া ‘সহজ ডট কম’কে নিয়ে। রেলে টিকেট নিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে সহজ ডট কম এর প্রতারণার প্রতিবাদ জানাতে কমলাপুর রেল স্টেশনে অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মহিউদ্দিন রনি। একাই মাঠে নেমে রেলের টিকেট বিক্রয়ের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এই শিক্ষার্থী। 


বিষয়টিকে আমলে নিয়ে হাইকোর্ট রেলের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান। একই সাথে রেলের দুর্নীতি-সিন্ডিকেট নিয়ে দুদক কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি-না, তাও জানতে চান হাইকোর্ট।


এদিকে রেলের ধারাবাহিক লোকসান, জমি বেহাত হয়ে যাওয়া, টিকিট কালোবাজারি ও সামগ্রিক অবব্যস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গত ১০ মে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় এ ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের দেয়া কার্যপত্র থেকে জানা যায়, মন্ত্রণালয় বলেছে তারা ট্রেনভিত্তিক খরচের হিসাব তৈরি করে না। ‘রেলওয়ে কস্টিং প্রোফাইল’-এ ট্রেনের প্রতি কিলোমিটার চালানোর খরচ হিসাব করা হয়। কমিটিতে দেয়া মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে ৪০টি ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বছরে এই ট্রেনগুলোয় আয় হয়েছে ৯৮ কোটি ৬১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু ব্যয়ের কোনো খরচ বা হিসাব দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় কমিটি ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে।


বৈঠকে রেলের আয়-ব্যয় নিয়ে জানানো হয়, গত তিনটি অর্থবছর আগে বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত রেলে প্রতি কিলোমিটার যাত্রীপ্রতি খরচ হয়েছে ২ টাকা ৪৩ পয়সা। আর আয় হয়েছে ৬২ পয়সা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মালামাল পরিবহণ বাবদ প্রতি কিলোমিটারে টনপ্রতি খরচ হয়েছে ৮ টাকা ৯৪ পয়সা। আর এই সময়ে আয় হয়েছে ৩ টাকা ১৮ পয়সা। তবে এই হিসাবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে ট্রেনপ্রতি খরচের হিসাব দিতে বলেছে স্থায়ী কমিটি।


মন্ত্রী আসে মন্ত্রী যায়: মন্ত্রী আসে মন্ত্রী যায়, রেলের দুর্নীতি বহাল রয়। যাতায়াত সেবার অন্যতম এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে নানা পদক্ষেপ নিলেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না রেলের দুর্নীতি। কেনাকাটা, টেন্ডার, নিয়োগ-সর্বত্রই লুটপাটে বেহাল দশা বাংলাদেশ রেলওয়ের। এবার ইঞ্জিন মেরামতের যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দামে। আর ২০ হাজার টাকার সালফিউরিক এসিডের ক্রয় মূল্য দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় অর্থ নয়ছয় করার অপরাধে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে রেলওয়ে অডিটর অধিদপ্তর।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, নানা অনিয়মের তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়েও তারা থাকছেন বহাল তবিয়তে। আবার দুর্নীতির মামলায় জেল খেটেও আবার আসীন হয়েছেন রেলের স্বপদে, এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। সঠিক বিচার না হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে নথি গায়েব করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছেন কেউ কেউ। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের অপরাধে মাঝে-মধ্যে দুয়েকজনের হালকা-পাতলা শাস্তি হলেও এটাকে আইওয়াশ হিসেবেই দেখছেন বিশিষ্টজনরা। অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ায় অনিয়ম বন্ধের সকল প্রচেষ্টাই যেন ভেস্তে যাচ্ছে। তবে দোষীদের ছাড় না দেয়ার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের কঠোর হুঁশিয়ারিকে গতানুগতিকও বলছেন তারা। 


আরো জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের টাকা খরচের স্বচ্ছতায় কোপ দেয়ার ব্যবস্থা করেছে রেলওয়ে। দেড়শ বছরের বেশি সময় ধরে চলা রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে স্বাধীন হিসাব বিভাগকে রেলের অধীন করা হয়েছে। এতে টাকা খরচ ও হিসাব দুই-ই-রেলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। রেল যেভাবে চাইবে, সেভাবেই হিসাব হবে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো সরকারি দপ্তরে এমন নজির নেই। হিসাব বিভাগ রেলের অধীন হলে দুর্নীতি ও অপব্যয় বাড়বে। এর আগে এটা মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অধীন ছিল। হিসাব বিভাগকে রেলের অধীন করার চেষ্টাকে ‘আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থি’ বলে মন্তব্য করেছে সিএজির কার্যালয়। যেমন, চলতি অর্থবছরে রেলওয়ের বাজেট ১৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। সরকারি এ বরাদ্দ সরাসরি খরচ করতে পারবে না রেলওয়ে। রেলের অর্থ ও হিসাবকে জানাতে হয় কেন, কীভাবে, কত টাকা খরচ হবে। হিসাব বিভাগ প্রাক-নিরীক্ষা (প্রি-অডিট) করে রেলের আর্থিক দাবি (বিল) মেটাতে টাকা দেবে। অসংগতি থাকলে বিল কাটছাঁট করবে। অনিয়ম ঠেকাতে এ ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সেস’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা সেই ১৮৫৮ সাল নথেকেই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে চলছে।


হিসাব বিভাগ রেলেরই অংশ; কিন্তু তাদের অধীন নয়। ফলে হিসাব বিভাগের ওপর রেলের খবরদারি চলে না। হিসাব বিভাগের কর্মকর্তারা অডিট ক্যাডারের। তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সিএজির অধীন। সরকারি নিয়ম মেনে আর্থিক স্বচ্ছতা রক্ষায় ব্যয়কারী বা প্রশাসনিক নির্বাহীর কাছে টাকা রাখা হয় না। যে বিভাগের কাছে টাকা থাকে, তাদের খরচের এখতিয়ার নেই। এ কারণে সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের হিসাব নিজে করে না। তা সিএজির অধীন অডিট ক্যাডারের কাজ।


কিন্তু নতুন জনবল কাঠামোতে হিসাব বিভাগকে নিজেদের অধীনে নিয়েছে রেলওয়ে। সিএজি থেকে বদলির পরিবর্তে প্রেষণে অডিট কর্মকর্তাদের হিসাব বিভাগে চায় রেল। সংশোধিত জনবল কাঠামোতে রেল ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও হিসাব বিভাগে বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে। হিসাব বিভাগের অফিসের সংখ্যা কমেছে। এতে পে-পয়েন্ট বন্ধ হওয়ায়, আগামী মাসে রেলকর্মীদের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। 


বিষয়টি নিয়ে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন আমার বার্তাকে বলেন, ‘রেলে কালো বিড়াল বলতে আসলে কিছু নেই। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি রেলের লোকসান কমিয়ে আনতে, দুর্নীতি মুক্ত করতে।’ তিনি রেলের উন্নয়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।


 


এবি/এসএ

আরো পড়ুন