শিরোনাম :

  • জবানবন্দিতে বুলুসহ ১৫ বিএনপি নেতার নাম পেয়েছে পুলিশ উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ২দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২ আইসিসির সেরা হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের নাসুম
হাওয়া নাকি পরাণ !
মানিক মুনতাসির
০২ আগস্ট, ২০২২ ১৯:৪৩:০৩
প্রিন্টঅ-অ+

যে দেশের সংস্কৃতি যত শক্তিশালী সে দেশের সমাজ ব্যবস্থা ততটাই মজবুত। কারণ চলচ্চিত্র বা নাটক, গান, গল্প-কবিতা, উপন্যাস, ইত্যাদি হল সমাজের বাস্তব অবস্থাকে চিয়াত্রিত করা। কিংবা ভবিষ্যৎ কি হতে পারে সেটার একটা ধারণা দেওয়া। আবার ভৌতিক, সায়েন্স, ভয়ংকর মারামারি, মজা, কৌতুক, আর্ট যে কোন ধরনের   সিনেমা থেকেই সমাজের চিত্রই প্রকাশ পায়। 


যেমন পথের পাঁচালী, কাবুলিওয়ালা, দীপ জ্বেলে যাই, হীরক রাজার দেশে, কানামাছি, হারানো সুর, নায়ক, গুপী গাইন বাঘা বাইন, জলসাঘর, তিন কন্যা, অপুর সংসার, সোনার কেল্লা, মুখ ও মুখোশ, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, হাঙ্গর নদী গ্রেনেড, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, ঘুড্ডি, দীপু নাম্বার টু, হাজার বছর ধরে, পদ্মানদীর মাঝি, চোরাবালি এমন কি শঙ্খনীল কারাগারসহ দুই বাংলায় আরো বহু কালজয়ী সিনেমা আছে একই ভাষায়।


বলিউডের মুভি সাত হিন্দুস্থান, চুপকে চুপকে, কাহানী, ডার্টি পিকচার, থ্রি ইডিয়টস, স্বজন “কাভি খুশি কাভি ঘাম এবং দঙ্গল এর কোন ক্লীপ সামনে এলে চোখ আটকে যায়। রাজেশ খান্নার "আপ কি কসম" এবং অমিতাভ বচ্চনের "বোম্বে টু গোয়া" কোনটা হিট হয়নি। সমাজকে মেসেজ দেয়নি। প্রমাণ করা কঠিন। হলিউডের ট্রিপল রোমান্টিক মুভি টাইটানিক দেখেননি পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া দুস্কর। আবার সেখানে উঁচু-নিচু বা রাজা-প্রজার মেসেজটাও খুবই পরিস্কার। 


এছাড়া পার্লহার্বার, কিংকং, দ্যা গড মাস্ট বি ক্রেজিও একই রকম। তুমুল জনপ্রিয় এবং ব্যবসা সফল। সর্বশেষ নো টাইম টু ডাই দেখেও জেমস বন্ডকে মনে হয়েছে ৩৫ বছরের টগবগে তরুণ। জনি ইংলিশ র‌্যাবন তো আরো বাম্পার ছিল, জেকি চানের স্পাই, স্টেপ মাদার, কারাতে কিড এগুলো বার বারই দেখি। এসব মুভি শুধু বিনোদনই নয় একই সাথে দারুণ সব মেসেজ দিয়ে গেছে সমাজকে। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপ-আমেরিকায় সামার ভেকেশনে স্কুলের ছোট ছোট সোনামনিদের নিয়ে দেশ, সংস্কৃতি, জাদুঘরসহ পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখাতে বেরিয়ে পড়ে প্রতিবছর। ভবিষ্যত প্রজন্মকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানাতে হলে সবার আগে সুযোগ দিতে হবে। সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। 


ইতিহাস বলছে, হলিউডকে সবচেয়ে পুরনো শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে প্রাচীনতম চলচ্চিত্র স্টুডিও ও প্রযোজনা কোম্পানিসমূহ বিকাশ লাভ করে। এখানেই বিভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র বিকশিত হয়, তার মধ্যে রয়েছে নাট্যধর্মী, হাস্যরসাত্মক, সঙ্গীতধর্মী, প্রণয়ধর্মী, মারপিটধর্মী, ভীতিপ্রদ, বিজ্ঞান কল্পকাহিনীমূলক, যুদ্ধভিত্তিক মহাকাব্যিক, যা অন্যান্য জাতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।


১৮৭৮ সালে ইড উইয়ার্ড মুইব্রিজ চলচ্চিত্রে আলোকচিত্রের ক্ষমতার প্রদর্শন করেন। ১৮৯৪ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে টমাস আলভা এডিসনের কিনেটোস্কোপ ব্যবহার করে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯২৭ সালে বিশ্বের প্রথম সবাক সঙ্গীতধর্মী চলচ্চিত্র দ্য জ্যাজ সিঙ্গার নির্মাণ করে, এবং পরের দশকে সবাক চলচ্চিত্রের বিকাশের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা রাখে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্প ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউডের ৩০ মাইল অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে। পরিচালক ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ প্রথম চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ উদ্ভাবন করেন। অরসন ওয়েলসের সিটিজেন কেইন-কে প্রায়ই বিভিন্ন সমালোচকদের ভোটে সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে আখ্যা পেতে দেখা যায়। প্যারিসে ফিল্ম এবং মিডিয়ার ওপর গবেষণার জন্য একটি লাইব্রেরি ও গবেষণা ভবন রয়েছে। যেখানে শত শত বছরের পুরনো মুভি নিয়ে গবেষণা হয়।  এখানে একজন নির্মাতাকে প্রোমোট করতে সরকার এমন কোন সহায়তা নাই যেটা করে না৷ এর পেছনে বছরে লাখ লাখ কোটি ইউরো খরচ করে থাকে।


এদিকে ১৮০০ শতকে চলচ্চিত্রের বিকাশের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী মার্কিন চলচ্চিত্র প্রভাব বিস্তার শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর গড়ে ৭০০-এর অধিক ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র মুক্তি দিয়ে থাকে, যা কোন একক ভাষার জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের দিক থেকে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে জাতীয় চলচ্চিত্রের দিক থেকে যুক্তরাজ্য ২৯৯, কানাডা ২০৬, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডও একই ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, যা হলিউড ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত নয়।


অন্যদিকে শিল্প, সাহিত্যের বেলায়ও রোমিও জুলিয়েট কিংবা এনসাইয়েন ম্যারিনার পড়েননি এমন লোকও পাওয়া কঠিন হবে। প্রেমের কবিতা, সনেট, উপন্যাস সবই তো সমাজের কথাই বলত। বিশ্বখ্যাত উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ১৬০০ শতাব্দীর শুরুরদিকে নিজের লেখা ও নির্দেশনা দিয়ে যেসব নাটক মঞ্চস্থ হতো অ্যাভনের তীরে। সেখানে সে সময় নির্মিত একটি ছোট্ট থিয়েটার এখনো টিকে আছে। এটা খুব সহজভাবে বলা যায় যে, শুধুমাত্র শেক্সপিয়ারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শহর, একটি জাতির সভ্যতা। 


বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, দার্শনিক, গণিতবিদ এদের মধ্যেও যার যার সৃষ্টি কিংবা আবিস্কারও কিন্তু সংস্কৃতিরই অংশ। এই  যেমন-গ্যালিলিও না হলে মানুষ হয়তো কখনো চাঁদে যাওয়ার কথা কল্পনাও করতো না। আবার মার্কনি না হলে রেডিও, টেলিভিশন আবিস্কারে আরো সময়ক্ষেপন হতো। এর সবই কিন্তু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।


ম্যাকগাইভার আর রবীনহুড, সিন্দবাদ সিরিয়াল দেখতে কতই না মিথ্যে বলেছি। বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়েছি। আরবের কল্পকথা আলিফ লায়লাও কম ছিল না। সবশেষ কোথাও কেউ নেই এর প্রধান চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে রাস্তায় মিছিল পর্যন্ত করেছি। সেটা এই বাঙ্গালী জাতিই করেছে। আর রবিবারও কম জনপ্রিয় ছিল না। এখন কেন হয় না এমন সিরিয়াল। এর অন্যতম কারণ হলো-বাণিজ্য! বাণিজ্য এবং বাণিজ্য। 


এবার আসুন বর্তমানের কথা বলি-সবশেষ সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি তাও দেড় বছর হয়ে গেল। সেটা ছিল চয়নিকা চৌধুরীরর বিশ্ব সুন্দরী। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে নির্মিত ঐ মুভিটা বেশ ভালই ছিল। সবচেয়ে ভাল ছিল শ্যুটিং লোকেশনগুলো। কারণ পাহাড়, মেঘ আমার ভীষণ প্রিয়। আর বিশ্ব সুন্দরী চিত্রায়িত হয়েছিল পার্তব্য চট্টগ্রামসহ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত বিভিন্ন এলাকা জুড়ে। এছাড়া সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও ছিলেন বেশ পটু। এর হলে গিয়ে প্রথম কবে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছিলাম তা মনে নেই। তবে ১৯৮৫ সালের দিকে বলা যায় নিয়মিতভাবে বায়েস্কোপ দেখতাম। সে সময় অবশ্য বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগই ছিল। ৭০, ৮০ এবং ৯০ এর দশকের সিনেমা মানেই হিট। রমরমা ব্যবসা। দর্শকও ছিল খুশি। অথচ এখনকার চিত্র! দেশের প্রায় সকল সিনেমা হল এক এক করে বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে জেলা-উপজেলা শহরের সিনেমা হলগুলোর অবস্থা অনেক আগে থেকেই নাজুক । 


প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ২/৩টি সিনেমার প্রচারণা চলছে বেশ জোরেসোরে। এরমধ্যে সমুদ্র ও জেলে জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত হাওয়া এবং একটি খুন ও তিভূজ প্রেমের বিষাদময় পরিণতির বাস্তব ঘটনার আলোকে নির্মিত পরাণ মুভির প্রচারণা বেশ বাতাস লেগেছে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা তর্ক-বিতর্কও চলছে। যেহেতু মুভি দুটিই দুই ধরনের বাস্তব চিত্র নিয়েই চিত্রিত হয়েছে তাতে আশা করা যায় বাংলা সিনেমা আবারো ঘুরে দাঁড়াবে। যদি এরই মধ্যে হাওয়া এবং দিন দ্যা ডে নিয়ে চলছে নানা তর্ক-বিতর্ক। তৃতীয়টি দিন দ্যা ডে এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবশ্য আমি এখনো কিছু জানি না। হয়তো এটাই ঐ মুভির পরিচালকের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

আরো পড়ুন